মেনু ও পেজসমূহ

বাংলা ব্যাকরণ




বাংলা ব্যাকরণ অধ্যায় ১: বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ (প্রাথমিক ধারণা) * ভাষা: ভাষার সংজ্ঞা, উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য এবং রূপভেদ (সাধু, চলিত, আঞ্চলিক বা উপভাষা)। * বাংলা ভাষার উৎস ও ক্রমবিকাশ: প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা থেকে আধুনিক বাংলা ভাষার উদ্ভব। * ব্যাকরণ: ব্যাকরণের সংজ্ঞা, প্রয়োজনীয়তা এবং বাংলা ব্যাকরণের ইতিহাস। * বাংলা ব্যাকরণের মূল আলোচ্য বিষয়: * ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology) * রূপতত্ত্ব বা শব্দতত্ত্ব (Morphology) * বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রম (Syntax) * অর্থত্ত্ব বা语义 (Semantics) অধ্যায় ২: ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology) * ধ্বনি ও বর্ণ: ধ্বনি ও বর্ণের পার্থক্য, বাংলা বর্ণমালা (স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ এবং তাদের শ্রেণিবিভাগ)। * উচ্চারণ স্থান: কণ্ঠ্য, তালব্য, মূর্ধন্য, দন্ত্য, ওষ্ঠ্য এবং অন্যান্য উচ্চারণ স্থান। * ধ্বনির পরিবর্তন: * আদিগম, মধ্যগম, অন্ত্যগম (অক্ষরগম) * অপিনিহিতি, অভিশ্রুতি * স্বরসঙ্গতি (প্রগত, পরাগত, মধ্যগত, অনন্যোন্য) * সমীভবন (প্রগত, পরাগত, পারস্পরিক) * বিষমীভবন * ব্যঞ্জনবিকৃতি ও ব্যঞ্জনচ্যুতি * হ-কার লোপ ও অসমীকরণ * র-কার লোপ ও অভ্রশ্রুতি * সন্ধি: সংজ্ঞা, উদ্দেশ্য এবং প্রকারভেদ। * স্বরসন্ধি (নিয়ম ও উদাহরণ) * ব্যঞ্জনসন্ধি (নিয়ম ও উদাহরণ) * বিসর্গসন্ধি (নিয়ম ও উদাহরণ) অধ্যায় ৩: শব্দ ও রূপতত্ত্ব (Morphology) * শব্দ ও পদ: শব্দ এবং পদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও পার্থক্য। * পদের শ্রেণিবিভাগ: বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, অব্যয় ও ক্রিয়া—এদের বিস্তারিত শ্রেণিবিভাগ ও রূপান্তর। * উপসর্গ: বাংলা, তৎসম এবং বিদেশি উপসর্গ ও তাদের অর্থ। * অনুসর্গ (কর্মপ্রবচনীয়): প্রকারভেদ ও ব্যবহার। * প্রত্যয়: * কৃৎ প্রত্যয় (কৃদন্ত পদ গঠন: বাংলা ও সংস্কৃত) * তদ্ধিত প্রত্যয় (তদ্ধিতান্ত পদ গঠন: বাংলা ও সংস্কৃত) * শব্দগঠন ও উৎস: * তৎসম, অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দ। * পারিভাষিক শব্দ ও মিশ্র শব্দ। * বচন ও লিঙ্গ: * বচন পরিবর্তনের নিয়ম। * লিঙ্গান্তর ও নিত্য-স্ত্রীবাচক শব্দ। অধ্যায় ৪: সমাস ও বাক্য প্রক্রিয়াকরণ (Syntax & Semantics) * সমাস: সমাসের সংজ্ঞা, ব্যাসবাক্য এবং সমস্তপদ। * দ্বন্দ্ব সমাস * কর্মধারয় সমাস * তৎপুরুষ সমাস * বহুব্রীহি সমাস * দ্বিগু সমাস * অব্যয়ীভাব সমাস * নিত্য সমাস, প্রাদি সমাস ও অলুক সমাস * কারক ও বিভক্তি: কারকের প্রকারভেদ এবং বিভক্তি ও অনুসর্গের ব্যবহার। * কর্তৃকারক * কর্মকারক * করণকারক * সম্প্রদানকারক (বা নিমিত্ত কারক) * অপাদানকারক * অধিকরণ কারক কারক নির্ণয় প্রায় সব শ্রেনিতেই থাকে তাই এটি প্রত্যেক ছাত্র ছাত্রীর শেখা বাধ্যতামূলক । একটু পরিশ্রম করলেই খুব সহজেই তারা এটি করতে পারে। কিন্তু আমি বেশিরভাগ ছাত্র ছাত্রীদের এই কারকেও ভয় পেতে দেখেছি । আমার প্রিয় ছাত্র ছাত্রী, তোমাদের আর কারকে ভয় পাবার দরকার নেই। তোমাদের আমি সহাজ সরল পদ্ধতির মাধ্যমে কারক বুঝিয়ে দেবো, যার পর তোমদের আর কখনই কারক ভুল হবেনা। আমি একটা কবিতার মাধ্যমে তোমাদের কারক নির্ণয় শিখিয়ে দেব। কারক নির্ণয়ের কবিতা কারক নির্ণয় যদি মনে প্রাণে কর তাহলে সবার আগে ক্রিয়াপদ ধর। ক্রিয়াকে প্রশ্ন কর নিম্নরূপ ভাবে ক্রিয়াই বলিয়া দেবে কোন কারক হবে। কে > কর্তা কী > কর্ম দ্বারা, দিয়া > করণ হইতে , থেকে > অপাদান কোথায় > অধিকরণ শর্ত ত্যাগের দ্বারা নিমিত্ত কারক হয়। সুস্থ্য মনে কর তোমরা কারক নির্ণয়। এবার আসি প্রশ্ন ও উত্তরে ১। কারক কাকে বলে? ইহা কত প্রকার ও কি কি? কারকঃ ক্রিয়াপদের সঙ্গে বাক্যে অবস্থিত বিশেষ্য, বিশেষণ , সর্বনাম ইত্যাদি পদের সম্পর্ককে কারক বলে। প্রকারভেদঃ বাংলা ভাষায় কারক ছয় রকম। যথা- ১। কর্তৃ কারক , ২। কর্ম কারক, ৩। করণ কারক, ৪। নিমিত্ত কারক, ৫। অপাদান কারক, ৬। অধিকরণ কারক ২। কর্তৃ কারক কাকে বলে ? উদাহরন দাও । উঃ যে পদ বাক্যের ক্রিয়াটি সম্পাদন করে তাকে কর্তৃ কারক বলে। উদাহরণঃ রাজু খেলতে গেল। বুল্বুলিতে ধান খেয়েছে। রাজা ভাত খায়। ৩। কর্ম কারক কাকে বলে ? উদাহরণ দাও। উঃ বাক্যে কর্তা যে কাজটি করে বা ক্রিয়ার যে বিষয় তাকে কর্ম বলে । আর যে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের দ্বারা ক্রিয়ার কর্ম বোঝায় তা কর্মকারক। উদাঃ দিনু বাজনা বাজায়। শুভ ঘুরি ওড়ায় । দাদা ভূগোল পড়ায়। ৪। করণকারক কাকে বলে ? উদাহরণ দাও। উঃ- কর্তা যার দ্বারা কাজটি সম্পন্ন করে তাকে করণ কারক বলে। উদাহরনঃ আলোয় মাঠ ভরে গেছে। সে নৌকায় নদী পার হল। ছুরিতে পেনসিল কাটা হল। ৫। নিমিত্ত কারক কাকে বলে? উদাহরন দাও। উঃ- ক্রিয়াকে কে, কী জন্য বা কী নিমিত্ত দিয়ে প্রশ্ন করলে যে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ পাওয়া যায় , তাকে নিমিত্ত কারক বলে। উদাহরণঃ- জগদীশ্চন্দ্র গবেষণার জন্য অর্থব্যয় করেছিলেন। ত্রাণের জন্য অন্ন ও বস্ত্র দিয়েছে সবাই। উচ্চশিক্ষায় সে বিদেশে পাড়ি দিল। ৬। অপাদান কারক কাকে বলে? উদাহরন দাও। উঃ- যা থেকে কোনো কিছু হওয়া বা ঘটা বোঝায় তাকে অপাদান এবং যে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের দ্বারা এই ঘটা বা হওয়া কাজটি বোঝায় তাকে অপাদান কারক বলে। উদাহরনঃ চোখ দিয়ে জল পড়ছে । বিপদে মোরে রক্ষা করো । সে নৌকা থেকে পড়ে গেল। ৭। অধিকরণ কারক কাকে বলে ? উদাহরণ দাও। উঃ ক্রিয়ার আধারকে ( স্থান, কাল, পাত্র )বলা হয় অধিকরণ কারক। উদাহরণঃ গ্রীষ্মকালে আম হয়। ছাত্রটি ইংরাজিতে কাঁচা । ট্রেন হাওড়া পৌছাল । এতক্ষণ তোমরা যে সমস্ত লেখাগুলো ও উদাহরণ গুলো পড়লে সেগুলো ভালো করে বিশ্লেষণ করে দেখো আমার যে কবিতাটি প্রথমেই দেওয়া আছে সেখান থেকেই সমস্ত উত্তর তোমরা খুঁজে পাবে। আর কোনদিনও কারক করতে গিয়ে তোমাদের অসুবিধায় পড়তে হবেনা। তবে আরও কিছু বিষয় আছে যা না জানলে কারক শেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যায় । আমি তা নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করছি । ১। বিভক্তি কাকে বলে ? উদাহরণ দাও। উঃ - অর্থবোধক শব্দ সমষ্টি প্রকাশ করতে শব্দের সঙ্গে যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি যুক্ত হয় , তাকে বিভক্তি বলে। উদাহরনঃ- র, তে , য়ে ,কে ,এ ইত্যাদি। ২। সম্বন্ধ পদ কাকে বলে ? উদাহরন দাও। উঃ ক্রিয়া পদের সঙ্গে যে পদের যোগ থাকে না , অথচ বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের সঙ্গে যোগ থাকে , সেই পদকে সম্বন্ধ পদ বলে। উদাহরনঃ খাঁচার পাখী ছিল খাঁচার । বনের পাখী ছিল বনে । ছেলেদের জন্য লজেন্স এনো । ৩। সম্বোধন পদ কাকে বলে ? উদাহরণ দাও। উঃ সম্বোধন বা আহ্বান করে যে পদ ব্যাবহার করা হয় তাই সম্বোধন পদ। উদাহরণঃ অহে! কোথায় চললে ? ওরে বাদল , এদিকে আয়। কাকাবাবু, কি যেন বললে । আশা রাখি এবার তোমরা সকলেই খুব ভালোভাবে কারক নির্ণয় * বাক্য: বাক্যের গুণ বা বৈশিষ্ট্য (আকাঙ্ক্ষা, আসক্তি, যোগ্যতা)। * বাক্যের গঠনগত শ্রেণিবিভাগ (সরল, জটিল বা মিশ্র, যৌগিক)। * বাক্যের অর্থগত শ্রেণিবিভাগ (বিবৃতিমূলক, প্রশ্নসূচক, অনুজ্ঞাসূচক, প্রার্থনাসূচক, আবেগসূচক ইত্যাদি)। * বাক্যের রূপান্তর (এক প্রকার বাক্য থেকে অন্য প্রকারে রূপান্তর)। অধ্যায় ৫: অর্থের দিক ও শব্দভাণ্ডার (Semantics & Vocabulary) * সমার্থক শব্দ: বিভিন্ন শব্দের সমার্থক বা প্রতিশব্দ। * বিপরীতার্থক শব্দ: বিপরীত অর্থপ্রকাশক শব্দের ভাণ্ডার। * এককথায় প্রকাশ (বাক্য সংকোচন): বাক্য বা বাক্যাংশকে একটিমাত্র শব্দে প্রকাশ। * বাগধারা ও প্রবচন: ঐতিহ্যবাহী বাগধারা এবং সেগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ ও প্রয়োগ। * সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ (জোড় শব্দ): উচ্চারণ প্রায় এক কিন্তু অর্থ আলাদা এমন শব্দ। * শব্দজোড় ও দ্বিরুক্ত শব্দ: পদাত্মক দ্বিরুক্তি, ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি এবং অনুকার দ্বিরুক্তি। অধ্যায় ৬: ব্যাকরণিক অন্যান্য বিষয় ও অলংকার * কাল (Tense): বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ কালের শ্রেণিবিভাগ এবং তাদের উপবিভাগ। * বাচ্য (Voice): কর্তৃবাচ্য, কর্মবাচ্য, ভাববাচ্য এবং কর্মকর্তৃবাচ্য ও বাচ্যের রূপান্তর। * উক্তি পরিবর্তন (Narration): প্রত্যক্ষ উক্তি থেকে পরোক্ষ উক্তিতে রূপান্তর এবং এর নিয়মাবলি। * বানান ও শুদ্ধিকরণ: * বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানরীতি। * বাক্য ও বানানের সাধারণ ভুল এবং তার সংশোধন। * পদাশ্রিত নির্দেশক: পদাশ্রিত নির্দেশকের ব্যবহার ও প্রয়োজনীয়তা। * ছন্দ, অলংকার ও বিরামচিহ্ন: * বাংলা ছন্দের প্রাথমিক ধারণা (স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত)। * শব্দালংকার ও অর্থালংকার (অনুপ্ৰাস, যমক, শ্লেষ, উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষা)। * বিরামচিহ্ন বা যতিচিহ্নের ব্যবহার ও নাম। অধ্যায় ১: বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ (পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ও উদাহরণ) ১. ভাষা (Language) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা মুখের উচ্চারিত অর্থপূর্ণ ধ্বনির সাহায্যে মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যমকে ভাষা বলে। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, "মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাকযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনিগুলির দ্বারা গঠিত যে সমাজস্বীকৃত প্রতীক, তাকে ভাষা বলে।" ভাষার ৩০টি উদাহরণ (বৈচিত্র্যময় রূপ ও প্রয়োগ) > দ্রষ্টব্য: ভাষা একক কোনো শব্দে সীমিত নয়, তাই ভাষার বিভিন্ন রূপ, আঞ্চলিক প্রকাশ এবং বাকপ্রতিমা বোঝাতে এই উদাহরণগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। > * প্রমিত বাংলা ভাষা (Standard Bengali) * সাধু ভাষা (Literary/Archaic Bengali) * চলিত ভাষা (Colloquial Bengali) * নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা (Dialect) * সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা * চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা * বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা * ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষা * কুষ্টিয়া-যশোরের আঞ্চলিক ভাষা * রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা * চাকমা ভাষা (জাতিগোষ্ঠীর ভাষা) * মারমা ভাষা * গারো ভাষা * সাঁওতালি ভাষা * ইংরেজি ভাষা (English) * আরবি ভাষা (Arabic) * ফার্সি ভাষা (Persian) * হিন্দি ভাষা (Hindi) * উর্দু ভাষা (Urdu) * ফ্রেঞ্চ ভাষা (French) * সাংকেতিক ভাষা (Sign Language) * ব্রেইল ভাষা (Braille - দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের ভাষা) * কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ভাষা (যেমন- পাইথন) * ল্যাটিন ভাষা (প্রাচীন ভাষা) * সংস্কৃত ভাষা (প্রাচীন ভাষা) * পালি ভাষা * প্রাকৃত ভাষা * অপভ্রংশ ভাষা * অসমীয়া ভাষা * ওড়িয়া ভাষা ২. বাংলা ভাষার উৎস ও ক্রমবিকাশ (Origin and Evolution of Bengali) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা বিবর্তিত হয়ে প্রাকৃত ও অপভ্রংশ হয়ে বর্তমান বাংলা ভাষার জন্ম নিয়েছে, তাকে বাংলা ভাষার উৎস ও ক্রমবিকাশ বলে। আনুমানিক খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে (মতান্তরে সপ্তম-অষ্টম শতাব্দী) বাংলা ভাষার রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্রমবিকাশের ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় ও নিদর্শন (উদাহরণ) * ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষা (Indo-European) * ভারতীয় আর্যভাষা (Indo-Aryan) * বৈদিক ভাষা (Vedic Sanskrit) * ধ্রুপদী সংস্কৃত ভাষা (Classical Sanskrit) * পালি ভাষা (Pali) * প্রাকৃত ভাষা (Prakrit - যেমন: সৌরসেনী, মাগধী) * অপভ্রংশ ভাষা (Apabhramsha - যেমন: প্রাচ্য অপভ্রংশ) * চর্যাপদ (বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন, আনুমানিক দশম শতাব্দী) * শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য (মধ্যযুগের প্রারম্ভিক নিদর্শন) * মঙ্গলকাব্যের যুগ (মধ্যযুগের বাংলা ভাষা) * বৈষ্ণব পদাবলী (মধ্যযুগের সাহিত্যের ভাষা) * আরাকান রাজসভার সাহিত্য (দৌলত কাজি, আলাওল) * গদ্যচর্চার সূচনা যুগ (ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, ১৮০১) * ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গদ্যরীতি * বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের ভাষা * রবীন্দ্রযুগের বাংলা ভাষা ও কাব্যের ভাষা * চলিত রীতির প্রবক্তা প্রমথ চৌধুরীর সবুজপত্র পত্রিকা * কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী ও দ্রোহের ভাষা * ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন (মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা) * একুশে ফেব্রুয়ারি (আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস) * বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা (১৯৫৫ সাল) * শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা (১৯৯৯) * প্রমিত বাংলা বানানরীতি প্রণয়ন (বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ) * কম্পিউটারে বাংলা ইউনিকোড প্রবর্তন * ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিতে বাংলার আধুনিক ব্যবহার * ফেসবুকে ব্যবহৃত ‘বাংলা লিপি’ বা ‘বাংলা চ্যাট ভাষা’ * বিজ্ঞানের পরিভাষায় আধুনিক বাংলা শব্দচয়ন * গণমাধ্যমে ব্যবহৃত আধুনিক ইলেকট্রনিক বাংলা * বিশ্বায়নের যুগে বহুমাত্রিক বাংলা ভাষার প্রয়োগ * ডিজিটাল বাংলা ভাষা কোষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বাংলা ৩. ব্যাকরণ (Grammar) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা যে শাস্ত্র পাঠ করলে ভাষার বিভিন্ন উপাদানের প্রকৃতি, গঠন, রূপান্তর এবং শুদ্ধভাবে লেখা, পড়া ও বলার নিয়মকানুন জানা যায়, তাকে ব্যাকরণ বলে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র মতে, "যে শাস্ত্রে ভাষার বিভিন্ন উপাদানের গঠনরীতি ও বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় এবং বিভিন্ন পদের পারস্পরিক সম্বন্ধ নির্ণয় করে শুদ্ধরূপে ভাষা ব্যবহার করার নিয়মকানুন শিখিয়ে দেওয়া হয়, তাকে ব্যাকরণ বলে।" ব্যাকরণের ৩০টি পরিভাষা ও প্রাসঙ্গিক বিষয় (উদাহরণ) * ধ্বনি (Sound) * বর্ণ (Letter) * শব্দ (Word) * পদ (Part of Speech) * বাক্য (Sentence) * কারক (Case) * সমাস (Compound words) * প্রত্যয় (Suffix) * উপসর্গ (Prefix) * সন্ধি (Joining of sounds) * বচন (Number) * লিঙ্গ (Gender) * কাল (Tense) * বাচ্য (Voice) * উক্তি (Narration) * প্রমিত বানান (Standard Spelling) * যতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্ন (Punctuation) * সমার্থক শব্দ (Synonym) * বিপরীতার্থক শব্দ (Antonym) * এককথায় প্রকাশ (One-word substitution) * বাগধারা (Idioms) * প্রবচন (Proverbs) * ছন্দ (Prosody) * অলংকার (Figures of speech) * পরিভাষিক শব্দ (Terminology) * অনুবাদ (Translation) * ভাবার্থ ও সারমর্ম * পত্রলিখন নিয়মাবলী * প্রবন্ধ রচনা কৌশল * ব্যাকরণিক নির্দেশক (Grammatical markers) ৪. বাংলা ব্যাকরণের মূল আলোচ্য বিষয় (Main Branches of Bengali Grammar) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা ভাষা মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করে, আর ভাষাকে সুশৃঙ্খল ও নিয়মবদ্ধ করার জন্য ব্যাকরণকে প্রধানত চারটি ভাগে বা আলোচ্য বিষয়ে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো: ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব এবং অর্থত্বত্ত্ব। ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology) - ১০টি উদাহরণ ধ্বনির উৎপত্তি, উচ্চারণ, বৈশিষ্ট্য, পরিবর্তন এবং বর্ণ সম্পর্কিত আলোচনা। * স্বরবর্ণ (অ, আ, ই, ঈ...) * ব্যঞ্জনবর্ণ (ক, খ, গ, ঘ...) * যুক্তাক্ষর (ক+ষ=ক্ষ, জ+ঞ=জ্ঞ) * ধ্বনির পরিবর্তন বা অপিনিহিতি (আজি > আইজ) * স্বরসঙ্গতি (দেশী > দিশী) * সমীভবন (পদ্ম > পদ্দ) * নাসিক্যীভবন (চাঁদ) * ন-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান * স্বরসন্ধি (বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়) * ব্যঞ্জনসন্ধি (উৎ + চারণ = উচ্চারণ) রূপতত্ত্ব বা শব্দতত্ত্ব (Morphology) - ১০টি উদাহরণ শব্দ ও পদের গঠন, উৎস, রূপান্তর এবং প্রত্যয়-উপসর্গ নিয়ে আলোচনা। 11. বিশেষ্য পদ (নজরুল, নদী) 12. সর্বনাম পদ (সে, তারা) 13. বিশেষণ পদ (নীল আকাশ, চালাক ছেলে) 14. অব্যয় পদ (কিন্তু, এবং) 15. ক্রিয়া পদ (খাচ্ছে, পড়বে) 16. উপসর্গ (অবিরাম, প্রগতি) 17. প্রত্যয় (চল্ + আন = চালনা) 18. লিঙ্গান্তর (ছাত্র > ছাত্রী) 19. বচন পরিবর্তন (বই > বইগুলো) 20. পদাশ্রিত নির্দেশক (বইটি, কলমটা) বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রম (Syntax) - ৫টি উদাহরণ বাক্যের গঠন, বাক্যের বিভিন্ন পদের বিন্যাস এবং কারক-সমাস নিয়ে আলোচনা। 21. সরল বাক্য (রফিক ভালো ছেলে।) 22. জটিল বাক্য (যে পরিশ্রম করে, সেই সফল হয়।) 23. যৌগিক বাক্য (সে গরিব, কিন্তু সৎ।) 24. কারক নির্ণয় (পায় জলে মাছ ধরে - অধিকরণ কারক) 25. সমাস নির্ণয় (সিংহাসন - মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস) অর্থত্বত্ত্ব বা সেমান্টিকস (Semantics) - ৫টি উদাহরণ শব্দ ও বাক্যের অর্থ, অর্থের পরিবর্তন, বাগধারা এবং প্রবচন নিয়ে আলোচনা। 26. সমার্থক শব্দ (সূর্য = রবি, তপন) 27. বিপরীতার্থক শব্দ (উন্নতি = অবনতি) 28. এককথায় প্রকাশ (যা পূর্বে দেখা যায়নি = অদৃষ্টপূর্ব) 29. বাগধারা (অগ্নিগোপক = ক্রুদ্ধ ব্যক্তি) 30. শব্দের অর্থের রূপান্তর (অর্থসংকোচ, অর্থসম্প্রসারণ বা রূপার্থান্তর) অধ্যায় ২: ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology) - পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ও উদাহরণ ১. ধ্বনি ও বর্ণ (Sound and Letter) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা * ধ্বনি (Sound): মানুষের বাকযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত বোধগম্য আওয়াজ বা শব্দকে ধ্বনি বলে। এটি ভাষার ক্ষুদ্রতম একক। * বর্ণ (Letter): ধ্বনির লিখিত রূপ বা প্রতীককে বর্ণ বলে। বাংলা বর্ণমালায় মোট ৫০টি বর্ণ রয়েছে (স্বরবর্ণ ১১টি এবং ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৯টি)। ধ্বনি ও বর্ণের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * অ: অ হলো মৌলিক স্বরধ্বনি এবং এর লিখিত রূপ 'অ'। এটি হ্রস্ব স্বর। * আ: দীর্ঘ স্বরধ্বনি এবং স্বরবর্ণের দ্বিতীয় রূপ। উচ্চারণকালে মুখবিবর বেশি ফাঁক হয়। * ই: সম্মুখস্থ রসস্ব স্বরধ্বনি। উচ্চারণে জিহ্বা সামনে থাকে। * ঈ: দীর্ঘ ই-কার বা দীর্ঘ স্বরধ্বনি। * উ: ওষ্ঠ্য স্বরধ্বনি। ঠোঁট গোল হয়ে উচ্চারিত হয়। * ঊ: দীর্ঘ উ-ধ্বনি। * ঋ: এটি একটি মৌলিক স্বরধ্বনি নয়, ব্যঞ্জনবর্ণের মতো উচ্চারিত হয় (রি)। * এ: অর্ধ-বিবৃত সম্মুখ স্বরধ্বনি। * ঐ: যৌগিক স্বরধ্বনি (ও+ই এর মতো উচ্চারিত হয়)। * ও: ওষ্ঠ্য স্বরধ্বনি। * ঔ: যৌগিক স্বরধ্বনি (ও+উ)। * ক: কণ্ঠ্য ব্যঞ্জনধ্বনি। ক্বচিৎ উচ্চারণকালে কণ্ঠনালীতে বাধা পায়। * খ: অঘোষ মহাপ্রাণ কণ্ঠ্য ধ্বনি। * গ: ঘোষ অল্পপ্রাণ কণ্ঠ্য ধ্বনি। * ঘ: ঘোষ মহাপ্রাণ কণ্ঠ্য ধ্বনি। * ঙ: কণ্ঠ্য নাসিক্য ধ্বনি। * চ: তালব্য অল্পপ্রাণ অঘোষ ধ্বনি। * ছ: তালব্য মহাপ্রাণ অঘোষ ধ্বনি। * জ: তালব্য অল্পপ্রাণ ঘোষ ধ্বনি। * ঝ: তালব্য মহাপ্রাণ ঘোষ ধ্বনি। * ঞ: তালব্য নাসিক্য ধ্বনি। * ট: মূর্ধন্য অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি। জিহ্বার অগ্রভাগ উল্টে মূর্ধায় স্পর্শ করে। * ঠ: মূর্ধন্য অঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনি। * ড: মূর্ধন্য ঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি। * ঢ: মূর্ধন্য ঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনি। * ণ: মূর্ধন্য নাসিক্য ধ্বনি। * ত: দন্ত্য অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি। দাঁতের সাথে জিহ্বার অগ্রভাগ লাগে। * থ: দন্ত্য অঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনি। * দ: দন্ত্য ঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি। * ধ: দন্ত্য ঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনি। ২. উচ্চারণ স্থান (Place of Articulation) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা মুখের অভ্যন্তরের যে সমস্ত অঙ্গ (যেমন—কণ্ঠ, তালু, মূর্ধা, দাঁত, ঠোঁট বা ওষ্ঠ) ফুসফুসতাড়িত বাতাসকে বাধা দিয়ে ধ্বনি উৎপাদনে সাহায্য করে, সেই অঙ্গগুলোর অবস্থানকে উচ্চারণ স্থান বলে। উচ্চারণ স্থানের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * কণ্ঠ্য ধ্বনি (ক, খ, গ, ঘ, ঙ): এগুলো উচ্চারণের সময় কণ্ঠনালী বা আলজিভের মূল ব্যবহৃত হয়। * তালব্য ধ্বনি (চ, ছ, জ, ঝ, ঞ): জিহ্বার মধ্যভাগ তালুর সাথে লেগে এগুলো উচ্চারিত হয়। * মূর্ধন্য ধ্বনি (ট, ঠ, ড, ঢ, ণ): জিহ্বার আগা উল্টে শক্ত তালু বা মূর্ধাকে স্পর্শ করে। * দন্ত্য ধ্বনি (ত, থ, দ, ধ, ন): জিহ্বার আগা ওপরের পাটির দাঁতের গোড়াকে স্পর্শ করে। * ওষ্ঠ্য ধ্বনি (প, ফ, ব, ভ, ম): ওপর ও নিচের ঠোঁটের স্পর্শে বা মিলনে উচ্চারিত হয়। * দন্তমূলীয় বা বর্ষমূলীয় ধ্বনি (র, ল, স, ন, র-জাতীয়): দন্তমূল বা মাড়ি থেকে উচ্চারিত হয়। * তালব্য-উষ্ম ধ্বনি (শ): তালু ও দন্তমূলের মাঝখান থেকে বাতাস বের হয়ে সৃষ্টি হয়। * মূর্ধন্য-উষ্ম ধ্বনি (ষ): মূর্ধা থেকে ঘর্ষণ উৎপন্ন করে উচ্চারিত হয়। * দন্ত্য-উষ্ম ধ্বনি (স): দাঁতের কাছাকাছি ঘর্ষণজাত ধ্বনি। * কণ্ঠনালীয় বা আলজিভজাত ধ্বনি (হ): সরাসরি কণ্ঠনালী বা স্বররন্ধ্র থেকে উৎসারিত হয়। * নাসিক্য ধ্বনি (ঙ, ঞ, ণ, ন, ম): বাতাস মুখ ও নাক দিয়ে একসঙ্গে বের হয়। * অনুস্বার (ং): এটি একটি পরজীবী নাসিক্য ধ্বনি। * বিসর্গ (ঃ): কণ্ঠ্য অঘোষ উষ্ম ধ্বনির অবশেষ। * চন্দ্রবিন্দু (ঁ): স্বরধ্বনির নাসিক্যীকরণ নির্দেশক। * অল্পপ্রাণ ধ্বনি (ক, গ, চ, জ): উচ্চারণে কম বাতাস লাগে। * মহাপ্রাণ ধ্বনি (খ, ঘ, ছ, ঝ): উচ্চারণে বেশি বাতাস বা হ-কারের মতো ধ্বনি থাকে। * অঘোষ ধ্বনি (ক, খ, চ, ছ): স্বরতন্ত্রী কম্পিত হয় না। * ঘোষ ধ্বনি (গ, ঘ, জ, ঝ): স্বরতন্ত্রী কম্পিত হয়। * স্পর্শ ধ্বনি (ক থেকে ম পর্যন্ত ২৫টি): এগুলোকে স্পৃষ্ট ধ্বনিও বলে। * উষ্ম ধ্বনি (শ, ষ, স, হ): ঘর্ষণজাত ধ্বনি। * অন্তঃস্থ ধ্বনি (য, র, ল, ব): স্পর্শ ও উষ্ম ধ্বনির মাঝামাঝি অবস্থান। * পার্শ্বিক ধ্বনি (ল): বাতাস জিহ্বার দুই পাশ দিয়ে বের হয়। * কম্পিত ধ্বনি (র): জিহ্বাপ্রান্ত কেঁপে কেঁপে ওঠে। * তাড়িত ধ্বনি (ড়, ঢ়): জিহ্বাকে দ্রুত একবার সামনে থেকে নিচে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। * যৌগিক স্বরধ্বনি বা দ্বিস্বর (ঐ, ঔ): দুটি স্বর মিলে একটি স্বর তৈরি হয়। * ওষ্ঠ্য স্বরধ্বনি (উ, ঊ, ও, ঔ): ওষ্ঠের আকৃতি পরিবর্তনের মাধ্যমে উচ্চারিত। * সম্মুখ স্বরধ্বনি (ই, ঈ, এ): জিহ্বা সামনের দিকে থাকে। * পশ্চাৎ স্বরধ্বনি (উ, ঊ, ও): জিহ্বা পেছনের দিকে সরে যায়। * বিবৃত স্বরধ্বনি (আ): মুখবিবর পুরোপুরি খোলা থাকে। * সংবৃত স্বরধ্বনি (ই, উ): মুখবিবর তুলনামূলক বন্ধ বা চাপা থাকে। ৩. ধ্বনির পরিবর্তন (Phonological Changes) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা সহজ উচ্চারণের জন্য কিংবা গতিশীলতার কারণে মুখের ভাষায় ধ্বনির যে পরিবর্তন ঘটে, তাকে ধ্বনির পরিবর্তন বলে। এটি ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন প্রক্রিয়ার অংশ। ধ্বনির পরিবর্তনের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * আদিগম (যেমন: গেরাম < গ্রাম): শব্দের আদিতে অতিরিক্ত স্বরধ্বনি যুক্ত হওয়া। * মধ্যগম বা বিপ্রকর্ষ (যেমন: ধর্ম > ধরম): দুটি ব্যঞ্জনের মাঝখানে অতিরিক্ত স্বরধ্বনি আসা। * অন্ত্যগম (যেমন: বেঞ্চ > বেঞ্চি): শব্দের শেষে অতিরিক্ত স্বরধ্বনি যুক্ত হওয়া। * অপিনিহিতি (যেমন: আজি > আইজ): পরের ই-কার বা উ-কার আগে উচ্চারিত হওয়া। * অভিশ্রুতি (যেমন: শুনিয়া > শুনে): অপিনিহিতির পরবর্তী ধাপ, যেখানে স্বরধ্বনির পারস্পরিক সংগতি ঘটে। * প্রগত স্বরসঙ্গতি (যেমন: মুলো > মূলু): আগের স্বরের প্রভাবে পরের স্বর পরিবর্তিত হওয়া। * পরাগত স্বরসঙ্গতি (যেমন: বিলাতি > বিলিতি): পরের স্বরের প্রভাবে আগের স্বর পরিবর্তিত হওয়া। * মধ্যগত স্বরসঙ্গতি (যেমন: শিকারী > শিকিরী): মাঝের স্বর দুই পাশের স্বরের প্রভাবে বদলানো। * অনন্যোন্য স্বরসঙ্গতি (যেমন: মোজা > মুজো): উভয় স্বর পরস্পরের প্রভাবে পরিবর্তিত হওয়া। * প্রগত সমীভবন (যেমন: জন্ম > জম্ম): আগের বর্ণের প্রভাবে পরের বর্ণ পরিবর্তিত হয়ে এক রকম হওয়া। * পরাগত সমীভবন (যেমন: তৎজন্য > তজ্জন্য): পরের বর্ণের প্রভাবে আগের বর্ণ পরিবর্তিত হওয়া। * পারস্পরিক সমীভবন (যেমন: সত্য > সচ্চ): দুটি বর্ণই পরস্পরের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়ে নতুন রূপ নেয়। * বিষমীভবন (যেমন: শরীর > শরীল): দুটি সমবর্ণের একটির পরিবর্তন ঘটিয়ে আলাদা করা। * ব্যঞ্জনবিকৃতি (যেমন: ধোবা > ধোপা): শব্দের কোনো ব্যঞ্জন পরিবর্তিত হয়ে নতুন ব্যঞ্জন হওয়া। * ব্যঞ্জনচ্যুতি (যেমন: বড়দিদি > বড়দি): পাশাপাশি দুটি সমবর্ণের একটি লোপ পাওয়া। * হ-কার লোপ (যেমন: গাহহ > গাহ > গা): শব্দের ভেতরের 'হ' ধ্বনি উবে যাওয়া। * অসমীকরণ (যেমন: ধপা ধপ > ধপা ধপ বা টুপ টুপ > টুটাটুপ): একই শব্দের পুনরাবৃত্তি এড়াতে স্বরধ্বনি যোগ হওয়া। * ক্ষুদ্রায়ন বা অন্ত্যক্ষয় (যেমন: মাস্টার > মাস্ট): শব্দের শেষ অংশ কেটে ছোট করা। * লোপ বা সম্প্রসারণ (যেমন: ফাল্গুন > ফাগুন): ব্যঞ্জনধ্বনি লোপ পাওয়া। * অক্ষরলোপ (যেমন: জানালা > জান্লা): উচ্চারণের সুবিধার্থে অক্ষর উধাও হওয়া। * র-কার লোপ (যেমন: করতা > কত্তা): 'র' বা 'র-ফলা' লোপ পেয়ে আগের ব্যঞ্জন দ্বিত্ব হওয়া। * ঘোষীভবন (যেমন: শাক > সাগ): অঘোষ ধ্বনি ঘোষ ধ্বনিতে রূপান্তরিত হওয়া। * অঘোষীভবন (যেমন: গোলাপ > গোলাফ): ঘোষ ধ্বনি অঘোষ ধ্বনিতে রূপান্তরিত হওয়া। * মহাপ্রাণীকরণ (যেমন: তিন > থিন): অল্পপ্রাণ ধ্বনি মহাপ্রাণে পরিণত হওয়া। * অল্পপ্রাণীকরণ (যেমন: ভাত > বাত): মহাপ্রাণ ধ্বনি অল্পপ্রাণে পরিণত হওয়া। * নাসিক্যীভবন (যেমন: চাঁদ): মুখ দিয়ে উচ্চারিত ধ্বনি নাক দিয়ে উচ্চারিত হওয়া। * বিবৃতীভবন (যেমন: চাকা > চ্যাকো): স্বরধ্বনির উন্মুক্ত উচ্চারণ। * বিপ্রকর্ষ বা স্বরভক্তি (যেমন: রত্ন > রতন): ব্যঞ্জনগুচ্ছ ভাঙতে স্বরধ্বনি আনা। * অন্ত্যহলোপ (যেমন: দেশ > দেস): শব্দের শেষের অক্ষর বা ধ্বনির পরিবর্তন। * অপোসরবণ (যেমন: ধড়াচূড়া): শব্দের আগের অংশ থেকে ধ্বনি পেছনের দিকে সরে যাওয়া। ৪. সন্ধি (Sandhi) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা পাশাপাশি দুটি ধ্বনির মিলন বা কাছাকাছি দুটি বর্ণের মিলনের ফলে যে ধ্বনিগত পরিবর্তন বা একরূফতা সৃষ্টি হয়, তাকে সন্ধি বলে। সন্ধির প্রধান উদ্দেশ্য হলো উচ্চারণের দ্রুততা ও সহজতা রক্ষা করা। সন্ধির ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা (স্বর, ব্যঞ্জন ও বিসর্গ) * বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয় (স্বরসন্ধি): অ/আ-এর পর অ/আ থাকলে উভয়ে মিলে 'আ' হয় (দীঘর্ স্বরসন্ধি)। * রবীন্দ্র = রবি + ইন্দ্র (স্বরসন্ধি): ই/ঈ-এর পর ই/ঈ থাকলে দীর্ঘ 'ঈ' হয়। * পরীক্ষা = পরি + ঈক্ষা (স্বরসন্ধি): ই-কার ও ঈ-কার মিলে দীর্ঘ ঈ-কার হয়েছে। * ভানুযুক্ত = ভানু + উদয় (স্বরসন্ধি): উ-কার ও উ-কার মিলে দীর্ঘ ঊ-কার হয়েছে। * মহোৎসব = মহা + উৎসব (স্বরসন্ধি): আ-এর সাথে উ যুক্ত হয়ে 'ও'কার হয়েছে (গুণসন্ধি)। * সূর্যোদয় = সূর্য + উদয় (স্বরসন্ধি): অ + উ = ও। * মহর্ষি = মহা + ঋষি (স্বরসন্ধি): আ + ঋ = অর্ (রেফ)। * একৈক = এক + এক (স্বরসন্ধি): অ + এ = ঐ (বৃদ্ধি সন্ধি)। * জলৌকা = জল + ওকা (স্বরসন্ধি): অ + ও = ঔ। * প্রতি + এক = প্রত্যেক (স্বরসন্ধি): ই/ঈ-এর পর ভিন্ন স্বর থাকলে ই/ঈ স্থানে 'য়' হয় (যণসন্ধি)। * সু + আগত = স্বাগত (স্বরসন্ধি): উ + আ = ব্বা (ব-ফলা)। * নয়ন = নে + অন (স্বরসন্ধি): এ-এর পর ভিন্ন স্বর থাকলে 'অয়' হয় (অয়া আদিাদি সন্ধি)। * গায়ক = গৈ + অক (স্বরসন্ধি): ঐ-এর পর স্বর থাকলে 'আয়' হয়। * পবন = পো + অন (স্বরসন্ধি): ও-এর পর স্বর থাকলে 'অব' হয়। * গবাক্ষ = গো + অক্ষ (স্বরসন্ধি): ও + অ = অব। * উচ্চারণ = উৎ + চারণ (ব্যঞ্জনসন্ধি): ত-এর পর চ থাকলে ত-এর জায়গায় চ হয়। * বিপদজনক = বিপদ + জনক (ব্যঞ্জনসন্ধি): দ-এর সাথে জ যুক্ত হয়ে জ-ফলা হয়েছে। * দিগন্ত = দিক + অন্ত (ব্যঞ্জনসন্ধি): বর্গের প্রথম ধ্বনি ক-এর পরে স্বরধ্বনি আসায় গ হয়েছে। * জগদীশ = জগৎ + ঈশ (ব্যঞ্জনসন্ধি): ত-এর জায়গায় দ হয়েছে। * সংবাদ = সম্ + বাদ (ব্যঞ্জনসন্ধি): ম-এর পরে ব থাকায় ম স্থানে অনুস্বার (ং) হয়েছে। * পদ্ধতি = পথ্ + হতি (ব্যঞ্জনসন্ধি): ত + হ মিলে দ্ধ হয়েছে। * উল্লাস = উৎ + উল্লাস (ব্যঞ্জনসন্ধি): ত-এর পর ল থাকায় ত ল-এ রূপান্তরিত হয়েছে। * সৎকর্ম = সৎ + কর্ম (ব্যঞ্জনসন্ধি): ব্যঞ্জনে ব্যঞ্জনে মিলনের নিখাদ রূপ। * পরিচ্ছেদ = পরি + চেদ (ব্যঞ্জনসন্ধি): স্বরধ্বনির পরে ছ থাকলে চ্ছ হয়। * সম্পূর্ণ = সম্ + পূর্ণ (ব্যঞ্জনসন্ধি): ম-এর পর প থাকলে ম স্থানে অনুস্বার বা ম বহাল থাকে। * নিস্তব্ধ = নিস্ + স্তব্ধ (বিসর্গসন্ধি): বিসর্গের পরে স থাকলে বিসর্গ স্থানে স হয়। * মনোহর = মনঃ + হর (বিসর্গসন্ধি): বিসর্গ অ-কারের পরে থাকলে তা 'ও'কারে পরিণত হয়। * আশীর্বাদ = আঃ + বাদ (বিসর্গসন্ধি): বিসর্গ লোপ পেয়ে রেফ বা র-কার হয়েছে। * দুর্গম = দুঃ + গম (বিসর্গসন্ধি): বিসর্গ স্থানে 'র্' বা রেফ হয়েছে। * অহর্নিশ = অহঃ + নিশ (বিসর্গসন্ধি): বিসর্গ স্থানে র-কার যুক্ত হয়েছে। অধ্যায় ৩: শব্দ ও রূপতত্ত্ব (Morphology) - পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ও উদাহরণ ১. শব্দ ও পদ (Word and Part of Speech) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা * শব্দ (Word): এক বা একাধিক ধ্বনির মিলনে তৈরি অর্থপূর্ণ একককে শব্দ বলে (যেমন: কলম, আকাশ)। * পদ (Part of Speech): বাক্যে ব্যবহারের উপযোগী করার জন্য যখন কোনো শব্দের সাথে বিভক্তি যুক্ত করা হয়, তখন তাকে পদ বলে। অর্থাৎ, বিভক্তিযুক্ত শব্দই হলো পদ। শব্দ ও পদের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * বই (শব্দ): স্বাধীন অর্থপ্রকাশক ধ্বনিসমষ্টি। বাক্যে ব্যবহারের আগে এটি কেবল শব্দ। * বইটি (পদ): 'বই' শব্দের সাথে 'টি' পদাশ্রিত নির্দেশক যুক্ত হয়ে এটি পদে পরিণত হয়েছে। * কলম (শব্দ): লেখার মাধ্যম বোঝায়, যা একটি স্বাধীন শব্দ। * কলমে (পদ): 'কলম' শব্দের সাথে 'এ' বিভক্তি যুক্ত হয়ে এটি করণ কারকপদ হয়েছে। * ছেলে (শব্দ): মানবশিশু বা বালক নির্দেশক শব্দ। * ছেলেরা (পদ): 'এরা' বিভক্তি বা বহুবচনাত্মক রূপ যুক্ত হয়ে এটি কর্তৃকারক পদ হয়েছে। * পড় (শব্দ): ধাতুমূল বা ক্রিয়ামূল। * পড়ছে (পদ): ধাতুর সাথে কালসূচক ও পুরুষসূচক বিভক্তি যুক্ত হয়ে গঠিত ক্রিয়াপদ। * সুন্দর (শব্দ): গুণবাচক শব্দ বা বিশেষণ। * সুন্দরটি (পদ): বিভক্তিযুক্ত হয়ে এটি বিশেষ্য বা বিশেষণের পদরূপ নিয়েছে। * নদী (শব্দ): প্রাকৃতিক জলস্রোতের নাম। * নদীতে (পদ): অধিকরণ কারকে 'তে' বিভক্তিযুক্ত পদ। * গোলাপ (শব্দ): ফুলের নামবাচক শব্দ। * গোলাপের (পদ): সম্বন্ধ পদে 'এর' বিভক্তি যুক্ত রূপ। * আমি (পদ): সর্বনাম পদ (উত্তম পুরুষ)। * তুমি (পদ): সর্বনাম পদ (মধ্যম পুরুষ)। * সে (পদ): সর্বনাম পদ (প্রথম পুরুষ)। * এবং (পদ): অব্যয় পদ (দুটি শব্দ বা বাক্যকে যুক্ত করে)। * কিন্তু (পদ): অব্যয় পদ (বিরোধ বা বিপরীত ভাব প্রকাশ করে)। * অথবা (পদ): বিকল্প বোঝাতে ব্যবহৃত অব্যয় পদ। * আহা (পদ): আবেগবাচক অব্যয় পদ। * খাচ্ছে (পদ): বর্তমান কালের সকর্মক ক্রিয়াপদ। * গেল (পদ): সাধারণ অতীত কালের ক্রিয়াপদ। * আসবে (পদ): সাধারণ ভবিষ্যৎ কালের ক্রিয়াপদ। * ভালো (পদ): গুণবাচক বিশেষণ পদ। * লাল (পদ): বর্ণবাচক বিশেষণ পদ। * দশ (পদ): সংখ্যাবাচক বিশেষণ পদ। * খুব (পদ): পরিমাণবাচক বা অবস্থা নির্দেশক বিশেষণ পদ। * ধীরে (পদ): ক্রিয়া-বিশেষণ পদ। * আচমকা (পদ): অব্যয়জাত ক্রিয়া-বিশেষণ পদ। ২. পদের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Parts of Speech) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বাংলা ভাষায় বাক্য গঠনের সুবিধার্থে পদকে প্রধানত পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে: বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, অব্যয় এবং ক্রিয়া। পদের শ্রেণিবিভাগের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * নজরুল ইসলাম (বিশেষ্য - নামবাচক): নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা কবির নাম। * পদ্মা নদী (বিশেষ্য - নামবাচক): নির্দিষ্ট একটি নদীর নাম। * বাংলাদেশ (বিশেষ্য - নামবাচক): নির্দিষ্ট একটি দেশের নাম। * সোনারগাঁ (বিশেষ্য - নামবাচক): নির্দিষ্ট একটি ঐতিহাসিক স্থানের নাম। * মানুষ (বিশেষ্য - জাতিবাচক): সমগ্র মানবজাতিকে বোঝায়। * পাখি (বিশেষ্য - জাতিবাচক): সকল ধরনের পাখির সাধারণ নাম। * ছাত্র (বিশেষ্য - জাতিবাচক): শিক্ষার্থী সম্প্রদায়কে নির্দেশ করে। * দল (বিশেষ্য - সমষ্টিবাচক): মানুষের একটি দল বা সংঘ। * সভা (বিশেষ্য - সমষ্টিবাচক): একত্রিত মানুষের সমাগম। * ঝাঁক (বিশেষ্য - সমষ্টিবাচক): পাখি বা মাছের দল। * মিষ্টি (বিশেষ্য - বস্তুবাচক বা উপাদান): যা খাওয়া যায় বা পরিমাপ করা যায় (এখানে বস্তু হিসেবে)। * পানি (বিশেষ্য - বস্তুবাচক): তরল উপাদান বা পদার্থ। * লোহা (বিশেষ্য - বস্তুবাচক): ধাতুবাচক উপাদান। * ভিয়েন (বিশেষ্য - ভাববাচক): ক্রিয়ার ভাব বা কাজের নাম (যেমন: ভোজন)। * সততা (বিশেষ্য - গুণবাচক): মানুষের ভেতরের নৈতিক গুণ। * দয়া (বিশেষ্য - গুণবাচক): মনের কোমল ভাব বা গুণ। * আমি (সর্বনাম - ব্যক্তিবাচক): বক্তা নিজে। * তোমরা (সর্বনাম - ব্যক্তিবাচক): মধ্যম পুরুষের বহুবচন। * তারা (সর্বনাম - ব্যক্তিবাচক): প্রথম পুরুষের বহুবচন। * নিজে (সর্বনাম - আত্মবাচক): স্বয়ং বা খোদ অর্থে। * কে (সর্বনাম - প্রশ্নবাচক): প্রশ্ন করার জন্য ব্যবহৃত শব্দ। * যা (সর্বনাম - সম্বন্ধবাচক বা সংযোগমূলক): নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের সাথে সংযোগ রক্ষাকারী। * নীল আকাশ (বিশেষেশন - রূপবাচক): আকাশের গুণ বা রঙ প্রকাশ করছে। * চালাক ছেলে (বিশেষণ - গুণবাচক): ছেলের বুদ্ধিমত্তা বোঝাচ্ছে। * পাচন কিল (বিশেষণ - সংখ্যাবাচক): নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্দেশক। * এবং (অব্যয় - পদান্বয়ী বা সংযোজক): দুটি শব্দকে একসাথে জুড়ছে। * যদি... তবে (অব্যয় - শর্তবাচক): শর্তযুক্ত বাক্য গঠনে সাহায্য করে। * লেখপড়া (ক্রিয়া): কোনো কাজ সম্পন্ন করা বোঝায়। * ঘুমাচ্ছে (ক্রিয়া): বর্তমানে চলমান কাজ। * খেলেছিল (ক্রিয়া): অতীতকালের সম্পন্ন কাজ। ৩. উপসর্গ (Prefix) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা যেসব অব্যয়সূচক শব্দ মূল শব্দ বা ধাতুর পূর্বে বসে নতুন অর্থবোধক শব্দ তৈরি করে এবং শব্দের অর্থের সংকোচন, সম্প্রসারণ বা পরিবর্তন ঘটায়, সেগুলোকে উপসর্গ বলে। বাংলা ভাষায় উপসর্গ তিন প্রকার: বাংলা, তৎসম (সংস্কৃত) ও বিদেশি উপসর্গ। উপসর্গের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * অঘা (অঘারাম / অঘোর): বাংলা উপসর্গ, যা নিন্দিত বা অপদার্থ অর্থে বসে। * অজ (অজমূর্খ): বাংলা উপসর্গ, যা খাঁটি বা বোকা অর্থে ব্যবহৃত হয়। * অনা (অনাবৃষ্টি): বাংলা উপসর্গ, যা অভাব বা না-বাচক অর্থে বসে। * আ (আকাঙ্ক্ষা / আজীবন): বাংলা উপসর্গ, যা পর্যন্ত বা সম্পূর্ণতা বোঝায়। * আর্ক (আর্কাটা): আঞ্চলিক বা বাংলা উপসর্গ, যা বাঁকা অর্থে বসে। * ইতি (ইতিহাস): তৎসম উপসর্গ (প্রাচীন অর্থে)। * নি (নিদারুণ): বাংলা উপসর্গ, যা তীব্রতা বা আধিক্য বোঝায়। * পাতি (পাতিহাঁস / পাতিবুলবুলি): বাংলা উপসর্গ, যা ছোট বা সাধারণ অর্থে বসে। * রাম (রামদা / রামবোকা): বাংলা উপসর্গ, যা বড় বা শ্রেষ্ঠ অর্থে ব্যবহৃত হয়। * সাঁ (সাঁঝবেলা): বাংলা উপসর্গ, যা খাঁটি বা আসল অর্থে বসে। * হা (হাভাত / হাপিত্যেশ): বাংলা উপসর্গ, যা অভাব বা শূন্যতা বোঝায়। * প্র (প্রগতি / প্রধান): তৎসম উপসর্গ, যা উৎকর্ষ বা সামনের দিকে গতি বোঝায়। * পরা (পরাজয়): তৎসম উপসর্গ, যা বিপরীত বা উল্টো বোঝায়। * অপ (অপমান): তৎসম উপসর্গ, যা মন্দ বা নিচতা বোঝায়। * সম (সমষ্টি / সংলাপ): তৎসম উপসর্গ, যা সম্যক বা পূর্ণতা বোঝায়। * নিব (নিবৃত্তি): তৎসম উপসর্গ (নিঃ বা নিব)। * অব (অবহেলা): তৎসম উপসর্গ, যা নিম্নগামিতা বা অবমূল্যায়ন বোঝায়। * অনু (অনুসরণ): তৎসম উপসর্গ, যা পশ্চাৎ বা অনুগমন বোঝায়। * অবিত (অবিতর্কিত): তৎসম উপসর্গজাত। * নির (নির্দোষ): তৎসম উপসর্গ, যা অভাব বা না-বাচকতা বোঝায়। * দুর (দুর্গম): তৎসম উপসর্গ, যা কঠিন বা মন্দ অর্থে বসে। * বি (বিখ্যাত): তৎসম উপসর্গ, যা বিশেষত্ব বোঝায়। * অভি (অভিযোগ): তৎসম উপসর্গ, যা অভিমুখে বা দিকে বোঝায়। * অতি (অতিরিক্ত): তৎসম উপসর্গ, যা প্রাচুর্য বা মাত্রাতিরিক্ততা বোঝায়। * সু (সুনাম): তৎসম উপসর্গ, যা ভালো বা কল্যাণকর অর্থে বসে। * উৎ (উৎসব): তৎসম উপসর্গ, যা উচ্চ বা উদ্দীপনা বোঝায়। * পরি (পরিবেশ): তৎসম উপসর্গ, যা চতুর্দিক বা পরিবেষ্টন বোঝায়। * প্রতি (প্রতিধ্বনি): তৎসম উপসর্গ, যা বিপরীত বা অনুকূল অর্থে বসে। * অপি (অপিচ): তৎসম উপসর্গ, যা সংযোগ বা সংযোজন বোঝায়। * উপ (উপভাষা): তৎসম উপসর্গ, যা ক্ষুদ্র বা সাদৃশ্য বোঝায়। ৪. অনুসর্গ বা কর্মপ্রবচনীয় (Prepositions / Postpositions) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা যেসব শব্দ বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের পরে বসে কারক বা বিভক্তির কাজ সম্পন্ন করে এবং শব্দের অর্থ প্রকাশে সহায়তা করে, সেগুলোকে অনুসর্গ (বা কর্মপ্রবচনীয়) বলে। অনুসর্গের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * কর্তৃক (যেমন: শত্রু কর্তৃক বিজিত): কর্মকারকে বা দ্বরা অর্থে ব্যবহৃত অনুসর্গ। * দ্বারা (যেমন: কলম দ্বারা লেখা): মাধ্যম বা করণ কারকে ব্যবহৃত হয়। * দিয়ে (যেমন: ব্লেড দিয়ে কাটা): সাধারণ মাধ্যম বা উপকরণ বোঝাতে। * হাতে (যেমন: হাতে গড়া): মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত অনুসর্গ। * হতে (যেমন: নদী হতে পানি): উৎস বা অপাদান কারকে বসে। * থেকে (যেমন: ঢাকা থেকে আসা): দূরত্ব বা উৎস বোঝাতে। * চেয়ে (যেমন: এর চেয়ে ভালো): তুলনা বোঝাতে ব্যবহৃত অনুসর্গ। * পড়ে (যেমন: তিন দিন পরে): সময় বা কাল বোঝাতে। * জন্য (যেমন: দেশের জন্য ভালোবাসা): নিমিত্ত বা উদ্দেশ্য বোঝাতে। নিমিত্ত কারকে বসে। * নিমিত্ত (যেমন: জ্ঞাননিমিত্ত তপস্যা): জন্য অর্থে সংস্কৃত অনুসর্গ। * বিনা (যেমন: বিনা মেঘে বজ্রপাত): অভাব বা ব্যতিরেকে বোঝাতে। * ছাড়া (যেমন: তুমি ছাড়া কেউ নেই): ব্যতিরেকে বা বর্জিত অর্থে। * বাদে (যেমন: এক ঘণ্টা বাদে): সময় বা ব্যবধান বোঝাতে। * সঙ্গে (যেমন: ভাইয়ের সঙ্গে যাওয়া): সাহচর্য বা একত্রে থাকা বোঝাতে। * সাথে (যেমন: বন্ধুর সাথে কথা): সাহচর্য বোঝাতে। * পক্ষে (যেমন: গরিবের পক্ষে ভালো): অনুকূল অবস্থা বোঝাতে। * প্রতি (যেমন: মাটির প্রতি টান): অভিমুখে বা দিক বোঝাতে। * মাঝখানে (যেমন: দুই ভাইয়ের মাঝখানে): স্থানবাচক অনুসর্গ। * বরাবর (যেমন: নদী বরাবর চলা): দিক বা পথ নির্দেশক। * অভিমুখে (যেমন: ঘরের অভিমুখে যাত্রা): দিক বা লক্ষ্য বোঝাতে। * পানে (যেমন: আকাশের পানে চাওয়া): দিক নির্দেশক অনুসর্গ। * পারিয়া (যেমন: কাজ পারিয়া): অসমাপিকা ক্রিয়াজাত অনুসর্গ। * তরে (যেমন: পরান তরে): কাব্যিক অর্থে জন্য বা প্রতি বোঝাতে। * কাছে (যেমন: শিক্ষকের কাছে শিক্ষা): স্থান বা সান্নিধ্য বোঝাতে। * পেছনে (যেমন: বাড়ির পেছনে বাগান): স্থানবাচক অনুসর্গ। * সামনে (যেমন: স্টেজের সামনে দর্শক): স্থান বা অবস্থান বোঝাতে। * উপরে (যেমন: টেবিলের উপরে বই): ওপরের তল নির্দেশ করতে। * নিচে (যেমন: খাটের নিচে বল): নিচের তল বা অবস্থান বোঝাতে। * ভেতরে (যেমন: ঘরের ভেতরে মানুষ): অন্তর্বর্তী স্থান বোঝাতে। * বাইরে (যেমন: শহরের বাইরে বাসা): বহির্দেশ বোঝাতে। ৫. প্রত্যয় (Suffixes) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা শব্দ বা ধাতুর পরে যে ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে, তাকে প্রত্যয় বলে। প্রত্যয় প্রধানত দুই প্রকার: কৃৎ প্রত্যয় (ধাতুর সাথে যুক্ত হয়) এবং তদ্ধিত প্রত্যয় (শব্দের সাথে যুক্ত হয়)। প্রত্যয়ের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা (কৃৎ ও তদ্ধিত) * চল্ + আন = চালনা (কৃৎ প্রত্যয়): ক্রিয়ামূল 'চল্'-এর সাথে 'আন' যুক্ত হয়ে বিশেষ্য পদ হয়েছে। * পড়্ + আ = পড়া (কৃৎ প্রত্যয়): ধাতু ও প্রত্যয়ের মিলনে গঠিত কৃদন্ত শব্দ। * খুদ্ + আই = खुदाई/খোদাই (কৃৎ প্রত্যয়): কাজের নাম বোঝাচ্ছে। * ঘাট্ + ই = ঘাটি (কৃৎ প্রত্যয়): স্থান বা ভাব বোঝাতে। * চল্ + অন্ত = চলতি (কৃৎ প্রত্যয়): বিশেষণের রূপ দিচ্ছে। * কৃ + তব্য = কর্তব্য (কৃৎ প্রত্যয়): উচিত বা করণীয় অর্থে। * ভিজ + আ = ভেজা (কৃৎ প্রত্যয়): অবস্থা বা গুণবাচক শব্দ। * কাট্ + উয়া = কাটুয়া (কৃৎ প্রত্যয়): স্বভাব বা পেশা বোঝাতে। * ধো + আ = ধোয়া (কৃৎ প্রত্যয়): কর্মের ফল প্রকাশকারী। * গাই + অক = গায়ক (কৃৎ প্রত্যয়): কর্তা বোঝাতে 'অক' প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে। * বক্তা (বচ + তৃ): কথা বলা ব্যক্তি। * শ্রোতা (শ্রু + তৃ): শোনার কাজ করছে যে। * দায়ক (দা + অক): দান করে যে। * পাচক (পচ্ + অক): রান্না করে যে। * ভোক্তা (ভুজ + তৃ): ভোগ করে যে। * ঢাকা + আই = ঢাকাই (তদ্ধিত প্রত্যয়): বিশেষ্য শব্দের সাথে যুক্ত হয়ে বিশেষণের রূপ নিয়েছে (স্থানবাচক)। * কামার + আ = কামারশালা বা কামরা (তদ্ধিত প্রত্যয়): পেশাভিত্তিক শব্দ। * মুখ + ইক = মৌখিক (তদ্ধিত প্রত্যয়): মুখের সাথে সম্পর্কিত বোঝাতে। * সমাজ + ইক = সামাজিক (তদ্ধিত প্রত্যয়): গুণ বা সম্বন্ধ বোঝাতে। * বছর + ইয়া = বাৎসরিক (তদ্ধিত প্রত্যয়): সময়ভিত্তিক তদ্ধিতান্ত শব্দ। * জল + ময় = জলময় (তদ্ধিত প্রত্যয়): পরিপূর্ণতা অর্থে 'ময়' প্রত্যয়। * পঙ্ক + ইল = পঙ্কিল (তদ্ধিত প্রত্যয়): কাদাযুক্ত অর্থে 'ইল' প্রত্যয়। * বন্য (বন + য): বনে উৎপন্ন বা বন্য স্বভাবের। * স্বর্ণ + ময়ী = স্বর্ণময়ী (তদ্ধিত প্রত্যয়): উপাদান বা তৈরি অর্থে। * ধনী (ধন + ইন): ধনসম্পদ আছে যার। * বুদ্ধিমতী (বুদ্ধিমত + ঈ): স্ত্রীবাচক তদ্ধিত প্রত্যয়। * বাঙালি (বাংলা + ই): জাতির নাম বোঝাতে তদ্ধিত প্রত্যয়। * মেছো (মাছ + উয়া = মেছো): স্বভাব বা পেশা বোঝাতে। * হাতি + আ = হাতিয়া বা হাতুড়ে (তদ্ধিত প্রত্যয়): বিশেষ শব্দগঠন। * মিষ্টি + ই = মিষ্টি (তদ্ধিত প্রত্যয়): স্বাদ বা বৈশিষ্ট্যবাচক। ৬. শব্দগঠন ও উৎস (Word Formation and Etymology) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা উৎস বা উৎপত্তি অনুসারে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে প্রধানত পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে: তৎসম, অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশি এবং বিদেশি শব্দ। শব্দগঠন ও উৎসের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * চন্দ্র (তৎসম শব্দ): সংস্কৃত ভাষা থেকে সরাসরি বাংলায় এসেছে এবং অপরিবর্তিত রয়েছে। * সূর্য (তৎসম শব্দ): সংস্কৃত শব্দ, বাংলায় সরাসরি ব্যবহৃত হয়। * নদী (তৎসম শব্দ): খাঁটি সংস্কৃত উৎসজাত শব্দ। * আকাশ (তৎসম শব্দ): অপিরিভর্তিত সংস্কৃত শব্দ। * বৃক্ষ (তৎসম শব্দ): সংস্কৃত ভাষার উদ্ভিদবাচক শব্দ। * জোৎস্না (অর্ধতৎসম শব্দ): সংস্কৃত 'জ্যোৎস্না' শব্দ সামান্য পরিবর্তিত হয়ে প্রচলিত হয়েছে (জোসনা)। * গিন্নি (অর্ধতৎসম শব্দ): ইংরেজি 'গৃহিণী' বা সংস্কৃত 'গৃহিণী' থেকে বিকৃত হয়ে এসেছে। * সেরা (অর্ধতৎসম শব্দ): সংস্কৃত 'শ্রেষ্ঠ' থেকে রূপান্তরিত। * বৌদি (অর্ধতৎসম শব্দ): বউদিদি থেকে সংক্ষিপ্ত ও বিকৃত রূপ। * কুৎসিত (অর্ধতৎসম শব্দ): আংশিক পরিবর্তিত তৎসম শব্দ। * হাত (তদ্ভব শব্দ): সংস্কৃত 'হস্ত' থেকে প্রাকৃত হয়ে বাংলায় এসেছে (হস্ত > হত্ত > হাত)। * কান (তদ্ভব শব্দ): সংস্কৃত 'কর্ণ' থেকে প্রাকৃত হয়ে বাংলায় বিবর্তিত। * চাঁদ (তদ্ভব শব্দ): সংস্কৃত 'চন্দ্র' থেকে বিবর্তিত হয়ে উদ্ভূত। * মাছ (তদ্ভব শব্দ): সংস্কৃত 'মৎস্য' থেকে প্রাকৃত হয়ে বাংলায় এসেছে। * দুধ (তদ্ভব শব্দ): সংস্কৃত 'দুগ্ধ' থেকে বিবর্তিত। * কুলা (দেশি শব্দ): বাংলাদেশের আদি অধিবাসীদের (অস্ট্রিক বা দ্রাবিড়) ভাষা থেকে আগত। * কুড়ে ঘর (দেশি শব্দ): দেশি বা আঞ্চলিক শব্দভাণ্ডারের অংশ। * ঢেঁকি (দেশি শব্দ): ধান ভানার দেশি যন্ত্রবাচক শব্দ। * চুলা (দেশি শব্দ): স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে জড়িত শব্দ। * খোকা (দেশি শব্দ): দেশীয় শব্দের চমৎকার উদাহরণ। * কলম (বিদেশি শব্দ - আরবি): আরবি ভাষা থেকে বাংলায় প্রবেশ করেছে। * বই (বিদেশি বা ফার্সি প্রভাবযুক্ত): বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে আগত। * আদালত (বিদেশি শব্দ - আরবি): বিচারালয় অর্থে আরবি শব্দ। * চাকরি (বিদেশি শব্দ - তুর্কি): তুর্কি ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় গৃহিত। * দারোগা (বিদেশি শব্দ - তুর্কি): পুলিশ কর্মকর্তা অর্থে ব্যবহৃত তুর্কি শব্দ। * চাবি (বিদেশি শব্দ - পর্তুগিজ): পর্তুগিজ ভাষা থেকে বাংলায় এসেছে। * সাবান (বিদেশি শব্দ - পর্তুগিজ): পরিষ্কারক উপাদান বোঝাতে পর্তুগিজ শব্দ। * মাস্টার (বিদেশি শব্দ - ইংরেজি): ইংরেজি ভাষা থেকে সরাসরি গৃহীত। * হাসপাতাল (বিদেশি শব্দ - ইংরেজি): চিকিৎসা কেন্দ্র অর্থে ইংরেজি শব্দ (Hospital)। * হেডমাস্টার (মিশ্র শব্দ): ইংরেজি 'Head' + তৎসম 'Master' মিলে গঠিত মিশ্র শব্দ। ৭. বচন ও লিঙ্গ (Number and Gender) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা * বচন (Number): ব্যাকরণে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের সংখ্যাগত ধারণা (একবচন বা বহুবচন) প্রকাশ করার উপায়কে বচন বলে। * লিঙ্গ (Gender): যে চিহ্ন বা শব্দ দ্বারা কোনো বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের পুরুষ, স্ত্রী কিংবা উভয় বা ক্লীব (অচেতন) অবস্থা বোঝা যায়, তাকে লিঙ্গ বলে। বচন ও লিঙ্গের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * বই (একবচন): একটি মাত্র বই বোঝাচ্ছে। * বইগুলো (বহুবচন): 'গুলো' প্রত্যয় যুক্ত হয়ে একাধিক বই বোঝাচ্ছে। * ছাত্ররা (বহুবচন): 'রা' বিভক্তিযুক্ত ছাত্রের বহুবচন রূপ। * পাখিরা (বহুবচন): প্রাণিবাচক বিশেষ্যে বহুবচন রূপ। * মণ্ডলী (বহুবচন বা সমষ্টিবাচক): শিক্ষকমণ্ডলী (সম্মানিত বহুবচন)। * বৃন্দ (বহুবচন): ভক্তবৃন্দ (সম্মানসূচক সমষ্টি)। * বর্গ (বহুবচন): পশুবর্গ বা মণ্ডলী অর্থে। * কুল (বহুবচন): পক্ষীকুল (প্রাণিবাচক বহুবচন)। * সব (বহুবচন): সব মানুষ (সাধারণ বহুবচন নির্দেশক)। * সকল (বহুবচন): সকল শিক্ষার্থী। * বাবা (পুংলিঙ্গ): পুরুষবাচক বিশেষ্য পদ। * মা (স্ত্রীলিঙ্গ): স্ত্রীবাচক বিশেষ্য পদ। * ভাই (পুংলিঙ্গ): পুরুষ ভাই। * বোন (স্ত্রীলিঙ্গ): নারী বা বোন নির্দেশক। * ছাত্র (পুংলিঙ্গ): পুরুষ শিক্ষার্থী। * ছাত্রী (স্ত্রীলিঙ্গ): নারী শিক্ষার্থী। * লেখক (পুংলিঙ্গ): পুরুষ সাহিত্যিক। * লেখিকা (স্ত্রীলিঙ্গ): নারী সাহিত্যিক। * নিত্য-পুংলিঙ্গ শব্দ (যেমন: কবিরাজ, কৃতদার): যাদের কোনো স্ত্রীবাচক রূপ হয় না। * নিত্য-স্ত্রীবাচক শব্দ (যেমন: সতীন, এয়োস্ত্রী): যাদের কোনো পুরুষবাচক রূপ নেই। * উভলিঙ্গ শব্দ (যেমন: শিশু, মানুষ, সন্তান): যা নারী বা পুরুষ উভয়কেই বোঝাতে পারে। * ক্লীবলিঙ্গ বা জড়পদার্থবাচক (যেমন: বই, কলম, পাথর): প্রাণহীন বস্তুবাচক লিঙ্গ। * মোরগ (পুংলিঙ্গ) > মুরগি (স্ত্রীলিঙ্গ): ভিন্ন শব্দের সাহায্যে লিঙ্গান্তর। * পিতা (পুংলিঙ্গ) > মাতা (স্ত্রীলিঙ্গ): ভিন্ন শব্দের রূপান্তর। * পাগল (পুংলিঙ্গ) > পাগলি (স্ত্রীলিঙ্গ): প্রত্যয়যুক্ত লিঙ্গান্তর। * ব্যাঘ্র (পুংলিঙ্গ) > ব্যাঘ্রী (স্ত্রীলিঙ্গ): দীর্ঘী-কার যুক্ত স্ত্রীবাচক রূপ। * নর (পুংলিঙ্গ) > নারী (স্ত্রীলিঙ্গ): চিরাচরিত লিঙ্গান্তর। * সম্রাট (পুংলিঙ্গ) > সম্রাজ্ঞী (স্ত্রীলিঙ্গ): বিশেষ নিয়মে গঠিত স্ত্রীলিঙ্গ। * বর (পুংলিঙ্গ) > কণে বা কনে (স্ত্রীলিঙ্গ): ভিন্ন শব্দরূপ। * বিদ্বান (পুংলিঙ্গ) > বিদুষী (স্ত্রীলিঙ্গ): সংস্কৃত নিয়মে গঠিত বিশেষ স্ত্রীলিঙ্গ। অধ্যায় ৪: সমাস ও বাক্য প্রক্রিয়াকরণ (Syntax & Semantics) - পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ও উদাহরণ 

সমাস কী?
দুই বা ততোধিক পদের সংযোগে যদি একটি নতুন পদ গঠিত হয় এবং সেই পদের মধ্যে থাকা অব্যয় বা বিভক্তি লোপ পায়, তখন তাকে সমাস বলে। সমাসের ফলে বাক্য সংক্ষিপ্ত হয় এবং অর্থ গম্ভীর হয়।

সমাসের প্রকারভেদ:
সমাস প্রধানত চার প্রকার—
১. দ্বন্দ্ব সমাস
2. তৎপুরুষ সমাস
3. দ্বিগু সমাস
4. বহুব্রীহি সমাস

এছাড়াও অব্যয়ীভাব সমাস এবং কর্মধারয় সমাসও গুরুত্বপূর্ণ।

১. দ্বন্দ্ব সমাস
যে সমাসে দুই বা ততোধিক পদের প্রত্যেকটি সমান গুরুত্ব পায় এবং তাদের অর্থ বজায় থাকে, তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে।

উদাহরণ:
পিতা-মাতা (পিতা ও মাতা)
রাম-লক্ষ্মণ (রাম এবং লক্ষ্মণ)
হরি-হর (হরি ও হর)
২. তৎপুরুষ সমাস
যে সমাসে পূর্বপদ পরপদকে বিশেষণ বা বিশেষ্য রূপে বোঝায় এবং পরপদ প্রধান থাকে, তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। এটি আবার কয়েকটি ভাগে বিভক্ত:

(ক) কারক তৎপুরুষ
যে সমাসে কোনো কারকের বিভক্তি লোপ পায়, তাকে কারক তৎপুরুষ বলে।
উদাহরণ:

রাজপুত্র (রাজার পুত্র) → ষষ্ঠী তৎপুরুষ
অন্নজল (অন্ন ও জল) → দ্বিতীয়া তৎপুরুষ
(খ) উপপদ তৎপুরুষ
যেখানে প্রথম পদ দ্বিতীয় পদের অর্থ ব্যাখ্যা করে এবং সাধারণত ক্রিয়াপদের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
উদাহরণ:

সংসারত্যাগী (সংসার ত্যাগ করে যে)
জলপান (জল পান করা)
৩. দ্বিগু সমাস
যে সমাসে সংখ্যাসূচক পদ প্রথমে বসে এবং সংখ্যার সাথে সম্পর্কিত কিছু বোঝায়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে।
উদাহরণ:

ত্রিলোক (তিনটি লোক বা জগৎ)
ষোড়শী (ষোলো বছরের কিশোরী)
সপ্তর্ষি (সাত ঋষির দল)
৪. বহুব্রীহি সমাস
যে সমাসে সমস্তপদের অর্থ ভিন্ন হয় এবং তা অন্য কিছুকে বোঝায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে।
উদাহরণ:

দশানন (যার দশটি আনন বা মুখ আছে, অর্থাৎ রাবণ)
চতুরঙ্গ (যার চারটি অঙ্গ আছে, অর্থাৎ সেনাবাহিনী)
নীলকণ্ঠ (যার গলা নীল, অর্থাৎ শিব)
৫. অব্যয়ীভাব সমাস
যে সমাসে প্রথম পদটি অব্যয় এবং তা পরের পদের অর্থ ব্যাখ্যা করে, তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে।
উদাহরণ:

অতীতকাল (অতীত সময়)
সদাসুখী (যে সদা সুখে থাকে)
নিশিদিন (রাত-দিন)
৬. কর্মধারয় সমাস
যে সমাসে প্রথম পদ দ্বিতীয় পদের বিশেষণ বা বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাকে কর্মধারয় সমাস বলে।
উদাহরণ:

নীলকমল (নীল রঙের কমল)
সদগুরু (সৎ গুরু)
সুবর্ণমুদ্রা (সোনা নির্মিত মুদ্রা)
উপসংহার
সমাস বাংলা ব্যাকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি বাক্যকে সংক্ষিপ্ত ও অর্থবহ করে তোলে। বিভিন্ন প্রকার সমাস বিভিন্ন ধরনের বাক্যগঠনে ব্যবহৃত হয়, যা ভাষাকে সুন্দর ও সহজবোধ্য করে।


সমাস

১/ সাধারণ কর্মধারায় সমাস।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটিকে ভাঙ্গানোর পর যা …….. তাই। যিনি ……… তিনি বসাতে হবে।

২/ সাধারণ কর্মধারায় সমাস।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর মাঝে যে বসাতে হবে।

৩/ উপমান কর্মধারায় সমাস ।

Sk:-সমাসবদ্ধ পদটিকে ভাঙ্গানোর পর শেষে ন্যায় বা মতো যুক্ত করতে হবে।

৪/ উপমিত কর্মধারায় সমাস।

SK:- সমাসবদ্ধ পদটিকে ভাঙ্গানোর পর শেষে মতো বা ন্যায় যুক্ত করো।

৫/রূপক কর্মধারায় সমাস ।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর মাঝে রূপ কথা-টি বসাতে হবে।

৬/ কর্ম তৎপুরুষ সমাস।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর প্রথম পদের সঙ্গে কে যুক্ত করো।

৭/করন তৎপুরুষ।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর প্রথম পদের সঙ্গে র,আর,দের যুক্ত করার পর দ্বারা/ দিয়ে যুক্ত করো।

৮/ নিমিত তৎপুরুষ সমাস।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর প্রথম পদের সঙ্গে র,আর,দের যুক্ত করো তারপর নিমিত্ত/ জন্য বসাও।

৯/ অপাদান তৎপুরুষ।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর মাঝে ইহতে/ থেকে কোনো একটি বসাও।

১০/ সম্মন্ধ তৎপুরুষ সমাস।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর প্রথম পদের সঙ্গে র বা এর যুক্ত করো।

১১/ আধিকারন তৎপুরুষ।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর প্রথম পদের সঙ্গে ে বা য় বসাতে হবে।

১২/ নয়া তৎপুরুষ।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর প্রথম পদটি তুলে দিয়ে সেই স্তানে ন্য/নেই/ নায় মানান সই আকারে বসাতে হাবে।

১৩/ উপপদ তৎপুরুষ।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর শেষে যে বসাও।

১৪/ ব্যাপ্তি তৎপুরুষ।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর মাঝে কাল বা ব্যাপিয়া বসাতে হবে।

১৫/ দ্বন্দ্ব সমাস।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর শেষে পদের আগে ও আসাও।

১৬/ নিগু সমাস।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর শেষে সমাহার যুক্ত করো।

১৭/ নিত্য সমাস।

SK:-সমাসবদ্ধ পদটি ভাঙ্গানোর পর দ্বিতীয় পদটি তুলে দিয়ে প্রথম পদের আগে অন্য কথাটি আনতে হবে।

   ১. সমাস (Compound Words) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা অর্থসম্বন্ধ আছে এমন দুই বা ততোধিক পদ এক পদে মিলিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে সমাস বলে। সমাসের উদ্দেশ্য হলো বাক্যের সংক্ষিপ্তকরণ এবং সুন্দর প্রকাশ। যে পদগুলো মিলে সমাস হয় তাদের প্রত্যেকটিকে সমসমান পদ বলে, সমাসবদ্ধ পদটিকে সমস্তপদ বলে এবং সমস্তপদটিকে ভেঙে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয় তাকে ব্যাসবাক্য (বা বিগ্রহবাক্য) বলে। সমাস প্রধানত ছয় প্রকার। সমাসের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * বাবা ও মা = বাবা-মা (দ্বন্দ্ব সমাস): উভয় পদের অর্থ প্রধান থাকে এবং মাঝখানে সংযোজক অব্যয় লোপ পায়। * ধনী ও দরিদ্র = ধনী-দরিদ্র (দ্বন্দ্ব সমাস): বিপরীতার্থক শব্দের দ্বন্দ্ব সমাস। * হাট ও বাজার = হাট-বাজার (দ্বন্দ্ব সমাস): সমার্থক শব্দের দ্বন্দ্ব সমাস। * হাত ও পা = হাত-পা (দ্বন্দ্ব সমাস): অঙ্গবাচক দ্বন্দ্ব সমাস। * খালে ও বিলে = খালে-বিলে (দ্বন্দ্ব সমাস): অলুক দ্বন্দ্ব সমাস (বিভক্তি লোপ পায় না)। * যে সাহেব সেই ডাক্তার = সাহেব-ডাক্তার (কর্মধারয় সমাস): বিশেষ্য ও বিশেষণে মিলে কর্মধারয় সমাস। * কাঁচা অথচ মিঠা = কাঁচামেঠা (কর্মধারয় সমাস): মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস। * কু-পুরুষ = কাপুরুষ (কর্মধারয় সমাস): কু বা কদ উপসর্গযুক্ত কর্মধারয়। * সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন (কর্মধারয় সমাস): মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস, যেখানে মাঝের পদটি লোপ পেয়েছে। * মহান যে নদী = মহানদী বা নদীমহান (কর্মধারয় সমাস): কর্মধারয় সমাসের রূপভেদ। * তুষার কে ন্যায় শুভ্র = তুষারশুভ্র (কর্মধারয় সমাস): উপমিত কর্মধারয় সমাস। * বিষাদ সিন্ধু = বিষাদরূপ সিন্ধু (কর্মধারয় সমাস): রূপক কর্মধারয় সমাস। * বইকে পড়া = বইপড়া (তৎপুরুষ সমাস): দ্বিতীয় বা কর্ম তৎপুরুষ সমাস। * মন দিয়ে গড়া = মনগড়া (তৎপুরুষ সমাস): তৃতীয় বা করণ তৎপুরুষ সমাস। * দেশকে সেবা = দেশসেবা (তৎপুরুষ সমাস): চতুর্থী বা নিমিত্ত তৎপুরুষ সমাস। * খাচার থেকে ছাড়া = খাঁচাছাড়া (তৎপুরুষ সমাস): পঞ্চমী বা অপাদান তৎপুরুষ সমাস। * মাতার যে লতিকা = মাতালতিকা বা রাজার পুত্র = রাজপুত্র (তৎপুরুষ সমাস): ষষ্টি তৎপুরুষ সমাস। * ঘোড়দৌড় = ঘোড়ার দৌড় (তৎপুরুষ সমাস): ষষ্ঠী তৎপুরুষ। * গাছে পাকা = গাছপাকা (তৎপুরুষ সমাস): সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস। * বুলবুলিতে ধান খেয়েছে যার = বুলবুলি (বহুব্রীহি সমাস): ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস। * পদ্মে নাভি যার = পদ্মনাভ (বহুব্রীহি সমাস): সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস। * আকাশ কুসুম = আকাশ কুসুমবৎ (বহুব্রীহি সমাস): ব্যধিকরণ বহুব্রীহি সমাস। * বিখ্যাত চার রাস্তা যার = চৌরাস্তা (দ্বিগু সমাস): সমাহার বা মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দ পূর্বে বসে দ্বিগু সমাস হয়। * তিন ফলের সমাহার = ত্রিফলা (দ্বিগু সমাস): সমাহার বোঝাতে দ্বিগু সমাস। * অভাব অর্থে: নিরামিষ (অব্যয়ীভাব সমাস): 'নিঃ' বা অভাব অর্থে অব্যয়ীভাব সমাস। * কণ্ঠ পর্যন্ত = আকণ্ঠ (অব্যয়ীভাব সমাস): পর্যন্ত অর্থে 'আ' উপসর্গ যোগে অব্যয়ীভাব। * দিনের পর দিন = প্রতিদিন (অব্যয়ীভাব সমাস): পুনর্বৃত্তি বা বিপ্সা অর্থে অব্যয়ীভাব। * গৃহের সদৃশ = উপগৃহ (অব্যয়ীভাব সমাস): সাদৃশ্য অর্থে অব্যয়ীভাব সমাস। * নিত্য সমাস (যেমন: অন্য গ্রাম = গ্রামান্তর): যে সমাসের ব্যাসবাক্যের প্রয়োজন হয় না বা নিত্যকাল সমাসবদ্ধ থাকে। * প্রাদি সমাস (যেমন: প্রকৃষ্ট রূপে ভাত = প্রভাত): প্র, পরা প্রভৃতি উপসর্গের সাথে কৃৎ প্রত্যয়যুক্ত পদের যে সমাস হয়। ২. কারক ও বিভক্তি (Case and Inflection) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বাক্যস্থিত ক্রিয়াপদের সাথে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের যে সম্পর্ক তাকে কারক বলে। কারক প্রধানত ছয় প্রকার: কর্তৃকারক, কর্মকারক, করণকারক, সম্প্রদান (বা নিমিত্ত) কারক, অপাদান কারক এবং অধিকরণ কারক। অন্যদিকে, শব্দের সাথে যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি যুক্ত হয়ে পদ গঠন করে এবং কারক বোঝাতে সাহায্য করে, তাকে বিভক্তি বলে। কারক ও বিভক্তির ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * পাগলে কিনা বলে! (কর্তৃকারক - ৭মী বিভক্তি): বাক্যের মূল কাজ সম্পাদনকারী 'পাগল' হলো কর্তৃকারক। * বুলবুলিতে ধান খেয়েছে (কর্তৃকারক - তে/এ বিভক্তি): ধান খাওয়ার কাজটি বুলবুলি করছে। * ডাক্তার ডাকো (কর্মকারক - শূন্য বিভক্তি): যাকে আশ্রয় করে ক্রিয়া সম্পন্ন হয় তা কর্মকারক। * আমাকে একটি কলম দাও (কর্মকারক - কে বিভক্তি): গৌণ কর্মে 'কে' বিভক্তি। * ফুলে ফুলে ঘর ভরেছে (করণ কারক - এ বিভক্তি): যার মাধ্যমে বা উপায়ে কাজ সম্পন্ন হয় তা করণ কারক। * লাঠি দিয়ে সাপ মারো (করণ কারক - দিয়ে অনুসর্গ): মারার মাধ্যম হলো লাঠি। * সৎপাত্রে কন্যা দান কর (সম্প্রদান কারক - সপ্তমী বিভক্তি): সত্য ত্যাগ করে কিছু দান করা বুঝলে সম্প্রদান কারক হয় (আধুনিক ব্যাকরণে একে নিমিত্ত কারকও বলা হয়)। * অন্ধকে আলো দাও (সম্প্রদান কারক - কে বিভক্তি): নিঃস্বার্থ সাহায্য বা দান। * গাছ থেকে পাতা পড়ে (অপাদান কারক - থেকে অনুসর্গ): যা থেকে কিছু বিচ্যুত, জাত, ভীত বা রক্ষিত হয় তা অপাদান কারক। * বিপদ থেকে বাঁচাও (অপাদান কারক - থেকে অনুসর্গ): রক্ষা পাওয়া অর্থে অপাদান। * বনে বাঘ থাকে (অধিকরণ কারক - এ বিভক্তি): স্থান, কাল বা বিষয়কে অধিকরণ কারক বলে। * সকালে সূর্য ওঠে (অধিকরণ কারক - কালাধিকরণ): সময় নির্দেশক অধিকরণ কারক। * ব্যাকরণে আমার আগ্রহ আছে (অধিকরণ কারক - ভাবাধিকরণ বা বিষয়াবলম্বন): বিষয় বোঝাতে অধিকরণ। * টেবিলে বই রাখা আছে (অধিকরণ কারক - আধার অধিকরণ): স্থানবাচক অধিকরণ। * শিক্ষক মহাশয় পড়াচ্ছেন (কর্তৃকারক - প্রধান কর্তা): মূল কর্তা নিজেই কাজ করছে। * পিতা পুত্রকে পড়াচ্ছেন (প্রযোজক কর্তা ও প্রযোজ্য কর্ম): মূল কর্তা যখন অপরকে কাজে নিয়োজিত করেন। * বিনা মেঘে বজ্রপাত (অপাদান কারক - উৎস বা কারণ): জাত অর্থে অপাদান। * পাপীকে ঘৃণা করো (কর্মকারক): কাকে ঘৃণা করবে?—পাপীকে। * কলমে লেখা যায় (করণ কারক): লেখার যন্ত্র বা মাধ্যম। * অংকে আমার ভয় (অপাদান কারক - ভীতিবাচক): যেখানে ভয় বা আতঙ্ক থাকে। * চিনিতে মিষ্টি হয় (কর্তৃকারক - গুণবাচক): গুণের প্রকাশ। * টাকায় কি না হয়! (করণ কারক - উপায়): টাকার মাধ্যমে সব হয়। * গুরুজনে ভক্তি কর (কর্মকারক): শ্রদ্ধা বা কর্ম বোঝাতে। * পুকুরে মাছ আছে (অধিকরণ কারক - স্থান): পুকুর হলো আধার। * বর্ষায় বৃষ্টি হয় (অধিকরণ কারক - কালবাচক): বর্ষাকালীন সময়। * নদীতে পানি আছে (অধিকরণ কারক): জলধারার আধার। * তিনি ব্যাকরণে পণ্ডিত (অধিকরণ কারক - বিষয়): পারদর্শিতা বোঝাতে। * সাপের ভয়ে কে না কাঁপে (অপাদান কারক): ভীতি উৎপন্ন হওয়া। * ঐ দেখ পাখি উড়ে যায় (কর্তৃকারক): ওড়ার কাজ পাখি করছে। * আমাকে একটি আম দাও (কর্মকারক): দ্বিকর্মক বাক্যের মুখ্য ও গৌণ কর্মের ব্যবহার। ৩. বাক্য (Sentence) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা এক বা একাধিক পদ পাশাপাশি বসে যখন একটি সম্পূর্ণ মনের ভাব প্রকাশ করে, তখন তাকে বাক্য বলে। একটি সার্থক বাক্যের তিনটি গুণ থাকা আবশ্যক: আকাঙ্ক্ষা (বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ করার জন্য এক পদের পর অন্য পদ শোনার ইচ্ছা), আসক্তি (বাক্যের পদগুলোর সুবিন্যস্ত পদবিন্যাস) এবং যোগ্যতা (পদগুলোর অর্থের সংগতি ও ভাবগত মিল)। গঠনভেদে বাক্য ৩ প্রকার (সরল, জটিল, যৌগিক) এবং অর্থভেদে বাক্য বিভিন্ন প্রকার হতে পারে। বাক্যের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে (সরল বাক্য): একটি মাত্র কর্তা ও সমাপিকা ক্রিয়া আছে। * সে নিয়মিত পড়াশোনা করে পরীক্ষায় পাস করেছে (সরল বাক্য): সরল বাক্যের গঠনপ্রণালী। * যে পরিশ্রম করে, সে-ই সফল হয় (জটিল বা মিশ্র বাক্য): সাপেক্ষ সর্বনাম দ্বারা যুক্ত একটি প্রধান ও একটি অধীন খণ্ডবাক্য। * যদি তুমি আসো, তবে আমি যাব (জটিল বাক্য): শর্তবাচক জটিল বাক্য। * যিনি জ্ঞানী, তাঁকেই সবাই সম্মান করে (জটিল বাক্য): সাবলীল মিশ্র বাক্য। * সে গরিব, কিন্তু অত্যন্ত সৎ (যৌগিক বাক্য): দুটি স্বাধীন সরল বাক্য 'কিন্তু' অব্যয় দ্বারা যুক্ত। * বৃষ্টি পড়ছে এবং ঠান্ডা বাতাস বইছে (যৌগিক বাক্য): সংযোজক অব্যয়যুক্ত যৌগিক বাক্য। * তুমি এখনই যাও অথবা আমি চলে যাব (যৌগিক বাক্য): বিকল্প বা বিয়োজক যৌগিক বাক্য। * ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন (আশীর্বাদসূচক বাক্য): মনের প্রার্থনা প্রকাশ পায়। * দরজাটি খোলো (অনুজ্ঞাসূচক বাক্য): আদেশ বা অনুরোধমূলক বাক্য। * বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ (বিবৃতিমূলক বা বর্ণনামূলক বাক্য): সাধারণ সত্য বা তথ্য প্রকাশ করে। * আজ কি বৃষ্টি হবে? (প্রশ্নসূচক বাক্য): জিজ্ঞাসা বা প্রশ্ন বোঝায়। * বাঃ! কী সুন্দর দৃশ্য! (আবেগসূচক বাক্য): বিস্ময় বা আবেগ প্রকাশ করে। * মানুষ মরণশীল (বিবৃতিমূলক বাক্য): চিরন্তন সত্যমূলক বাক্য। * তোমার নাম কী? (প্রশ্নসূচক বাক্য): তথ্য জানার জন্য প্রশ্ন। * সততাই সর্বোত্তম পন্থা (বিবৃতিমূলক বাক্য): উপদেশমূলক বা প্রবাদভিত্তিক বাক্য। * সাবধানে পথ চলবে (অনুজ্ঞাসূচক বাক্য): উপদেশ বা সতর্কবার্তা। * আহা, পাখিটি মারা গেল! (আবেগসূচক বাক্য): দুঃখ প্রকাশকারী বাক্য। * আল্লাহ তোমার সহায় হোন (প্রার্থনাসূচক বাক্য): শুভকামনা। * বইটি টেবিলে রাখো (অনুজ্ঞাসূচক বাক্য): নির্দেশমূলক বাক্য। * হায়! আমার সব শেষ হয়ে গেল (আবেগসূচক বাক্য): আকস্মিক শোকের প্রকাশ। * তুমি কি কখনো কক্সবাজার গিয়েছ? (প্রশ্নসূচক বাক্য): হ্যাঁ-না সূচক প্রশ্ন। * সে কখনো মিথ্যা কথা বলে না (নেতিবাচক বাক্য): না-বাচক বিবৃতি। * আমাদের দেশ নদীমাতৃক (ইতিবাচক বিবৃতিমূলক বাক্য): তথ্য প্রকাশ। * দারিদ্র্য মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে (জটিল বাক্যে রূপান্তরযোগ্য বাক্য): সাধারণ ভাব প্রকাশক। * তুমি যত পড়বে, তত শিখবে (জটিল বাক্য): সমানুপাতিক জটিল বাক্য। * তিনি বয়সে বৃদ্ধ হলেও মনে তরুণ (যৌগিক বা মিশ্র ভাব প্রকাশক বাক্য): বৈপরীত্যমূলক বাক্য। * সে ঘরে প্রবেশ করল এবং আলো জ্বালাল (যৌগিক বাক্য): ক্রমিক কাজ বোঝাতে। * কী চমৎকার কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল! (আবেগসূচক বাক্য): উচ্ছ্বাস প্রকাশ। * সবাই ক্লাসে মনোযোগ দাও (অনুজ্ঞাসূচক বাক্য): শিক্ষক বা নেতার নির্দেশ। অধ্যায় ৫: অর্থের দিক ও শব্দভাণ্ডার (Semantics & Vocabulary) - পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ও উদাহরণ ১. সমার্থক শব্দ (Synonyms) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা যেসব ভিন্ন ভিন্ন শব্দ প্রায় একই রকম অর্থ প্রকাশ করে, তাদেরকে সমার্থক শব্দ বা প্রতিশব্দ বলে। সমার্থক শব্দ ভাষার সৌন্দর্য ও ভাব প্রকাশের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করে। সমার্থক শব্দের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * অগ্নি (অনল, পাবক, দহন, বহ্নি): আগুনের সমার্থক রূপ। * অকাশ (ব্যোম, অম্বর, আসমান, গগন): খোলা মহাশূন্য বা আকাশের প্রতিশব্দ। * অক্ষুন্ন (অটুট, অবিকৃত): যা নষ্ট বা পরিবর্তিত হয়নি। * অন্ধকার (তামস, তিমির, আঁধার): আলোহীন পরিবেশ বোঝাতে। * অশ্ব (ঘোড়া, তুরঙ্গ, বাজী): দ্রুতগামী চতুষ্পদ প্রাণী। * অনুকূল (সহায়ক, অনুকূলা): পক্ষে থাকা অবস্থা। * অনুসন্ধান (তদন্ত, খোঁজ, অন্বেষণ): কিছু খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া। * অহংকার (গর্ব, দর্প, অভিমান): আত্মম্ভরি ভাব। * অমর (অবিনশ্বর, চিরজীবী): যার মৃত্যু নেই। * অমর্যাদা (অবমাননা, অপমান): অসম্মান প্রকাশ করা। * অভাব (অনটন, ঘাটতি, সংকট): কোনো কিছুর অপর্যাপ্ততা। * অলস (কুঁড়ে, নিষ্ক্রিয়, প্রমত্ত): কর্মবিমুখ মানুষ। * অহংকার (অহমিকা, বড়াই): নিজের বড়ত্ব জাহির করা। * আশা (ভরসা, আকাঙ্ক্ষা, প্রতাশা): কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা বা বিশ্বাস। * আনন্দ (উল্লাস, হর্ষ, সুখ): মনের প্রফুল্ল অবস্থা। * আকাশচুম্বী (উচ্চ, গগনস্পর্শী): খুব উঁচু কিছু। * আদর (স্নেহ, যত্ন, সমাদর): ভালোবাসার প্রকাশ। * ইচ্ছা (বাঞ্ছা, অভিলাষ, কামনা): মনের সুপ্ত আকূতি। * ঈশ্বর (আল্লাহ, ভগবান, সৃষ্টিকর্তা): বিশ্বজগতের নিয়ন্তা। * উদ্যোগ (চেষ্টা, প্রয়াস, উদ্যোগ): কোনো কাজ শুরু করা। * উন্নতি (প্রগতি, উৎকর্ষ, বিকাশ): সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। * উপকার (হিত, কল্যাণ, মঙ্গল): কারও ভালো করা। * ঋষি (মুনি, সাধু, তাপস): আধ্যাত্মিক সাধক। * ঐশ্বর্য (সম্পদ, ধনদৌলত, বিভূতি): প্রাচুর্য বা সম্পত্তি। * কমল (পদ্ম, পঙ্কজ, অরবিন্দ): ফুলবিশেষ। * কপোত (কবুতর, পারাবত): পাখিবিশেষ। * কণ্ঠ (গলা, গ্রীবা): শরীরের অংশবিশেষ। * কুসুম (ফুল, পুষ্প, প্রসুন): উদ্ভিদের সৌন্দর্যবর্ধক অংশ। * ক্লান্ত (শ্রান্ত, অবশ, পরিশ্রান্ত): পরিশ্রমের ফলে ক্লান্ত অবস্থা। * ক্ষমা (মার্জনা, ক্ষমা, ক্ষান্তি): অপরাধ ক্ষমা করার গুণ। ২. বিপরীতার্থক শব্দ (Antonyms) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা যেসব শব্দ একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত বা উল্টো অর্থ প্রকাশ করে, সেগুলোকে বিপরীতার্থক শব্দ বলে। বিপরীত শব্দ বাক্য ও রচনার ভাবকে স্পষ্ট ও জোরালো করতে সাহায্য করে। বিপরীতার্থক শব্দের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * অগ্নি > জল: আগুনের বিপরীত উপাদান পানি। * অন্তরঙ্গ > বহিরঙ্গ: ভেতরের সম্পর্ক বনাম বাইরের সম্পর্ক। * অমূল্য > সাধারণ বা মূল্যহীন: যার অনেক দাম তার বিপরীত কম দামি। * অমিত > পরিমিত: অতিরিক্ত বা অসীম বনাম মাপা বা সীমিত। * অদৃশ্য > দৃশ্য: যা দেখা যায় না বনাম যা দেখা যায়। * অনুকূল > প্রতিকূল: পক্ষে বনাম বিপক্ষে অবস্থা। * অপমান > সম্মান: অসম্মান বনাম ইজ্জত বা মর্যাদা। * অলস > কর্মঠ: কুঁড়ে বনাম পরিশ্রমী। * অল্প > অধিক: কম বনাম বেশি। * অবাধ্য > বাধ্য: হুকুম অমান্যকারী বনাম অনুগত। * অমর > মর্ত্য বা মরণশীল: অমরত্ব বনাম মৃত্যুশীল। * আকাশ > পাতাল: ওপরের দিক বনাম নিচের দিক। * আদি > অন্ত: শুরু বনাম শেষ। * আপন > পর: নিজের জন বনাম অন্য লোক। * আবাস > প্রবাস: নিজ দেশ বা বাসা বনাম বিদেশ। * রুগ্ন > সবল: অসুস্থ বনাম সুস্থ বা শক্তিশালী। * উন্নতি > অবনতি: অগ্রগতি বনাম পতন। * উদার > সংকীর্ণ: বড় মনের বনাম ছোট মনের। * উষ্ণ > শীতল: গরম বনাম ঠান্ডা। * ঐক্য > অনৈক্য বা বিভেদ: মিল বনাম অমিল। * কনিষ্ঠ > জ্যেষ্ঠ: ছোট বনাম বড়। * কঠোর > কোমল: শক্ত বা কঠিন বনাম নরম। * ক্ষুদ্র > বৃহৎ: ছোট বনাম বিশাল। * খাস > আম: বিশেষ বনাম সাধারণ। * গভীর > অগভীর বা ভাসাভাসাসা: গভীর জল বনাম অগভীর জল। * গুণ > দোষ: ভালো বৈশিষ্ট্য বনাম খারাপ দিক। * জয় > পরাজয়: সাফল্য বনাম ব্যর্থতা। * জীবন > মৃত্যু: প্রাণ বনাম প্রাণহীনতা। * ঠান্ডা > গরম: শীতল বনাম উষ্ণ। * সৎ > অসৎ: ভালো মানুষ বনাম খারাপ মানুষ। ৩. এককথায় প্রকাশ / বাক্য সংকোচন (One-Word Substitution) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বড় কোনো বাক্য বা বাক্যাংশকে যখন একটি মাত্র শব্দে সুন্দর ও সংক্ষেপে প্রকাশ করা হয়, তখন তাকে এককথায় প্রকাশ বা বাক্য সংকোচন বলে। এটি ভাষার সংক্ষিপ্ততা ও মাধুর্য বৃদ্ধি করে। বাক্য সংকোচনের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * অক্ষির সমক্ষে বর্তমান = প্রত্যক্ষ: যা চোখের সামনে ঘটছে। * অক্ষির অগোচরে = পরোক্ষ: যা চোখের আড়ালে ঘটে। * অহংকার নেই যার = নিরহংকার: বিনয়ী ব্যক্তি। * অগ্রে জন্মেছে যে = অগ্রজ: বড় ভাই। * পশ্চাতে জন্মেছে যে = অনুজ: ছোট ভাই। * অঙ্কন করার যোগ্য = লক্ষণীয় বা অঙ্কনীয়: যা আঁকা যায়। * ইতিহাস রচনা করেন যিনি = ঐতিহাসিক: ইতিহাসবিদ। * উপকার স্বীকার করে যে = কৃতজ্ঞ: যে মানুষের উপকার মনে রাখে। * উপকার স্বীকার করে না যে = অকৃতজ্ঞ: যে উপকার ভুলে যায়। * একই গুরুর শিষ্য = সহাধ্যায়ী বা সহপাঠী: যারা একসাথে পড়ে। * অনেকের মধ্যে একজন = অন্যতম: বহু জনের ভেতর বিশিষ্ট। * কর্ম করার শক্তি নেই যার = অকর্মা: অলস বা অকর্মণ্য। * কষ্টে জয় করা যায় যা = দুর্জয়: যা সহজে জয় করা যায় না। * জানার ইচ্ছা = জিজ্ঞাসা: জানার প্রবল স্পৃহা। * জয় করার ইচ্ছা = জিগীষা: বিজয়ী হওয়ার আকৃতি। * লাভ করার ইচ্ছা = লিপ্সা: পাওয়ার প্রবল বাসনা। * যা বলা হয়নি = অনুক্ত: যা ব্যক্ত করা হয়নি। * যা সহজে পাওয়া যায় = সুলভ: যা সহজে মেলে। যা সহজে মেলে না তা দুর্লভ। * যা নিবারণ করা যায় না = অনিবার্য: যা অবশ্যম্ভাবী। * যা পূর্বে দেখা যায়নি = অদৃষ্টপূর্ব: যা কভু দেখা যায়নি। * যে গাছে ফল ধরে কিন্তু ফুল ধরে না = বনস্পতি বা ঔষধি (বিশেষ ক্ষেত্রে গাছবিশেষ): যেমন ডুমুর। * যে নারীর স্বামী ও পুত্র নেই = অতোবা বা অবীরা: সহায়হীন নারী। * যে পুরুষের স্ত্রী মারা গেছে = বিদুর: পত্নীহারা পুরুষ। * যে নারীর স্বামী বিদেশে থাকে = প্রোষিতভর্তৃকা: স্বামীর অনুপস্থিতিতে থাকা নারী। * হাতির ডাক = বৃংহিত: হাতির গর্জন। * সিংহের ডাক = নাদ: সিংহের হুংকার। * ঘোড়ার ডাক = হ্রেষা: অশ্বের আওয়াজ। * পায়ের থেকে মাথা পর্যন্ত = আপাদমস্তক: সম্পূর্ণ শরীর। * সকলের জন্য হিতকর = সর্বজনীন: যা সবার জন্য প্রযোজ্য। * সমুদ্রের তীর = বেলাভূমি বা সৈকত: সাগরের তটদেশ। ৪. বাগধারা ও প্রবচন (Idioms and Proverbs) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা যেসব শব্দ বা শব্দগুচ্ছ আক্ষরিক অর্থ প্রকাশ না করে বিশেষ কোনো ভাব, লাক্ষণিক বা রূপক অর্থ প্রকাশ করে, সেগুলোকে বাগধারা বলে। অন্যদিকে, দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত যে চিরন্তন সত্যমূলক বচন বা উপদেশমূলক বাক্য রয়েছে, তাকে প্রবচন বলে। বাগধারা ও প্রবচনের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * অগাধ জলের মাছ (সুচতুর ব্যক্তি): যে খুব চালাক ও সহজে ধরা দেয় না। * অগ্নিপরীক্ষা (কঠিন পরীক্ষা): চরম সংকটময় মুহূর্ত। * অদৃষ্টের পরিহাস (ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস): ক ভাগ্যের নির্মম বিদ্রূপ। * অগ্নিশর্মা (অত্যন্ত ক্রুদ্ধ): খুব রেগে যাওয়া। * অম্বরে ওঠা (খুব অহংকার করা): মাটিতে পা না থাকা। * অকালের আমড়া (অকেজো বা অপদার্থ): যার কোনো মূল্য নেই। * অমর্যাদার পাত্র (যা বেমানান): অনুপযুক্ত স্থান। * আকাশ কুসুম (অসম্ভব কল্পনা): যা বাস্তবসম্মত নয়। * আকাশ ভেঙে পড়া (বড় বিপদে পড়া): হঠাৎ বড় বিপদ আসা। * আমড়া কাঠের ঢেঁকি (অপদার্থ): কোনো কাজের না। * আমরাা দুধে ভাতে থাকা (সুখে থাকা): সচ্ছল জীবনযাপন। * ইঁদুর কপালে (মেন্দাস বা মন্দভাগ্য): যার ভাগ্য খারাপ। * উলুবনে মুক্ত ছড়ানো (অমূল্য জিনিসের অপচয়): যোগ্য পাত্রে নয়, অযোগ্য স্থানে ভালো জিনিস দেওয়া। * উড়ো চিঠি (বেনামি চিঠি): প্রেরকহীন চিঠি। * ঊনপঞ্চাশ বায়ু (পাগলামি): খামখেয়ালি বা পাগলামো স্বভাব। * এক মাঘে শীত যায় না (বিপদ একবারই আসে না / সুযোগ বারবার আসে): প্রবচনমূলক বাগধারা। * এলেবেলে (সাধারণ বা গুরুত্বহীন): কোনো বিশেষত্ব নেই যার। * কচ্ছপের কামড় (যা সহজে ছোটে না): একগুঁয়ে স্বভাব। * কাকভোর (খুব সকাল): ভোরবেলা। * কাকের নিশ্বাস (দীর্ঘজীবী নয় বা ক্ষণস্থায়ী): অল্পায়ু। * বিড়াল তপস্বী (ভণ্ড সাধু): যে বাইরে সাধু কিন্তু ভেতরে কুটিল। * বিড়াল মহাশয় (ধূর্ত ব্যক্তি): স্বার্থপর মানুষ। * বিনের বর (অনিচ্ছাকৃত বা জোরপূর্বক দায়িত্ব): জোড়াতালি দেওয়া বিষয়। * ব্যাঙের সর্দি (অসম্ভব ঘটনা): যা ঘটার নয়। * ভুঁইফোড় (হঠাৎ গজিয়ে ওঠা): আকস্মিক উত্থান। * মছিমারা কেরানি (অন্ধ অনুসারী বা অন্ধ নকলনবিশ): কোনো বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ না করা। * রুই কাতলা (গুরুত্বপূর্ণ বা প্রভাবশালী ব্যক্তি): সমাজের বড় কর্তারা। * শকুনি মামা (কুটিল বা অনিষ্টকারী মামা): স্বার্থপর আত্মীয়। * সাপের পাঁচ পা দেখা (অহংকারে অসম্ভব মেজাজ দেখানো): অতিরিক্ত গর্ব করা। * হাঁসজারু (অদ্ভুত মিশ্রণ বা অবাস্তব কিছু): দুইয়ের অদ্ভুত সংমিশ্রণ। ৫. সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ ও দ্বিরুক্ত শব্দ (Homonyms and Reduplicative Words) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা * সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ (জোড় শব্দ): যেসব শব্দের উচ্চারণ প্রায় এক বা একই রকম শুনতে লাগে, কিন্তু বানানে ও অর্থে সম্পূর্ণ ভিন্ন, সেগুলোকে সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ বলে। * দ্বিরুক্ত শব্দ: একই শব্দ বা পদ দুবার ব্যবহার করে বিশেষ ভাব, তীব্রতা বা বহুত্ব প্রকাশ করার প্রক্রিয়াকে দ্বিরুক্ত শব্দ বলে (যেমন: লাল লাল ফুল, ঘড় ঘড় শব্দ)। সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক ও দ্বিরুক্ত শব্দের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * অরুণ (সূর্যের সারথি / লাল রঙ) বনাম অরুনা (নদী): উচ্চারণ প্রায় এক কিন্তু অর্থ আলাদা। * অথি (অক্ষত) বনাম অতিথি (মেহমান): ভিন্নার্থক জোড় শব্দ। * অনু (পশ্চাৎ) বনাম অণু (পরমাণুর অংশ): বানান ও অর্থে ভিন্নতা। * কুল (বংশ) বনাম কূল (নদীর তীর): ল-এর ভিন্নতায় অর্থের পরিবর্তন। * কেশা (চুল) বনাম কেসা (আঞ্চলিক শব্দ): শব্দভাণ্ডারের বৈচিত্র্য। * গতি (চলন) বনাম গীতি (গান): শ্রবণগত মিল। * চির (দীর্ঘকাল) বনাম চীর (ছেঁড়া কাপড়): ই-কার ও ঈ-কারের প্রভেদ। * তারা (নক্ষত্র বা চোখের মণি) বনাম তাড়া (চাপ বা বান্ডিল): বহু অর্থে ব্যবহৃত। * পানি (জল) বনাম পাণি (হাত): ণ ও ন-এর পার্থক্য। * ভাষা (বক্তব্য) বনাম ভাসা (ভেসে থাকা): উচ্চারণ সাদৃশ্য। * বালি (বালুকা) বনাম বালী (রামায়ণের চরিত্র): নামের ভিন্নতা। * শোক (দুঃখ) বনাম শূক (কীটপতঙ্গের দংশন অঙ্গ): তালব্য শ ও দন্ত্য স-এর প্রভেদ। * সন (বছর) বনাম শন (গাছ বা ধীরে): বানানগত ভিন্নতা। * সব (সকল) বনাম শব (লাশ): ব ও ব-এর ভিন্ন ব্যবহার। * সুর (স্বর বা তিতাস) বনাম সূল (শূল বা বেদনা): অর্থগত পার্থক্য। * লাল লাল (দ্বিরুক্ত শব্দ - পদাত্মক): বহুত্ব বা রঙের তীব্রতা বোঝাতে বিশেষণ পদের দ্বিরুক্তি। * বইটই (জোড়া শব্দ বা ধনাত্মক দ্বিরুক্তি): বই ও তার সমজাতীয় জিনিস বোঝাতে। * ধীরে ধীরে (ক্রিয়া-বিশেষণের দ্বিরুক্তি): কাজের ধীরগতি বোঝাতে। * ঘােড়াগাড়ি (দ্বিরুক্ত শব্দ): সমার্থশব্দে গঠিত দ্বিরুক্তি। * ঝম ঝম (ধ্বনিবাচক বা ধ্বন্যাত্মক দ্বিরুক্তি): বৃষ্টির শব্দ বোঝাতে। * খট খট (ধ্বনিবাচক শব্দ): কাঠের তৈরি আওয়াজ। * কন কন (শীতের তীব্রতা): অনুভূতিমূলক দ্বিরুক্ত শব্দ। * ছন ছন (মন কেমন করা অনুভূতি): মনের অবস্থাসূচক ধ্বনি। * পাগল পাগল (অবস্থা বোঝাতে দ্বিরুক্তি): পাগলামির ভাব। * চোখে চোখে (সতর্ক দৃষ্টি): পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাতে। * হাটে হাটে (সব জায়গায়): স্থানবাচক দ্বিরুক্তি। * দিনে দিনে (ক্রমশ): সময়ের পরিবর্তন বোঝাতে। * কড়কড় (বজ্রপাতের শব্দ): ভয়ংকর আওয়াজ। * সাঁ সাঁ (বাতাসের তীব্র গতি): বেগের ধ্বন্যাত্মক রূপ। * টুপ টুপ (ছোট জলবিন্দুর পড়ার শব্দ): বৃষ্টির ফোঁটার দ্বিরুক্তি। অধ্যায় ৬: ব্যাকরণিক অন্যান্য বিষয় ও অলংকার (Grammatical Concepts and Rhetoric) - পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ও উদাহরণ ১. কাল (Tense) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা ক্রিয়াপদ সম্পন্ন হওয়ার সময়কে কাল বলে। কাল প্রধানত তিন প্রকার: বর্তমান কাল (যাহা বর্তমানে ঘটে), অতীত কাল (যাহা অতীতে ঘটে গেছে) এবং ভবিষ্যৎ কাল (যাহা ভবিষ্যতে ঘটবে)। এদের আবার বিভিন্ন উপবিভাগে ভাগ করা হয় (যেমন—সাধারণ, ঘটমান, পুরাঘটিত ইত্যাদি)। কালের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * আমি ভাত খাই (সাধারণ বর্তমান কাল): বর্তমান সময়ে সাধারণভাবে কোনো কাজ করা বোঝায়। * সে এখন পড়ছে (ঘটমান বর্তমান কাল): বর্তমানকালে কাজটি চলমান রয়েছে। * বাবা অফিসে গিয়েছেন (পুরাঘটিত বর্তমান কাল): কাজ এইমাত্র শেষ হয়েছে, কিন্তু তার ফল এখনও বিদ্যমান। * সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে (নিত্যবৃত্ত বর্তমান কাল): চিরন্তন সত্য বা অভ্যাসগত বর্তমান। * তুমি কি গান জানো? (প্রশ্নসূচক বর্তমান কাল): বর্তমান কালের জিজ্ঞাসা। * মেয়েরা ফুল তুলছে (ঘটমান বর্তমান কাল): বর্তমানে কাজ চলমান। * সে প্রতিদিন সকালে হাঁটে (নিত্যবৃত্ত বর্তমান কাল): নিয়মিত অভ্যাস। * আমি গতকাল ঢাকা গিয়েছিলাম (সাধারণ অতীত কাল): অতীতে নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন হওয়া কাজ। * তখন বৃষ্টি হচ্ছিল (ঘটমান অতীত কাল): অতীতে কোনো এক সময়ে কাজটি দীর্ঘক্ষণ ধরে চলছিল। * সে যখন এল, আমি তখন খেয়েছিলাম (পুরাঘটিত অতীত কাল): অতীতের দুটি কাজের মধ্যে একটির আগে অন্যটি সম্পন্ন হয়েছিল। * বাবা বেঁচে থাকলে কতই না আনন্দ হতো (নিত্যবৃত্ত অতীত কাল): অতীতের অভ্যাসবশত বা শর্তাধীন কাজ। * তারা ফুটবল খেলছিল (ঘটমান অতীত কাল): অতীতের চলমান কাজ। * আমরা তখন ক্লাস করছিলাম (ঘটমান অতীত কাল): অতীতে চলমান বিষয়ের বর্ণনা। * তিনি সে বছর হজ করতে গিয়েছিলেন (সাধারণ অতীত কাল): নির্দিষ্ট অতীত ঘটনা। * যদি সে আসত, তবে আমি যেতাম (নিত্যবৃত্ত অতীত কাল): অতীতকালের শর্তযুক্ত বাক্য। * আমি আগামীকাল বাড়ি যাব (সাধারণ ভবিষ্যৎ কাল): ভবিষ্যতে কোনো কাজ ঘটবে এমন বোঝায়। * আগামীকাল এই সময়ে আমরা পরীক্ষা দিতে থাকব (ঘটমান ভবিষ্যৎ কাল): ভবিষ্যতে কোনো কাজ চলতে থাকবে। * এতক্ষণে হয়তো ট্রেন ছেড়ে দিয়ে থাকবে (পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ কাল): ভবিষ্যৎকালের কোনো কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকতে পারে এমন অনুমান। * সে হয়তো কাল আসতে পারে (সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কাল): ভবিষ্যতের সম্ভাবনামূলক কাল। * খোকা ঘুমাও (অনুজ্ঞাসূচক বর্তমান): বর্তমান কালের আদেশ বা অনুরোধ। * তুমি কাজটি করে থেকো (অনুজ্ঞাসূচক ভবিষ্যৎ): ভবিষ্যৎ কালের নির্দেশ। * নদীটি শুকিয়ে গেছে (পুরাঘটিত বর্তমান কাল): কাজ শেষ কিন্তু তার রেশ রয়েছে। * সে তখন ঘুমাচ্ছিল (ঘটমান অতীত কাল): অতীতে চলমান। * আমরা গান গাইব (সাধারণ ভবিষ্যৎ কাল): আগামীতে সংঘটিত হওয়ার কাজ। * তুমি কি কাল স্কুলে যাবে? (সাধারণ ভবিষ্যৎ - প্রশ্নসূচক): ভবিষ্যতের প্রশ্ন। * বৃষ্টি থামলে আমরা রওনা হব (ভবিষ্যৎ কাল - শর্তাধীন): ভবিষ্যতের শর্ত। * তিনি গত বছর বই লিখেছেন (সাধারণ অতীত কাল): অতীতের সম্পন্ন ঘটনা। * সে তখন ভাত খাচ্ছিল (ঘটমান অতীত কাল): অতীতে চলমান অবস্থা। * সকালে সূর্য ওঠে (নিত্যবৃত্ত বর্তমান কাল): চিরন্তন সত্য। * কাল নাগাদ ঝড় বয়ে যেতে পারে (সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কাল): অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ। ২. বাচ্য (Voice) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বাক্যের অর্থসঙ্গতি রক্ষা করার জন্য কর্তা, কর্ম কিংবা ভাবের যে রূপান্তর ঘটে, তাকে বাচ্য বলে। বাচ্য প্রধানত চার প্রকার: কর্তৃবাচ্য (যেখানে কর্তার প্রাধান্য থাকে), কর্মবাচ্য (যেখানে কর্মের প্রাধান্য থাকে), ভাববাচ্য (যেখানে ক্রিয়ার ভাব বা কাজের প্রকাশ প্রধান হয়) এবং কর্মকর্তৃবাচ্য (যেখানে কর্ম নিজেই কর্তার মতো কাজ করে)। বাচ্যের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * রফিক বই পড়ছে (কর্তৃবাচ্য): এখানে কর্তা 'রফিক'-এর প্রত্যক্ষ প্রাধান্য রয়েছে। * পাখি উড়ছে (কর্তৃবাচ্য): কর্তার কাজ সরাসরি প্রকাশিত। * মা ভাত রান্না করছেন (কর্তৃবাচ্য): কর্তানির্ভর বাক্য। * ছাত্ররা ফুটবল খেলছে (কর্তৃবাচ্য): কর্তৃবাচ্যের সাধারণ রূপ। * কর্তৃক বিজিত হলো শত্রু (কর্মবাচ্য): কর্মপদটি প্রধান হয়ে উঠেছে এবং 'কর্তৃক' অনুসর্গ যুক্ত হয়েছে। * চোরটা ধরা পড়েছে (কর্মবাচ্য): কর্মের প্রধান্যমূলক বাক্য। * পুলিশ দ্বারা চোরটি ধৃত হলো (কর্মবাচ্য): কর্মবাচ্যের সুনির্দিষ্ট রূপ। * বিদ্বান ব্যক্তিগণ সকলের দ্বারা আদৃত হন (কর্মবাচ্য): সম্মানসূচক কর্মবাচ্য। * আমাকে একটি কলম দেওয়া হোক (কর্মবাচ্য বা ভাববাচ্য রূপ): কর্মের প্রাধান্য। * আমার যাওয়া হবে না (ভাববাচ্য): এখানে কর্তা বা কর্ম নয়, বরং কাজের ভাব বা অক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে। * কোথায় বসা হয়? (ভাববাচ্য): স্থান বা ভাবের প্রকাশ। * এভাবে আর চলা যায় না (ভাববাচ্য): ভাব বা অবস্থার প্রকাশ। * এবার ঘরে চলো (ভাববাচ্য): অনুরোধ বা ভাবের প্রকাশ। * বাঁশি বাজে মধুর সুরে (কর্মকর্তৃবাচ্য): এখানে 'বাঁশি' কর্ম হওয়া সত্ত্বেও কর্তার মতো আচরণ করছে। * কলমটা ভালো লেখে (কর্মকর্তৃবাচ্য): কর্মপদ কর্তার স্থলাভিষিক্ত। * পাট ভালোই বিকোচ্ছে (কর্মকর্তৃবাচ্য): বিক্রির কাজটি কর্ম নিজে প্রকাশ করছে। * শঙ্খ বাজে (কর্মকর্তৃবাচ্য): স্বয়ংক্রিয় কর্মের প্রকাশ। * চাল সহজে সেদ্ধ হয় (কর্মকর্তৃবাচ্য): কর্মের কর্তামুখী রূপ। * শিক্ষক মহাশয় পড়াচ্ছেন (কর্তৃবাচ্য): কর্তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা। * বইটি ছাপা হচ্ছে (কর্মবাচ্য): মুদ্রণের কাজ কর্মকে কেন্দ্র করে চলছে। * দেশ সেবা করা আমাদের কর্তব্য (কর্তৃবাচ্য): সাধারণ বাক্য। * তার দ্বারা এ কাজ হবে না (কর্মবাচ্য): অসমর্থতা প্রকাশমূলক কর্মবাচ্য। * আমাদের খেলা দেখতে যাওয়া হবে না (ভাববাচ্য): সমষ্টিগত ভাববাচক বাক্য। * সকালবেলা হাঁটতে হয় (ভাববাচ্য): সাধারণ নিয়ম বা ভাব প্রকাশ। * সুখে থাকতে কে না চায়? (কর্তৃবাচ্য): প্রশ্নবোধক কর্তৃবাচ্য। * চোর ধরা পড়েছে (কর্মবাচ্য): কর্মের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। * আমাদের কাজটি সম্পন্ন করতে হবে (কর্তৃবাচ্য): কর্তানির্ভর বাধ্যবাধকতা। * কথাটি শোনা গেল (কর্মবাচ্য): কর্মের উপস্থিতি। * শহরটি আলোকিত হয়েছে (কর্তৃবাচ্য বা ভাববাচ্য): অবস্থা প্রকাশক। * ধীরে সুস্থে কাজ করো (কর্তৃবাচ্য / অনুজ্ঞাসূচক): সরাসরি নির্দেশ। ৩. উক্তি পরিবর্তন (Narration) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বক্তার বক্তব্য অন্য কারো কাছে প্রকাশ করার পদ্ধতিকে উক্তি বলে। উক্তি দুই প্রকার: প্রত্যক্ষ উক্তি (Direct Speech - বক্তার আসল কথা ইনভার্টেড কমার ভেতরে রাখা হয়) এবং পরোক্ষ উক্তি (Indirect Speech - বক্তার কথা অন্যের ভাষায় ঘুরিয়ে বা পরিবর্তন করে বলা হয়)। উক্তি পরিবর্তনের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * Direct: সে বলল, "আমি আসি।" > Indirect: সে বলল যে, সে আসল। (উক্তি পরিবর্তন) * Direct: রহিম বলল, "আমি বই পড়ছি।" > Indirect: রহিম বলল যে, সে বই পড়ছে। * Direct: শিক্ষক বললেন, "সততাই সর্বোত্তম পন্থা।" > Indirect: শিক্ষক বললেন যে, সততাই সর্বোত্তম পন্থা। (চিরন্তন সত্য অপরিবর্তিত থাকে) * Direct: মিনা বলল, "আমি গতকাল ঢাকা গিয়েছিলাম।" > Indirect: মিনা বলল যে, সে পূর্বের দিন ঢাকা গিয়েছিল। * Direct: সে আমাকে বলল, "তুমি কেমন আছো?" > Indirect: সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল যে, আমি কেমন আছি। * Direct: বালিকাটি বলল, "আমি খুব ক্লান্ত।" > Indirect: বালিকাটি বলল যে, সে খুব ক্লান্ত। * Direct: তিনি বললেন, "আগামীকাল অনুষ্ঠান হবে।" > Indirect: তিনি বললেন যে, তার পরের দিন অনুষ্ঠান হবে। * Direct: শিক্ষক ছাত্রকে বললেন, "মন দিয়ে পড়াশোনা করো।" > Indirect: শিক্ষক ছাত্রকে মন দিয়ে পড়াশোনা করার পরামর্শ দিলেন। * Direct: রাশেদ বলল, "আহা! আমার সব শেষ হয়ে গেল।" > Indirect: রাশেদ দুঃখ প্রকাশ করে বলল যে, তার সব শেষ হয়ে গেছে। * Direct: সে বলল, "বাহ! চমৎকার দৃশ্যটি।" > Indirect: সে উল্লাস প্রকাশ করে বলল যে, দৃশ্যটি খুব চমৎকার। * Direct: মা বললেন, "সবসময় সত্যি কথা বলবে।" > Indirect: মা সত্য কথা বলার উপদেশ দিলেন। * Direct: সে বলল, "আমি কি ভেতরে আসতে পারি?" > Indirect: সে অনুমতি চেয়ে বলল যে, সে ভেতরে আসতে পারে কি না। * Direct: রাজা বললেন, "শত্রুকে বন্দি করো।" > Indirect: রাজা শত্রুকে বন্দি করার আদেশ দিলেন। * Direct: সে বলল, "ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুন।" > Indirect: সে প্রার্থনা করল যেন ঈশ্বর সকলের মঙ্গল করেন। * Direct: আমি বললাম, "আমি আজ আসব না।" > Indirect: আমি বললাম যে, আমি সেদিন আসব না। * Direct: বালকটি বলল, "বাবা, আমাকে একটি কলম কিনে দাও।" > Indirect: বালকটি তার বাবাকে একটি কলম কিনে দেওয়ার অনুরোধ করল। * Direct: সে আমাকে বলল, "তুমি কোথায় যাচ্ছো?" > Indirect: সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল যে, আমি কোথায় যাচ্ছি। * Direct: মিতু বলল, "আমি ভাত খাব না।" > Indirect: মিতু বলল যে, সে ভাত খাবে না। * Direct: তিনি বললেন, "পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে।" > Indirect: তিনি বললেন যে, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। (চিরন্তন সত্য) * Direct: সে বলল, "হায়! আমি মারা গেলাম।" > Indirect: সে শোকাভিভূত হয়ে বলল যে, সে মারা গেছে। * Direct: বন্ধু বলল, "চল আমরা খেলি।" > Indirect: বন্ধু খেলার প্রস্তাব দিল। * Direct: সে বলল, "আমি এই কাজ করতে পারব না।" > Indirect: সে বলল যে, সে সেই কাজ করতে পারবে না। * Direct: শিক্ষক বললেন, "তোমরা কি বুঝতে পেরেছ?" > Indirect: শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন যে, তারা বুঝতে পেরেছে কি না। * Direct: সে আমাকে বলল, "তোমার নাম কী?" > Indirect: সে আমার নাম জানতে চাইল। * Direct: সে বলল, "ইশ! যদি পাখি হতে পারতাম!" > Indirect: সে আক্ষেপ করে বলল যে, সে যদি পাখি হতে পারত! * Direct: রফিক বলল, "আমি গত বছর পাস করেছি।" > Indirect: রফিক বলল যে, সে তার আগের বছর পাস করেছিল। * Direct: সে বলল, "আমি আগামীকাল বাড়ি যাব।" > Indirect: সে বলল যে, সে তার পরের দিন বাড়ি যাবে। * Direct: সে বলল, "ধন্যবাদ!" > Indirect: সে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করল। * Direct: সে বলল, "বিদায় বন্ধুরা!" > Indirect: সে বন্ধুদের বিদায় সম্ভাষণ জানাল। * Direct: রীনা বলল, "আমি অনেক খুশি।" > Indirect: রীনা আনন্দ প্রকাশ করে বলল যে, সে অনেক খুশি। ৪. বানান ও শুদ্ধিকরণ (Spelling and Correction) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানরীতি অনুসরণ করে ভাষার শব্দগুলোকে নির্ভুলভাবে লেখার নিয়মকে বানানরীতি বলে। আর ব্যাকরণগত বা গঠনগত ভুল সংশোধন করে ভাষাকে প্রাঞ্জল করার প্রক্রিয়াকে শুদ্ধিকরণ বলে। বানান ও শুদ্ধিকরণের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা (অশুদ্ধ > শুদ্ধ) * অশুদ্ধ: সান্ত্বনা > শুদ্ধ: সান্ত্বনা (ন-ত্ব বিধান ও বানানের নিয়ম অনুযায়ী)। * অশুদ্ধ: শ্রদ্ধাঞ্জলী > শুদ্ধ: শ্রদ্ধাঞ্জলি (ই-কারান্ত নিয়মে)। * অশুদ্ধ: প্রতিযোগীতা > শুদ্ধ: প্রতিযোগিতা (ই-কার যুক্ত হবে)। * অশুদ্ধ: পুরস্কার > শুদ্ধ: পুরস্কার (বিসর্গযুক্ত রূপ)। * অশুদ্ধ: মনঃকষ্ট > শুদ্ধ: মনঃকষ্ট বা মনোকষ্ট (প্রমিত নিয়ম)। * অশুদ্ধ: শারীরিক > শুদ্ধ: শারীরিক (ঈ-কার ও ই-কার সঠিক ব্যবহার)। * অশুদ্ধ: বুদ্ধিমত্তা > শুদ্ধ: বুদ্ধিমত্তা (ত-ত যুক্ত বর্ণ)। * অশুদ্ধ: সান্ত্বনা > শুদ্ধ: সান্ত্বনা। * অশুদ্ধ: সায়্বত্তশাসন > শুদ্ধ: স্বায়ত্তশাসন (আই-এর জায়গায় 'স্বায়ত্ত')। * অশুদ্ধ: দরিদ্রতা > শুদ্ধ: দরিদ্রতা বা দৈন্য (দরিদ্রতার পরিবর্তে দৈন্য সুন্দর রূপ)। * অশুদ্ধ: সুধী বৃন্দ > শুদ্ধ: সুধীবৃন্দ (একসাথে লিখতে হয়)। * অশুদ্ধ: একত্রিত > শুদ্ধ: একত্র (একত্রিত ভুল শব্দ)। * অশুদ্ধ: সমীচীন > শুদ্ধ: সমীচীন (উভয় দীর্ঘী-কার)। * অশুদ্ধ: সান্তনা > শুদ্ধ: সান্ত্বনা। * অশুদ্ধ: স্বত্বাধিকারী > শুদ্ধ: স্বত্বাধিকারী (ত-এর নিচে ব-ফলা)। * অশুদ্ধ: অপরাহ্ন > শুদ্ধ: অপরাহ্ন (হ-এর নিচে ন)। * অশুদ্ধ: মধ্যাহ্ন > শুদ্ধ: মধ্যাহ্ন। * অশুদ্ধ: দূষণ > শুদ্ধ: দূষণ (মূর্ধন্য ণ)। * অশুদ্ধ: গৃহিনী > শুদ্ধ: গৃহিণী (মূর্ধন্য ণ ও দীর্ঘী-কার)। * অশুদ্ধ: গীতাঞ্জলী > শুদ্ধ: গীতাঞ্জলি (ই-কার)। * অশুদ্ধ: মুমূর্ষু > শুদ্ধ: মুমূর্ষু (হ্রস্ব উ ও দীর্ঘ ঊ-এর সঠিক বিন্যাস)। * অশুদ্ধ: দুরাবস্থা > শুদ্ধ: দুরবস্থা (দুর-এর পরে আ থাকলে আকার হয় না)। * অশুদ্ধ: অহংকার > শুদ্ধ: অহংকার (অনুস্বার বা ঙ)। * অশুদ্ধ: পুঞ্জীভূত > শুদ্ধ: পুঞ্জীভূত। * অশুদ্ধ: মুহূর্ত > শুদ্ধ: মুহূর্ত (হ্রস্ব উ-কার)। * অশুদ্ধ: মনঃপীড়া > শুদ্ধ: মনঃপীড়া। * অশুদ্ধ: উপর্যুক্ত > শুদ্ধ: উপর্যুক্ত (উপরী + উক্ত)। * অশুদ্ধ: সান্ত্বনা > শুদ্ধ: সান্ত্বনা। * অশুদ্ধ: পিপিলিকা > শুদ্ধ: পিপীলিকা (দীর্ঘী-কার)। * অশুদ্ধ: দারিদ্রতা > শুদ্ধ: দারিদ্র্য। ৫. পদাশ্রিত নির্দেশক ও বিরামচিহ্ন (Articles / Markers and Punctuation) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা * পদাশ্রিত নির্দেশক: যে সমস্ত বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি (যেমন—টি, টা, খানি, খানা, গুলো, গুলো) বিশেষ্য পদের পরে যুক্ত হয়ে নির্দিষ্টতা, অনির্দিষ্টতা বা পদের রূপ বোঝায়, সেগুলোকে পদাশ্রিত নির্দেশক বলে। * বিরামচিহ্ন: লেখার সময় অর্থের স্পষ্টতা ও বিরতি বোঝানোর জন্য যে সমস্ত চিহ্ন ব্যবহার করা হয়, সেগুলোকে বিরামচিহ্ন বা যতিচিহ্ন বলে। পদাশ্রিত নির্দেশক ও বিরামচিহ্নের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * বইটি (পদাশ্রিত নির্দেশক - 'টি'): নির্দিষ্ট কোনো বই বোঝাতে। * কলমটা (পদাশ্রিত নির্দেশক - 'টা'): নির্দিষ্ট বস্তুবাচক নির্দেশক। * গাছখানি (পদাশ্রিত নির্দেশক - 'খানি'): আদরের বা নির্দিষ্ট রূপের প্রকাশ। * খাতাখানা (পদাশ্রিত নির্দেশক - 'খানা'): নির্দিষ্ট কাগজ বা খাতা। * টাকাগুলো (পদাশ্রিত নির্দেশক - 'গুলো'): বহুবচন ও নির্দিষ্টতা প্রকাশ করতে। * লোকটা (পদাশ্রিত নির্দেশক): নির্দিষ্ট ব্যক্তি বোঝাতে। * পুতুলটি (পদাশ্রিত নির্দেশক): নির্দিষ্ট খেলনা। * গাছগুলো (পদাশ্রিত নির্দেশক): বহুবচন ও নির্দিষ্টতা। * আমটা খাসনে (পদাশ্রিত নির্দেশক): কথ্য ভাষায় নির্দিষ্টকরণ। * সে কি আসবে? (প্রশ্নচিহ্ন বা জিজ্ঞাসা চিহ্ন - ?): বাক্যের শেষে প্রশ্ন বোঝাতে ব্যবহৃত বিরামচিহ্ন। * বাঃ! কী সুন্দর পাখি! (বিস্ময়সূচক চিহ্ন - !): আবেগ বা বিস্ময় প্রকাশ করতে। * ঢাকা, বাংলাদেশ (কমা - ,): অল্প বিরতি বা সমজাতীয় শব্দ আলাদা করতে ব্যবহৃত হয়। * সে এল, খেল এবং চলে গেল (কমা ও দাড়ি): বাক্যের অংশ পৃথক করতে। * দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ (।): বাংলা বাক্যের শেষে সমাপ্তি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। * সেভেন্থ সেঞ্চুরি (হাইফেন বা সংযোগ চিহ্ন - -): দুটি শব্দকে এক করতে। * ব্যাস বাক্য (ড্যাস - —): বিবরণের শুরুতে ব্যবহৃত হয়। * সেমিকোলন (;): কমার চেয়ে একটু বেশি বিরতি বোঝাতে (যেমন: কাল বৃষ্টি হতে পারে; তাই ছাতা নিয়ে যাও)। * কোলন (:): উদাহরণের বা বিবৃতির আগে (যেমন: যেমনটি হলো:)। * উদ্ধরণ চিহ্ন (“ ”): কারোর সরাসরি উক্তি বোঝাতে। * বন্ধনচিহ্ন বা ব্র্যাকেট ((), {}, []): অতিরিক্ত তথ্য বা স্পষ্টীকরণের জন্য। * বলো তো কে এলো? (প্রশ্নবোধক চিহ্ন): প্রশ্ন করার জন্য। * আহা! বড় কষ্ট হলো (আবেগসূচক চিহ্ন): দুঃখ বা অনুশোচনা প্রকাশ করতে। * বই, খাতা, কলম (কমা): একই পদের পুনরাবৃত্তি এড়াতে। * একটি পাকা আম দাও (নির্দেশকহীন সাধারণ বাক্য)। * লোকটি বলল, "আমি যাব" (উদ্ধরণ চিহ্ন ও কমা)। * ওগো শোনো (কমা বা সম্বোধন চিহ্ন)। * তিনি হলেন—আমাদের প্রধান শিক্ষক (ড্যাস)। * এ-সব কথা এখন বাদ দাও (হাইফেন)। * বিরামচিহ্নের জনক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (ঐতিহাসিক তথ্য)। * সবশেষে পূর্ণচ্ছেদ (।) দিয়ে বাক্য শেষ হয়। ৬. ছন্দ, অলংকার ও বিরামচিহ্ন (Prosody, Figures of Speech and Punctuation) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা * ছন্দ: কবিতার পঙক্তিতে ধ্বনি ও মাত্রার সুশৃঙ্খল বিন্যাসকে ছন্দ বলে। বাংলা ছন্দ প্রধানত তিন প্রকার: স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্ত। * অলংকার: কাব্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য শব্দ ও অর্থের যে সুদৃশ্য কারুকার্য ব্যবহার করা হয়, তাকে অলংকার বলে। এটি শব্দালংকার ও অর্থালংকার—এই দুই ভাগে বিভক্ত। ছন্দ ও অলংকারের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * স্বরবৃত্ত ছন্দ (যেমন: "আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে"): ছড়ার ছন্দ বা দ্রুত লয়ের ছন্দ। * মাত্রাবৃত্ত ছন্দ (যেমন: "বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ"): পর্বভিত্তিক ও পরিমিত মাত্রার গান বা কবিতার ছন্দ। * অক্ষরবৃত্ত ছন্দ (যেমন: "তারি পরে মনে হয় আসিয়াছে এ কি কুয়াশা"): পয়ার ছন্দ বা ধীর লয়ের গম্ভীর ছন্দ। * যমক অলংকার (শব্দালংকার - যেমন: "भारते ভারত সম, ভারতে অতুল"): একই শব্দ ভিন্ন অর্থে বারবার ব্যবহৃত হওয়া। * অনুপ্রাস অলংকার (শব্দালংকার - যেমন: "রিমঝিম রিমঝিম ঝরে সারাবেলা"): একই ধ্বনির বারবার আবৃত্তি। * শ্লেষ অলংকার (শব্দালংকার - যেমন: "সংকট কাটেনি এখনও"): একটি শব্দে একাধিক অর্থ লুকিয়ে থাকা। * উপমা অলংকার (অর্থালংকার - যেমন: "চাঁদের মতো মুখ"): দুই ভিন্ন বস্তুর মধ্যে সাধারণ গুণের তুলনা করা। * রূপক অলংকার (অর্থালংকার - যেমন: "বিষাদ সিন্ধু"): উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে অভেদ কল্পনা করা। * উৎপ্রেক্ষা অলংকার (অর্থালংকার - যেমন: "মুখ যেন চাঁদ"): সম্ভাবনামূলক তুলনা। * অতিশয়োক্তি অলংকার (অর্থালংকার - যেমন: "কান্নায় বুক ভেসে গেল"): বাড়িয়ে বলা। * বিরোধাভাস অলংকার (অর্থালংকার): আপাতবিরোধী দুটি ভাবের প্রকাশ। * সমাসোক্তি অলংকার (অর্থালংকার): অচেতন বস্তুতে মানবীয় ভাবের আরোপ। * প্রতিবস্তুন্যাস অলংকার (অর্থালংকার): দুটি বাক্যের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান। * ব্যাজস্তুতি অলংকার (অর্থালংকার): বাইরে নিন্দা কিন্তু ভেতরে প্রশংসা (বা উল্টো)। * বিপৰ্যাস অলংকার (অর্থালংকার): ক্রমের উল্টোপাল্টা বিন্যাস। * মাত্রার গণনা (ছন্দতত্ত্ব): রুদ্ধদল ও মুক্তদলের সঠিক মাপ। * যতি বা বিরতি (ছন্দতত্ত্ব): কবিতার পঙক্তিতে শ্বাস নেওয়ার স্থান। * পর্ব (ছন্দতত্ত্ব): ছন্দের একটি নির্দিষ্ট অংশ বা তাল। * পংক্তি বা চরণ (ছন্দতত্ত্ব): কবিতার একটি লাইন। * মিল বা অন্ত্যমিল (ছন্দতত্ত্ব): কবিতার শেষের অক্ষরের মিল। * মুক্তদল (ছন্দতত্ত্ব): স্বরান্ত দল (যেমন: আ)। * রুদ্ধদল (ছন্দতত্ত্ব): ব্যঞ্জনান্ত দল (যেমন: অন্)। * বক্তব্যের অলংকার: কাব্যের ভাবকে প্রগাঢ় করার রূপ। * রূপক কর্মধারয় সমাসের সাথে মিল: অলংকারের রূপক রূপ। * শব্দালংকারের ঝংকার: শব্দের জাদুকরি ব্যবহার। * অর্থালংকারের গভীরতা: ভাবের নান্দনিক প্রকাশ। * মহাকাব্যিক ছন্দ: অক্ষরবৃত্তের মহিমান্বিত রূপ। * লোকগীতি ছন্দ: স্বরবৃত্তের প্রাণবন্ত প্রবাহ। * আধুনিক বাংলা ছন্দ: প্রবহমান বা মুক্তক ছন্দ। * ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত: বাংলা ছন্দের বৈচিত্র্য নির্মাতা। অধ্যায় ৭: বাংলা ভাষার রূপবৈচিত্র্য ও অপপ্রয়োগ রোধ (Variations of Bengali Language and Error Correction) - পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ও উদাহরণ ১. সাধু ও চলিত রীতি (Sadhu and Cholito Riti) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বাংলা লেখার ও বলার ভাষাকে প্রধানত দুটিীতিতে ভাগ করা হয়—সাধু রীতি এবং চলিত রীতি। * সাধু রীতি: যে ভাষারীতি ব্যাকরণের সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে চলে, যার ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম পদ কিছুটা গুরুগম্ভীর এবং তৎসম শব্দবহুল, তাকে সাধু রীতি বলে। * চলিত রীতি: মুখের বুলির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা যে ভাষা সহজ, স্বচ্ছন্দ, গতিশীল এবং তদ্ভব শব্দবহুল, তাকে চলিত রীতি বলে। সাধু ও চলিত রীতির ৩০টি রূপান্তর উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * সাধু: করিতেছি > চলিত: করছি (ক্রিয়াপদের চলিত রূপ)। * সাধু: খাইতেছি > চলিত: খাচ্ছি (চলিতে পদের সংক্ষিপ্ত ও সাবলীল রূপ)। * সাধু: গিয়াছি > চলিত: গিয়েছি বা গেলাম। * সাধু: বলিয়াছিল > চলিত: বলেছিল। * সাধু: আসিতেছে > চলিত: আসছে। * সাধু: চলিতেছে > চলিত: চলছে। * সাধু: তাহারা > চলিত: তারা (সর্বনাম পদের পরিবর্তন)। * সাধু: ইহারা > চলিত: এরা। * সাধু: যাঁহারা > চলিত: যারা। * সাধু: কোনটি > চলিত: কোনটা। * সাধু: তাহার > চলিত: তার। * সাধু: আমারদের > চলিত: আমাদের (সাধুতে 'আমাদের' রূপটি আধুনিক চলিতে ব্যবহৃত হয়, তবে সাধুর খাঁটি রূপ 'আমাদিগের')। * সাধু: কুঞ্চিকা > চলিত: চাবি (শব্দগত রূপান্তর)। * সাধু: হস্ত > চলিত: হাত। * সাধু: মস্তক > চলিত: মাথা। * সাধু: গৃহ > চলিত: ঘর। * সাধু: শুষ্ক > চলিত: শুকনো। * সাধু: মৃত্তিকা > চলিত: মাটি। * সাধু: কার্য > চলিত: কাজ। * সাধু: রাত্রি > চলিত: রাত। * সাধু: জ্যোৎস্না > চলিত: জোছনা। * সাধু: পরীক্ষা > চলিত: পরীক্ষা (উচ্চারণগত পরিবর্তন)। * সাধু: ক্ষুদ্র > চলিত: ছোট। * সাধু: শুনিতেছি > চলিত: শুনছি। * সাধু: দেখিতেছি > চলিত: দেখছি। * সাধু: করিতেছিলে > চলিত: করছিলে। * সাধু: কহিল > চলিত: বলল। * সাধু: লওয়া > চলিত: নেওয়া। * সাধু: হওয়া > চলিত: হওয়া বা হওয়া শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ। * সাধু: দাঁড়াইয়া > চলিত: দাঁড়িয়ে (অসমাপিকা ক্রিয়ার রূপান্তর)। ২. আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা (Dialects) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষাকে আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা বলে। ভৌগোলিক অবস্থান, নদী বা সংস্কৃতির পার্থক্যের কারণে এক অঞ্চলের ভাষা থেকে অন্য অঞ্চলের ভাষার উচ্চারণ ও শব্দ চয়নে ভিন্নতা দেখা যায়। আঞ্চলিক ভাষার ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * প্রমিত: কোথায় যাচ্ছো? > আঞ্চলিক (নোয়াখালী): কই যাও? * প্রমিত: ভাত খেয়েছি > আঞ্চলিক (সিলেট): ভাত খাইছি। * প্রমিত: ছেলেটি > আঞ্চলিক (চাটগাঁইয়া): পোয়াগা বা পুয়া। * প্রমিত: কি করছ? > আঞ্চলিক (বরিশাল): কি হরোগো? * প্রমিত: আসছি > I আঞ্চলিক (রংপুর): আইসতোছি। * প্রমিত: বাড়ি যাবো > আঞ্চলিক (ময়মনসিংহ): বাড়ি যামু। * প্রমিত: বলছি > আঞ্চলিক (নোয়াখালী): কইছি। * প্রমিত: খুব সুন্দর > আঞ্চলিক (সিলেট): মারাত্মক ভালা। * প্রমিত: ছোট ভাই > আঞ্চলিক (যশোর): ছোট ভাই বা ভাইয়া। * প্রমিত: কুকুর > আঞ্চলিক (চাটগাঁইয়া): কুত্তা। * প্রমিত: আম ছাল > আঞ্চলিক (রংপুর): আম খোসা। * প্রমিত: মানুষ > আঞ্চলিক (সিলেট): মানু। * প্রমিত: জল দাও > I আঞ্চলিক (বরিশাল): পানি দেও। * প্রমিত: কেন এমন করছ? > আঞ্চলিক (চাঁদপুর): কিলা হচ্ছো? * প্রমিত: বুঝতে পেরেছি > আঞ্চলিক (খুলনা): বুঝতে পারছি। * প্রমিত: ধান কাটা > আঞ্চলিক (সিলেট): ধান কাটা। * প্রমিত: ভালো আছি > আঞ্চলিক (নোয়াখালী): ভালা আছি। * প্রমিত: বৃষ্টি পড়ছে > I আঞ্চলিক (বরিশাল): হরিন পড়ছে বা বৃষ্টি হরতাছে। * প্রমিত: ভয় পেয়েছি > I আঞ্চলিক (রংপুর): ডরাইছি। * প্রমিত: আসো তো দেখি > আঞ্চলিক (চট্টগ্রাম): আইয়্যে তো দেখি। * প্রমিত: সকালবেলা > আঞ্চলিক (সিলেট): সকালবেলা বা পুয়ানকালে। * প্রমিত: রাগ করা > আঞ্চলিক (ময়মনসিংহ): চটি হওয়া বা রাগ করা। * প্রমিত: কথা বলো না > I আঞ্চলিক (যশোর): কথা কসনে। * প্রমিত: সে কোথায়? > I আঞ্চলিক (নোয়াখালী): হেতে কই? * প্রমিত: লুকিয়ে থাকা > আঞ্চলিক (বরিশাল): লুখাই থাহা। * প্রমিত: তাকাও > আঞ্চলিক (রংপুর): চাকো। * প্রমিত: খুব দ্রুত > I আঞ্চলিক (সিলেট): তাড়া তাড়ি। * প্রমিত: কেমন আছ? > আঞ্চলিক (চট্টগ্রাম): কোন আছন? * প্রমিত: আমার কথা শোনো > I আঞ্চলিক (বরিশাল): মোর কথা হোন। * প্রমিত: রাত হয়েছে > আঞ্চলিক (রংপুর): রাইত হইছে। ৩. অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগ (Common Errors and Correction) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা ব্যাকরণের নিয়ম না জেনে বা ভুল ধারণার বশে শব্দ বা বাক্য গঠন করলে তাকে অপপ্রয়োগ বলে। এই অপপ্রয়োগগুলো সংশোধন করে ভাষার প্রমিত রূপ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াকে শুদ্ধ প্রয়োগ বলে। অপপ্রয়োগ ও শুদ্ধ প্রয়োগের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা (অশুদ্ধ > শুদ্ধ) * অশুদ্ধ: একত্রিত হওয়া ঠিক নয় > শুদ্ধ: একত্র হওয়া ঠিক নয় (একত্রিত দ্বিত্ব বা প্রত্যয়জনিত ভুল)। * অশুদ্ধ: সব ছাত্ররা উপস্থিত আছে > শুদ্ধ: সব ছাত্র উপস্থিত আছে বা ছাত্ররা উপস্থিত আছে (একসাথে দুটি বহুবচন ব্যবহার করা ভুল)। * অশুদ্ধ: তাহার বৈরিতা সঠিক নয় > শুদ্ধ: তার বৈর বা শত্রুতা সঠিক নয় (বৈরিতা অশুদ্ধ শব্দ)। * অশুদ্ধ: দাতায়েব বা দৈন্যতা প্রকাশ করো না > শুদ্ধ: দীনতা বা দৈন্য প্রকাশ করো না (দৈন্যতা দ্বিত্ব প্রত্যয় দোষে দুষ্ট)। * অশুদ্ধ: অপমানস্পদ ব্যক্তি > শুদ্ধ: অপমানিত বা অপদস্থ ব্যক্তি। * অশুদ্ধ: সে এখানে স্বপরিবারে এসেছে > শুদ্ধ: সে এখানে সপরিবারে এসেছে (স্বপরিবার নয়, সপরিবার)। * অশুদ্ধ: অত্যন্ত লজ্জাজনক ব্যাপার > শুদ্ধ: অত্যন্ত লজ্জাকর ব্যাপার। * অশুদ্ধ: নিরপরাধী ব্যক্তি > শুদ্ধ: নিরপরাধ ব্যক্তি। * অশুদ্ধ: গোপনীয় সূত্রে খবর পেয়েছি > শুদ্ধ: গোপন সূত্রে খবর পেয়েছি। * অশুদ্ধ: সে প্রাদুর্ভাব ঘটিয়েছে > শুদ্ধ: প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। * অশুদ্ধ: একত্রিত করো > শুদ্ধ: একত্র করো। * অশুদ্ধ: সর্বমোট টাকা > શુદ્ધ: মোট টাকা বা সর্বমোট। * অশুদ্ধ: উপযুক্ত উপযুক্ত পরিবেশ > শুদ্ধ: উপযুক্ত পরিবেশ। * অশুদ্ধ: স্বাধীনা নারী > শুদ্ধ: স্বাধীন নারী। * অশুদ্ধ: সাক্ষ্যদানকারী ব্যক্তি > শুদ্ধ: সাক্ষ্যদাতা। * অশুদ্ধ: অশ্রুজল ফেলো না > শুদ্ধ: অশ্রু ফেলো না (অশ্রুর ভেতর জল বলাই আছে)। * অশুদ্ধ: অকারণে চর্বিত চর্বণ কোরো না > শুদ্ধ: চর্বিত চর্বণ কোরো না (অকারণে অতিরিক্ত)। * অশুদ্ধ: বিনীত নিবেদন > শুদ্ধ: নিবেদন (নিবেদন নিজেই বিনীত)। * অশুদ্ধ: পরীর মতো সুন্দর > শুদ্ধ: পরীর মতো বা সুন্দর। * অশুদ্ধ: তিনি স্বস্ত্রীক উপস্থিত ছিলেন > শুদ্ধ: তিনি সস্ত্রীক উপস্থিত ছিলেন। * অশুদ্ধ: দুর্লভ বস্তু > শুদ্ধ: দুর্লভ (তার সাথে বস্তু অপ্রয়োজনীয়)। * অশুদ্ধ: একত্রিত জনতা > শুদ্ধ: সমবেত জনতা। * অশুদ্ধ: বিষণ্ণ বদন > শুদ্ধ: ম্লান বদন বা বিষণ্ণ মুখ। * অশুদ্ধ: তার জীবনে অনেক প্রাপ্তিযোগ ঘটেছে > শুদ্ধ: তার জীবনে অনেক প্রাপ্তি ঘটেছে। * অশুদ্ধ: গীতাঞ্জলী একটি কাব্য > শুদ্ধ: গীতাঞ্জলি একটি কাব্য। * অশুদ্ধ: সান্ত্বনা দাও > শুদ্ধ: সান্ত্বনা দাও (বানান শুদ্ধকরণ)। * অশুদ্ধ: আবশ্যকীয় প্রয়োজন > শুদ্ধ: আবশ্যক বা প্রয়োজন। * অশুদ্ধ: মূলত খনিজ পদার্থ > শুদ্ধ: খনিজ পদার্থ। * অশুদ্ধ: বিগত পরশু দিন > শুদ্ধ: গত পরশু। * অশুদ্ধ: স্বরীয় ভূষণ > শুদ্ধ: স্বর্ণের ভূষণ বা স্বর্ণালংকার। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ পাঠ্যসূচির ধারাবাহিকতায় অষ্টম অধ্যায় হিসেবে "ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান এবং প্রমিত বানানরীতি"-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিচে এই অধ্যায়ের বিস্তারিত আলোচনা, প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা এবং প্রতি টপিক থেকে ৩০টি করে উদাহরণ ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। অধ্যায় ৮: ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান এবং প্রমিত বানানরীতি (N-tv and Sh-tv Vidhan & Standard Spelling Rules) ১. ণ-ত্ব বিধান (Rules for using মূর্ধন্য ণ) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বাংলা ভাষায় তৎসম শব্দে দন্ত্য ন (ন)-এর পরিবর্তে মূর্ধন্য ণ (ণ)-ব্যবহার করার যে ব্যাকরণগত নিয়ম বা বিধান রয়েছে, তাকে ণ-ত্ব বিধান বলে। সাধারণত ঋ, র, ষ-এর পরে ন-যুক্ত তৎসম শব্দে মূর্ধন্য ণ হয়। ণ-ত্ব বিধানের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * ঋণ (ঋ + ণ): 'ঋ' কারের পরে দন্ত্য ন না হয়ে মূর্ধন্য ণ হয়েছে। * তৃণ (তৃ + ণ): ঋ-কার যুক্ত ধাতুর পরে ণ ব্যবহৃত হয়। * কৃপণ (কৃপ + ণ): র-কার বা ঋ-কারের উপস্থিতিতে মূর্ধন্য ণ-এর ব্যবহার। * প্রবীণ (প্র + বীণ): প বর্গের আগের বর্ণে বা স্বাভাবিক নিয়মে ণ হয়েছে। * প্রণাম (প্র + নাম): 'প্র' উপসর্গের পরে নাম শব্দের ন মূর্ধন্য ণ-এ রূপান্তরিত হয়েছে। * প্রণালী (প্র + নালী): প্র উপসর্গের নিয়মে ণ যুক্ত হয়েছে। * প্রাঙ্গণ (প্র + অঙ্গণ): প্র উপসর্গের পরে অঙ্গণ শব্দের ন ণ হয়েছে। * পরাণ (পরা + য়ান): স্বাভাবিক নিয়ম বা সন্ধিজাত শব্দে ণ। * নির্ণয় (নির্ + নয়): 'র'-ফলা বা রেফ-এর পরে ন মূর্ধন্য ণ হয়েছে। * বর্ণ (বর্ + ণ): রেফ (র্)-এর পরে মূর্ধন্য ণ বসেছে। * ঝর্ণা (ঝর্ + না): রেফ-এর প্রভাবে ন ণ-এ পরিণত হয়েছে। * পূর্ণ (পূর্ + ণ): রেফ-যুক্ত অক্ষরের পরে মূর্ধন্য ণ হয়। * স্বর্ণ (স্বর্ + ণ): রেফ-এর পরের ন মূর্ধন্য ণ। * কর্ণ (কর্ + ণ): রেফ-জাত নিয়মের প্রয়োগ। * মর্মণ (মর্ম + ণ): তৎসম শব্দের বানানরীতি। * বজ্রাণু (বজ্র + অণু): অণু শব্দের মূর্ধন্য ণ। * লবণ (লব + ণ): ট, ঠ, ড, ঢ, ণ বর্গীয় ধ্বনির সাথে সম্পর্কহীন হলেও ব্যতিক্রমী ও স্বাভাবিক নিয়মে ণ। * বপন (বপ + অন): প-বর্গীয় ধ্বনির সাথে যুক্ত না হয়েও কিছু শব্দে স্বভাবতই ণ হয় (যেমন: পবন, বিপিন, কনক)। * কনক (স্বভাবতই ণ): এখানে ক-বর্গ থাকলেও 'কনক' শব্দে স্বভাবতই মূর্ধন্য ণ হয় (ব্যতিক্রম)। * বোপন > বিপিন (স্বভাবতই ণ): নির্দিষ্ট কিছু শব্দে নিয়ম ছাড়াই ণ ব্যবহৃত হয়। * মণিনাগ > মণি (স্বভাবতই ণ): মণি শব্দে মূর্ধন্য ণ থাকে। * গণনা (গণ + না): ট-বর্গীয় ধ্বনির (ণ, ঠ ইত্যাদি) আগের বা পরের প্রভাবে ণ। * পুণ্য (পুণ্য): ট-বর্গীয় ধ্বনির আগের ন মূর্ধন্য ণ হয়েছে (ট বর্গীয় ধ্বনির পূর্বে যুক্ত হলে ণ হয়)। * কাণ্ড (কাণ্ড): ড-এর সাথে যুক্ত ন মূর্ধন্য ণ রূপ নেয়। * লুণ্ঠন (লুণ্ঠন): ঠ-এর পূর্বে দন্ত্য ন মূর্ধন্য ণ-এ পরিণত হয়। * ঘণ্টা (ঘণ্টা): ট-বর্গীয় ধ্বনি (ট, ঠ, ড, ঢ)-র পূর্বে সবসময় মূর্ধন্য ণ বসে। * লণ্ঠন (লণ্ঠন): ট-বর্গীয় ধ্বনির প্রভাবে ণ-এর ব্যবহার। * চণ্ডাল (চণ্ডাল): ড-এর পূর্বে মূর্ধন্য ণ যুক্ত হয়েছে। * ত্রিনয়ন (ত্রি + নয়ন): সমাসবদ্ধ পদে সাধারণত ন-ত্ব বিধানের নিয়ম খাটে না (এখানে দন্ত্য ন থাকে)। * দুর্বিনয় (দুর্ + বিনয়): সমাসবদ্ধ বা উপসর্গযুক্ত পদে ন অপরিবর্তিত থাকে। ২. ষ-ত্ব বিধান (Rules for using মূর্ধন্য ষ) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বাংলা ভাষায় তৎসম শব্দে দন্ত্য স (স)-এর পরিবর্তে মূর্ধন্য ষ (ষ)-ব্যবহার করার নিয়মকে ষ-ত্ব বিধান বলে। ই-কার ও উ-কার কিংবা ক ও র-এর পরে সাধারণত মূর্ধন্য ষ বসে। ষ-ত্ব বিধানের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * ঋষি (ঋ + ষি): 'ঋ'-কারের পরে দন্ত্য স না হয়ে মূর্ধন্য ষ হয়েছে। * বৃষ্টি (বৃষ্ + তি): ঋ-কার যুক্ত ধাতুর পরে ষ-ত্ব বিধানের নিয়ম প্রযোজ্য হয়েছে। * দৃষ্টি (দৃষ্ + তি): ঋ-কারান্ত রূপের পরে ষ বসেছে। * সৃষ্টি (সৃষ্ + টি): সৃ ধাতুর সাথে ষ যুক্ত হয়েছে। * দৃষ্টিভঙ্গি (দৃষ্ + টি...): ষ-যুক্ত তৎসম শব্দ। * ষোড়শ (ষট + দশ): সংখ্যাবাচক বা সন্ধিজাত শব্দে ষ। * আষাঢ় (আষাঢ়): স্বভাবতই কিছু শব্দে মূর্ধন্য ষ ব্যবহৃত হয়। * ভাষণ (ভাষ + অন): ষ-এর ব্যবহারিক রূপ। * পোষণ (পোষ + অন): প-এর পরে ষ-এর অবস্থান। * ঔষধ (ঔষধ): চিকিৎসাসংক্রান্ত তৎসম শব্দে মূর্ধন্য ষ হয়। * সন্তোষ (সম্ + তোষ): ই-কার বা উ-কারান্ত উপস্বর্গের পরে ক বা প বর্গীয় বর্ণ থাকলে স স্থানে ষ হয়। * অভিষেক (অভি + সেক): 'অভি' (ই-কারান্ত উপসর্গ) থাকার কারণে স বদলে ষ হয়েছে। * প্রতিষেধক (প্রতি + সেধক): ই-কারান্ত উপসর্গের পর স-এর জায়গায় ষ বসেছে। * অনুসন্ধান (অনু + সন্ধান): উ-কারান্ত উপসর্গের পরের স মূর্ধন্য ষ-এ রূপান্তরিত হয়েছে। * সুষমা (সু + সমা): 'সু' (উ-কারান্ত উপসর্গ) থাকার কারণে সমা-র স ষ হয়েছে। * নিষ্পেষণ (নিস্ + পেষণ): বিসর্গ বা উ-কারান্ত উপস্বর্গের প্রভাবে ষ। * দুর্গম > দুষ্প্রাপ্য (দুস্ + প্রাপ্য): বিসর্গের পরে প থাকায় স মূর্ধন্য ষ হয়েছে। * আবিষ্কার (আবিঃ + কার): ই-কারান্ত অব্যয়ের পরে ক থাকলে স স্থানে ষ হয়। * চতুষ্পদ (চতুঃ + পদ): বিসর্গের পরে প থাকার কারণে ষ হয়েছে। * ভাস্কর (ভাঃ + কর): ব্যতিক্রমী নিয়মে এখানে মূর্ধন্য ষ না হয়ে দন্ত্য স হয় (সন্ধির নিয়ম)। * পুরস্কার (পুরঃ + কার): বিসর্গের পরে ক থাকলেও কিছু শব্দে দন্ত্য স বহাল থাকে (ব্যতিক্রম)। * বৃহস্পতি (বৃহত্ + পতি): সন্ধি বা পদের প্রভাবে স অপরিবর্তিত থাকে। * ষষ্ঠ (ষষ্ঠ): স্বভাবসিদ্ধ মূর্ধন্য ষ। * ষোড়শ (ষোড়শ): সংখ্যাবাচক শব্দে ষ। * নিষিদ্ধ (নিঃ + সিদ্ধ): ই-কারান্ত উপসর্গের প্রভাবে ষ। * দৃষ্টিপাত (দৃষ্টি + পাত): ট-বর্গীয় ধ্বনির সাথে ষ-এর সম্পর্ক। * পণ্ডিতমন্য > স্পষ্ট (স্পষ্ট): স্পৃশ ধাতুর রূপ। * উৎকৃষ্ট (উৎকৃষ্ট): ট-বর্গীয় যুক্তবর্ণে ষ-এর ব্যবহার। * নিষ্ঠা (নিষ্ঠা): ঠ-এর সাথে মূর্ধন্য ষ যুক্ত হয়েছে। * অনুষ্ঠান (অনু + স্থান): ঠ-এর পূর্বে দন্ত্য স মূর্ধন্য ষ-এ রূপান্তরিত হয়েছে। ৩. প্রমিত বানানরীতি (Standard Spelling Rules) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বাংলা ভাষার বানান শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং অসামঞ্জস্য দূর করার জন্য বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলীকে প্রমিত বানানরীতি বলে। এর মূল লক্ষ্য হলো সর্বজনগ্রাহ্য ও একরূপ বানান নিশ্চিত করা। প্রমিত বানানরীতির ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা (অপ্রমিত > প্রমিত) * অপ্রমিত: ভাষা ও সাহিত্য > প্রমিত: ভাষা ও সাহিত্য (তৎসম শব্দে হ্রস্ব ই-কার ব্যবহার করা হয়)। * অপ্রমিত: মন্ত্রী > প্রমিত: মন্ত্রী (ব্যক্তিবাচক বা পদবাচক শব্দে দীর্ঘী-কার, তবে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে হ্রস্ব ই-কারও চলে, যেমন: মন্ত্রিপরিষদ)। * অপ্রমিত: জীবনী > প্রমিত: জীবনী (দীর্ঘী-কারান্ত শব্দ)। * অপ্রমিত: সরকারি > প্রমিত: সরকারি (র-ফলা যুক্ত শব্দের শেষে হ্রস্ব ই-কার হয়)। * অপ্রমিত: কর্মচারী > প্রমিত: কর্মচারী (ই-কারান্ত নিয়মে)। * অপ্রমিত: বাড়ি > প্রমিত: বাড়ি (তদ্ভব শব্দে হ্রস্ব ই-কার হয়)। * অপ্রমিত: গাড়ি > প্রমিত: গাড়ি (দেশি বা তদ্ভব শব্দে ই-কার)। * অপ্রমিত: চুরি > প্রমিত: চুরি (হ্রস্ব ই-কার প্রমিত)। * অপ্রমিত: পুজা > প্রমিত: পূজা (দীর্ঘ ঊ-কারযুক্ত শব্দ)। * অপ্রমিত: মরূদ্যান > প্রমিত: মরূদ্যান (বানান শুদ্ধিকরণ)। * অপ্রমিত: উর্ধ্ব > প্রমিত: ঊর্ধ্ব (ঊ-কার ও ধ যুক্তবর্ণ)। * অপ্রমিত: ভূত > প্রমিত: ভূত (তৎসম শব্দে দীর্ঘ ঊ-কার)। * অপ্রমিত: মূল > প্রমিত: মূল (দীর্ঘ ঊ-কার)। * অপ্রমিত: ওপর > প্রমিত: ওপর (ও-কার যুক্ত চলিত রূপ, পূর্বে উপর লেখা হতো)। * অপ্রমিত: ভিতোর > প্রমিত: ভেতর (প্রমিত চলিত রূপ)। * অপ্রমিত: কেনা > প্রমিত: কেনা (চন্দ্রবিন্দুযুক্ত রূপ)। * অপ্রমিত: হাচা > প্রমিত: সাঁচা বা খাঁটি (প্রমিত বানান)। * অপ্রমিত: পদবী > প্রমিত: পদবি (সব ই-কারান্ত বিদেশি ও তৎসম শব্দে হ্রস্ব ই-কার, যেমন: পদবি, মাসি, পিসি)। * অপ্রমিত: খ্রীষ্টান > প্রমিত: খ্রিস্টান (ইংরেজি Christ শব্দের বানানে 'ষ' বা দীর্ঘী-কার বর্জিত হয়ে 'স্' ও হ্রস্ব ই-কার হয়)। * অপ্রমিত: খ্রীষ্টাব্দ > প্রমিত: খ্রিস্টাব্দ (প্রমিত রূপ)। * অপ্রমিত: মুসলমান > প্রমিত: মুসলমান (স দিয়ে লেখা হয়, শ নয়)। * অপ্রমিত: কুর্তী > প্রমিত: কুর্তি (বিদেশি শব্দে হ্রস্ব ই-কার)। * অপ্রমিত: পেঁয়াজ > প্রমিত: পেঁয়াজ (চন্দ্রবিন্দু সহ প্রমিত রূপ)। * অপ্রমিত: বয়োজ্যেষ্ঠ > প্রমিত: বয়োজেষ্ঠ বা বয়োবৃদ্ধ (প্রমিত শব্দচয়ন)। * অপ্রমিত: ইতোমধ্যে > প্রমিত: ইতিমধ্যে (হ্রস্ব ই-কার দিয়ে প্রমিত)। * অপ্রমিত: ইতস্ততঃ > প্রতমিত: ইতস্তত (বিসর্গ বর্জন করা হয়েছে)। * অপ্রমিত: প্রায়শঃ > প্রমিত: প্রায়শ (প্রমিত নিয়মে অপ্রয়োজনীয় বিসর্গ বর্জিত)। * অপ্রমিত: মূলতত > প্রমিত: মূলত (ত-ফলা যুক্ত প্রমিত রূপ)। * অপ্রমিত: শতভাগ > প্রমিত: শতভাগ (একসাথে লেখা হয়)। * অপ্রমিত: অধুনালুপ্ত > প্রমিত: অধুনালুপ্ত (সন্ধি ও সমাসের প্রমিত জোড় শব্দ)। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ পাঠ্যসূচির ধারাবাহিকতায় নবম অধ্যায় হিসেবে "বাগধারা, প্রবচন এবং সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ"-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিচে এই অধ্যায়ের বিস্তারিত আলোচনা, প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা এবং প্রতি টপিক থেকে ৩০টি করে উদাহরণ ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। অধ্যায় ৯: বাগধারা, প্রবচন ও সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ (Idioms, Proverbs and Homonyms) ১. বাগধারা (Idioms) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা যেসব শব্দ বা শব্দগুচ্ছ তাদের আক্ষরিক বা সাধারণ অর্থ প্রকাশ না করে বিশেষ কোনো ভাব, লাক্ষণিক বা রূপক অর্থ প্রকাশ করে, সেগুলোকে বাগধারা বলে। বাগধারা ভাষালাকে আকর্ষণীয়, জীবন্ত ও সংক্ষিপ্ত করে তোলে। বাগধারার ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * অগাধ জলের মাছ (সুচতুর ব্যক্তি): যে খুব চালাক এবং সহজে ফাঁদে পা দেয় না। * অগ্নিপরীক্ষা (কঠিন পরীক্ষা): চরম সংকটময় বা পরীক্ষামূলক মুহূর্ত। * অগ্নিশর্মা (অত্যন্ত ক্রুদ্ধ): অসম্ভব রেগে যাওয়া। * অকালের আমড়া (অকেজো বা অপদার্থ): যার কোনো কার্যকারিতা বা মূল্য নেই। * অম্বরে ওঠা (অত্যন্ত অহংকার করা): মাটিতে পা না থাকা বা গর্ভ প্রকাশ করা। * অদৃষ্টের পরিহাস (ভাগ্যের নিষ্ঠুর বিদ্রূপ): ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। * অমর্যাদার পাত্র (যা বেমানান): অনুপযুক্ত বা অসম্মানজনক স্থান। * অর্ধচন্দ্র গলাধঃকরণ (গলায় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া): চাকুরিচ্যুত করা বা অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়া। * আকাশ কুসুম (অসম্ভব কল্পনা): যা বাস্তবসম্মত নয় বা অবাস্তব চিন্তা। * আকাশ ভেঙে পড়া (বড় বিপদে পড়া): হঠাৎ করে বিরাট কোনো বিপর্যয় আসা। * আমড়া কাঠের ঢেঁকি (অপদার্থ): যে কোনো কাজেরই উপযুক্ত নয়। * ইঁদুর কপালে (মেন্দাস বা মন্দভাগ্য): যার ভাগ্য অত্যন্ত মন্দ। * উলুবনে মুক্ত ছড়ানো (অমূল্য জিনিসের অপচয়): অযোগ্য পাত্রে ভালো কিছু দান করা। * উড়ো চিঠি (বেনামি চিঠি): যে চিঠির প্রেরকের নাম বা ঠিকানা থাকে না। * ঊনপঞ্চাশ বায়ু (পাগলামি): খামখেয়ালি বা পাগলামো স্বভাব। * এক মাঘে শীত যায় না (সুযোগ বারবার আসে বা বিপদের পুনরাবৃত্তি ঘটে): প্রবচনধর্মী বাগধারা। * এলেবেলে (সাধারণ বা গুরুত্বহীন): বিশেষ কোনো গুরুত্ব নেই যার। * কচ্ছপের কামড় (যা সহজে ছোটে না): একগুঁয়ে বা নাছোড়বান্দা স্বভাব। * কাকভোর (খুব সকাল): সূর্যোদয়ের ঠিক আগের ভোরবেলা। * কাকের নিশ্বাস (ক্ষণস্থায়ী জীবন): যা দীর্ঘস্থায়ী নয়। * বিড়াল তপস্বী (ভণ্ড সাধু): যে বাইরে সাধুর ভান করে কিন্তু ভেতরে কুটিল। * ব্যাঙের সর্দি (অসম্ভব ঘটনা): যা ঘটার কোনো সম্ভাবনাই নেই। * ভুঁইফোড় (হঠাৎ গজিয়ে ওঠা): আকস্মিক বা হঠাৎ উত্থান ঘটেছে যার। * মছিমারা কেরানি (অন্ধ অনুসারী বা অন্ধ নকলনবিশ): কোনো বুদ্ধি বা সৃজনশীলতা না খাটিয়ে কাজ করা। * রুই কাতলা (গুরুত্বপূর্ণ বা প্রভাবশালী ব্যক্তি): সমাজের বড় কর্তাব্যক্তিরা। * শকুনি মামা (কুটিল বা অনিষ্টকারী ব্যক্তি): স্বার্থপর আত্মীয়। * সাপের পাঁচ পা দেখা (অহংকারে অসম্ভব মেজাজ দেখানো): অতিরিক্ত গর্ব করা। * হাঁসজারু (অদ্ভুত মিশ্রণ): দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ের অবাস্তব সংমিশ্রণ। * হাতের পাঁচ (শেষ সম্বল): দুর্দিনের একমাত্র ভরসা বা সম্বল। * হৈচৈ করা (শোরগোল তোলা): কোলাহল সৃষ্টি করা। ২. প্রবচন (Proverbs) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা দীর্ঘদিনের মানবীয় অভিজ্ঞতা, লোকায়ত জীবনদর্শন এবং সামাজিক সত্যের নির্যাস হিসেবে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত যে পূর্ণাঙ্গ বা খণ্ডিত উপদেশমূলক বাক্য রয়েছে, তাকে প্রবচন বলে। প্রবচন বাক্যের ভেতরে প্রমাণের বা যুক্তির ওজন বাড়িয়ে দেয়। প্রবচনের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * অভাবের স্বভাব নষ্ট: দারিদ্র্যের কারণে মানুষের নীতি বা চরিত্র নষ্ট হতে পারে। * অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ: অতিরিক্ত ভালো মানুষের ভাব দেখালে ভেতরে অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। * অসময়ে মায়ান্নর ঘর: বিপদের সময় আপনজনদের আসল রূপ চেনা যায়। * আপ ভলা তো জগৎ ভলা: নিজের ব্যবহার ভালো হলে সবাইকেই ভালো লাগে। * আপ রুচি খানা, পর রুচি পরিক্রমা: নিজের পছন্দ নিজের কাছে, অন্যের পছন্দ ভিন্ন হতে পারে। * উঠন্ত মূলো পত্তনেই চেনা যায়: প্রতিভাবান বা গুণী মানুষের লক্ষণ শুরুতেই প্রকাশ পায়। * উল্টো বুঝলি রাম: কোনো বিষয়ের সম্পূর্ণ উল্টো অর্থ বা ভুল বোঝা। * এক হাতে তালি বাজে না: ঝগড়া বা বিবাদের জন্য একপক্ষ একা দায়ী নয়, উভয়পক্ষেরই ভূমিকা থাকে। * চোরে চোরে মাসতুতো ভাই: অসৎ মানুষদের মধ্যে স্বভাবগত মিল থাকে এবং তারা একে অপরকে রক্ষা করে। * জলের মাছ জলে টানে: যার শেকড় বা আসল ঠিকানা যেখানে, সে সেখানেই ফিরে যায়। * যেমন কর্ম তেমন ফল: কাজের ফলাফল অনুসারে ভালো বা মন্দ পরিণতি পাওয়া। * যার জ্বালা সেই জানে: অন্যের কষ্টের প্রকৃত অনুভূতি কেবল ভুক্তভোগীই উপলব্ধি করতে পারে। * দুধে মাছে বাঙালি: বাঙালির ঐতিহ্যগত খাদ্যাভ্যাস ও পরিপুষ্টি। * ধান ভানতে শিবের গীত: কাজের কথা বাদ দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক বা অবান্তর কথা বলা। * নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করা: নিজের ক্ষতি করে অন্যের ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করা। * বিনা মেঘে বজ্রপাত: আকস্মিক বা হঠাৎ কোনো বড় বিপদ আসা। * যত গর্জে তত বর্ষে না: ফাঁকা আওয়াজধারীরা কাজের বেলায় কম থাকে। * ন্যাংটার নেই বাটপারের ভয়: যার হারানোর কিছু নেই, তার হারানোর কোনো ভয়ও থাকে না। * পাগলে কি না বলে, ছাগলে কি না খায়: উন্মাদ বা অসচেতন মানুষের কথার কোনো ঠিকঠিকানা থাকে না। * ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়: একবার বড় বিপদে পড়লে পরবর্তীতে সামান্য আভাষ পেলেও মানুষ আতঙ্কিত হয়। * সত্ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ: ভালো সঙ্গ জীবন গড়ে, খারাপ সঙ্গ জীবন ধ্বংস করে। * ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি: কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার আকুতি। * নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো: একদম শূন্য থাকার চেয়ে সামান্য কিছু থাকাও শ্রেয়। * বগলে কাঁচি মুখে হাসি: ভেতরে কুটিলতা রেখে বাইরে মিষ্টি কথা বলা। * খাল কেটে কুঁমিয়া আনা: নিজেই ডেকে বিপদ ডেকে আনা। * গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল: প্রাপ্তির আগেই আগাম আনন্দ বা অহংকার করা। * চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে: বিপদ বা ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর বুদ্ধি খাটিয়ে লাভ নেই। * ডুবোজলে মাছ মারা: চুপিসারে বড় ধরনের ফন্দি আঁটা বা কাজ হাসিল করা। * ঘর কি ভেদি লঙ্কা লুণ্ঠন: কাছের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতায় বড় সর্বনাশ হয়। * ষাঁড়ের লড়াইয়ে উলুখাগড়ার প্রাণ যায়: ক্ষমতাবানদের দ্বন্দ্বে সাধারণ বা দুর্বল মানুষেরা পিষ্ট হয়। ৩. সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ বা জোড় শব্দ (Homonyms) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা যেসব শব্দের উচ্চারণ প্রায় এক বা একই রকম শুনতে লাগে, কিন্তু বানানে এবং অর্থে সম্পূর্ণ ভিন্ন, সেগুলোকে সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ বলে। সঠিক বানান ও অর্থ না জানলে এগুলো ব্যবহারে লেখার অর্থ বদলে যেতে পারে। সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * অরুণ (সূর্যের সারথি / লাল রঙ) বনাম অরুনা (নদীবিশেষ): উচ্চারণগত মিল থাকলেও অর্থের পার্থক্য রয়েছে। * অনু (পশ্চাৎ বা ছোট) বনাম অণু (পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা): বানান ও অর্থে ভিন্নতা। * কুল (বংশ বা সমূহ) বনাম কূল (নদীর তীর বা কিনারা): 'ল' ও 'ল'-এর ব্যবহারে অর্থ পরিবর্তন। * চির (দীর্ঘকাল) বনাম চীর (ছেঁড়া কাপড় বা বস্ত্র): ই-কার ও ঈ-কারের প্রভেদ। * তারা (নক্ষত্র বা চোখের মণি) বনাম তাড়া (চাপ দেওয়া বা কাগজের বান্ডিল): বহু অর্থে ব্যবহৃত জোড় শব্দ। * পানি (জল বা পানীয়) বনাম পাণি (হাত): ণ ও ন-এর পার্থক্যে অর্থের বদল। * ভাষা (বক্তব্য বা রূপ) বনাম ভাসা (ভেসে থাকা): উচ্চারণ সাদৃশ্যপূর্ণ ভিন্ন শব্দ। * শোক (দুঃখ) বনাম শূক (কীটপতঙ্গের দংশন অঙ্গ): তালব্য 'শ' ও মূর্ধন্য 'ষ'-এর পার্থক্য। * সন (বছর বা অব্দ) বনাম শন (এক ধরনের গাছ বা ধীরে): বানানগত ভিন্নতা। * সব (সকল বা সমস্ত) বনাম শব (মৃতদেহ বা লাশ): ব ও ব-এর ভিন্ন ব্যবহার। * সুর (স্বর বা তিতাস নদী) বনাম শূল (পেটে ব্যথা বা বেদনা): অর্থগত পার্থক্য। * অথি (অক্ষত) বনাম অতিথি (মেহমান বা অভ্যাগত): ভিন্নার্থক রূপ। * কিশোর (বয়ঃসন্ধিকালের বালক) বনাম কিশোরী (বালিকা): বয়সভিত্তিক শব্দ। * বালি (বালুকা) বনাম বালী (রামায়ণের চরিত্রের নাম): নামের বানান ভিন্নতা। * শীত (ঠান্ডা ঋতু) বনাম সীত (সীতা সম্পর্কিত): শব্দযুগল। * গ্রহ (নক্ষত্রের পরিবার বা পিন্ড) বনাম গ্রহ্ন (গ্রহন বা নেওয়া): বানানগত সূক্ষ্ম পার্থক্য। * দিন (দিবস) বনাম দীন (দরিদ্র বা গরিব): ন ও ণ-এর ভিন্নতা। * নীল (রঙবিশেষ) বনাম নিল (শূন্য বা নিলডাউন): শব্দের রূপান্তর। * সুরভি (সুগন্ধি) বনাম সুরভী (গাভী): ই-কার ভেদে অর্থের পরিবর্তন। * লক্ষ্য (উদ্দেশ্য বা দৃষ্টি) বনাম লক্ষ (সংখ্যা বা এক লক্ষ): ক্ষ ও খ-এর ব্যবহার। * কৃপণ (যে টাকা খরচ করে না) বনাম কৃপণতা (লোভ): শব্দভাণ্ডার। * অন্তর (হৃদয় বা ব্যবধান) বনাম অন্ধর (অন্ধকার): অর্থগত ফারাক। * আচার (নিয়ম বা অভ্যাস) বনাম আধার (পাত্র বা পাত্রস্থ বস্তু): চ ও ছ-এর পার্থক্য। * অন্ন (ভাত বা খাদ্য) বনাম অন্য (পর বা ভিন্ন): ন ও য-এর ভিন্নতা। * অবধি (পর্যন্ত) বনাম অবুঝ (যে বোঝে না): শব্দের ভিন্নতা। * আবাস (বাসস্থান) বনাম আভাস (ইঙ্গিত বা ছায়া): ব ও ভ-এর প্রভাবে অর্থ বদলায়। * উপাসনা (প্রার্থনা) বনাম উপবাস (না খেয়ে থাকা): উপাসনা ও উপবাসের তফাত। * কর (হাত বা রাজস্ব বা কর) বনাম কার (কাজ বা কর্মী): সংক্ষিপ্ত জোড় শব্দ। * গতি (চলন বা চাল) বনাম গীতি (গান বা সংগীত): শ্রবণগত মিল। * ঘাত (আঘাত বা মার) বনাম ঘাতক (যে আঘাত করে): ক্রিয়াজাত শব্দ। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ পাঠ্যসূচির ধারাবাহিকতায় দশম অধ্যায় হিসেবে "ছন্দ ও অলংকার (Prosody and Rhetoric)"-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিচে এই অধ্যায়ের বিস্তারিত আলোচনা, প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা এবং প্রতি টপিক থেকে ৩০টি করে উদাহরণ ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। অধ্যায় ১০: ছন্দ ও অলংকার (Prosody and Rhetoric) ১. বাংলা ছন্দ (Prosody) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা কবিতার পঙক্তিতে ধ্বনি, মাত্রা, যতি এবং পদের সুশৃঙ্খল ও লয়বদ্ধ বিন্যাসকে ছন্দ বলে। বাংলা ছন্দ প্রধানত তিন প্রকার: স্বরবৃত্ত ছন্দ (ছড়ার ছন্দ), মাত্রাবৃত্ত ছন্দ (গানের বা কবির ছন্দ) এবং অক্ষরবৃত্ত ছন্দ (পয়ার বা গম্ভীর ছন্দ)। ছন্দের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা (দল, পর্ব, মাত্রা ও লয়ভিত্তিক) * স্বরবৃত্ত ছন্দ (যেমন: "আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে"): এটি চার মাত্রার পর্বভিত্তিক দ্রুত লয়ের ছড়া বা রূপকথার ছন্দ। * স্বরবৃত্ত ছন্দ (যেমন: "খোকা ঘুমাল পাড়া জুড়াল, বর্গী এল দেশে"): শিশুদের ছড়ায় স্বরবৃত্ত ছন্দের অবিকল ব্যবহার। * স্বরবৃত্ত ছন্দ (যেমন: "পাকপুটুল দিয়ে গড়া পুতুল নাচে গান গেয়ে"): দ্রুত গতির উচ্চারণরীতি। * মাত্রাবৃত্ত ছন্দ (যেমন: "বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ"): এটি ৮+৮ মাত্রার পর্ব এবং দীর্ঘ লয়ের বা গানের ছন্দ। * মাত্রাবৃত্ত ছন্দ (যেমন: "সার্থক জন্ম আমার জন্মেছি এই দেশে"): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গানের মাত্রাবৃত্ত রূপ। * মাত্রাবৃত্ত ছন্দ (যেমন: "যেদিন সুনীল জল জলছবি এঁকে যায়"): জীবনের গভীর ভাব প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। * অক্ষরবৃত্ত ছন্দ (যেমন: "তারি পরে মনে হয় আসিয়াছে এ কি কুয়াশা"): এটি ৮+৬ মাত্রার দীর্ঘ ও গম্ভীর পয়ার ছন্দ। * অক্ষরবৃত্ত ছন্দ (যেমন: "রহিবে এ কনক লঙ্কা রবে না তো রাজা"): মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমিত্রাক্ষর ছন্দের অক্ষরবৃত্ত রূপ। * অক্ষরবৃত্ত ছন্দ (যেমন: "সহসা আলোর ঝলকানি ফুরে ওঠে হৃদয়ে"): মহাকাব্যিক ও নাট্যধর্মী ছন্দের উদাহরণ। * মুক্তদল (যেমন: 'আ' বা 'না'): যে দলের শেষে স্বরধ্বনি থাকে (স্বরান্ত দল), যার মাত্রা ১। * রুদ্ধদল (যেমন: 'নন্' বা 'ব্'): যে দলের শেষে ব্যঞ্জনধ্বনি থাকে (ব্যঞ্জনান্ত দল), যার মাত্রা ১, কিন্তু গণনায় বিশেষ নিয়ম থাকে। * যতি (Pause): কবিতা আবৃত্তির সময় যেখানে সামান্য শ্বাস নেওয়ার জন্য থামতে হয়। * পর্ব (Foot): ছন্দের একটি নির্দিষ্ট অংশ বা তালবদ্ধ অংশ। * পঙক্তি বা চরণ (Line): কবিতার প্রতিটি আলাদা লাইন। * মহাপ্রাণ দল: অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রুদ্ধদলের দীর্ঘ উচ্চারণ। * পয়ার: বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও জনপ্রিয় ৮+৬ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দ। * মিতাক্ষরা বা অন্ত্যমিল: কবিতার দুই চরণের শেষের শব্দের মিল। * অমিত্রাক্ষর ছন্দ: চরণের শেষে মিল না রেখে ভাবকে প্রবাহিত করার ছন্দ (প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত)। * গদ্য ছন্দ: প্রবহমান গদ্যের ভঙ্গিতে রচিত ছন্দ যেখানে কোনো নির্দিষ্ট মাত্রা বা পর্বের বাধ্যবাধকতা থাকে না। * মুক্তক ছন্দ: প্রথাগত ছন্দ ভেঙে নিজস্ব ছান্দিক গতি তৈরি করার পদ্ধতি। * লয় বা গতি: ছন্দের ধীর, মধ্যম বা দ্রুত চলনভঙ্গি। * স্বরবৃত্তের দ্রুত লয়: চার মাত্রার চাঞ্চল্যময় লয়। * মাত্রাবৃত্তের মধ্যম লয়: গম্ভীর ও গীতল লয়। * অক্ষরবৃত্তের ধীর লয়: চিন্তাশীল ও প্রবহমান লয়। * ছন্দের জাদুকর: কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে বাংলা ছন্দের জাদুকর বলা হয়। * মাত্রাগণনা: দল বা অক্ষর গুণে ছন্দের মাত্রা নির্ধারণ করার প্রক্রিয়া। * যুক্তবর্ণের মাত্রা: অক্ষরবৃত্তে যুক্তবর্ণের প্রথম অংশ রুদ্ধদল হিসেবে ১ মাত্রা পায়। * পঙক্তির সমাপ্তি: যেখানে একটি পূর্ণ ভাব শেষ হয়। * চরণান্তিক মিল: কবিতার শেষে শব্দের ধ্বনিগত সাদৃশ্য। * সুরের মূর্ছনা: ছন্দের ভেতরের সংগীতময় ব্যঞ্জনা। ২. শব্দালংকার (Figures of Speech - Word) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা কাব্যের বা লেখার বাহ্যিক সৌন্দর্য, ধ্বনিমাধুর্য এবং চমৎকারিত্ব বৃদ্ধি করার জন্য শব্দের যে বিশেষ বিন্যাস ঘটানো হয়, তাকে শব্দালংকার বলে। এর প্রধান রূপগুলো হলো অনুপ্রাস, যমক, শ্লেষ ও বক্রোক্তি। শব্দালংকারের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * অনুপ্রাস (যেমন: "রিমঝিম রিমঝিম ঝরে সারাবেলা"): একই ধ্বনি বা বর্ণগুচ্ছের বারবার ব্যবহার। * অনুপ্রাস (যেমন: "জল পড়ে পাতা নড়ে"): শ্রুতিমধুর ধ্বনির পুনরাবৃত্তি। * অনুপ্রাস (যেমন: "পাগল হাওয়া রে, কে তোরে বাঁধবে"): একই ব্যঞ্জনের চমৎকার বিন্যাস। * ছাকা অনুপ্রাস বা বৃত্তানুপ্রাস: একই ধ্বনি বৃত্তের মতো ঘুরে আসে। * যমক (যেমন: "भारते ভারত সম, ভারতে অতুল"): একই শব্দ ভিন্ন অর্থে একাধিকবার ব্যবহার। * যমক (যেমন: "কাকলি ডাকলি কুঞ্জে কূজনে"): শব্দের চমৎকার দ্বিত্ব ও অর্থের ভিন্নতা। * যমক (যেমন: "সোনা দিয়ে মোড়ানো সোনা"): আক্ষরিক অর্থের ভিন্ন রূপ। * শ্লেষ (যেমন: "সংকট কাটেনি এখনও"): একটি মাত্র শব্দে একাধিক অর্থ লুকিয়ে থাকা। * শ্লেষ (যেমন: "রবির কিরণ"): এখানে রবির দুটি অর্থ (সূর্য এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) হতে পারে। * বক্রোক্তি (যেমন: "কে তুমি? আমি তো মেঘ!"); বক্তার কথা শ্রোতা যখন অন্য অর্থে বুঝে উত্তর দেয়। * বক্রোক্তি অলংকার: কথার পেঁচ বা বাঁকানো অর্থ প্রকাশ। * পুনরুক্তি দোষ বর্জিত শব্দালংকার: কাব্যে ধ্বনির চমৎকারিতা রক্ষা। * বর্ণের জাদুকরি বিন্যাস: শব্দালংকারের মূল চাবিকাঠি। * শ্রুতিকটুতা দূরীকরণ: শ্রুতিমধুর শব্দ চয়ন। * ধ্বন্যাত্মক শব্দালংকার (যেমন: "ঝরঝর বারি ধারা"): শব্দের ধ্বনি দিয়ে ভাবের প্রকাশ। * ঝংকার সৃষ্টি: পঙক্তিতে ছন্দের সুর তৈরি করা। * শব্দমালার কারুকার্য: লেখার ভেতরে নান্দনিকতা আনা। * স্বরধ্বনি অনুপ্রাস: স্বরবর্ণের পুনরাবৃত্তিজনিত অলংকার। * ব্যঞ্জন অনুপ্রাস: ব্যঞ্জনবর্ণের ধ্বনিসাম্য। * অন্ত্যানুপ্রাস: চরণের শেষে ধ্বনির মিল রাখা। * মধ্যানুপ্রাস: চরণের মাঝখানে ধ্বনির মিল। * আদ্যানুপ্রাস: শব্দের আদিতে একই বর্ণের ব্যবহার। * শব্দার্থের দ্বৈততা: শ্লেষ অলংকারের বিশেষ রূপ। * চমকপ্রদ শব্দপ্রয়োগ: পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করা। * বাক্যচাতুর্য: কথার ভেতরে শৈল্পিক কারুকার্য। * ভাষার অলংকরণ: ভাষার রূপ ফুটিয়ে তোলা। * কাব্যের বাহ্যিক রূপ: বাহ্যিক সৌন্দর্য বর্ধন। * ধ্বনিগত মাধুর্য: কানের জন্য সুখকর ধ্বনি। * প্রাসাদগুণ: চিত্ত প্রসন্নকারী শব্দালংকার। * মধুক্ষয়ী শব্দপ্রয়োগ: মিষ্টি ও আকর্ষণীয় শব্দের ব্যবহার। ৩. অর্থালংকার (Figures of Speech - Meaning) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা কাব্যের ভেতরের ভাব, অর্থ, গভীরতা এবং আবেগ ফুটিয়ে তোলার জন্য অর্থের যে চমৎকারিত্ব বা তুলনা ব্যবহার করা হয়, তাকে অর্থালংকার বলে। এর প্রধান রূপগুলো হলো উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষা, অতিশয়োক্তি ইত্যাদি। অর্থালংকারের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * উপমা (যেমন: "চাঁদের মতো মুখ"): দুটি ভিন্ন বস্তুর মধ্যে সাধারণ কোনো গুণের তুলনা করা (উপমান, উপমেয়, সাধারণ ধর্ম ও তুলনাবাচক শব্দ থাকে)। * উপমা (যেমন: "হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে রবির করের মতো"): প্রকৃতির সাথে মনের তুলনা। * রূপক (যেমন: "বিষাদ সিন্ধু"): উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে যখন অভেদ কল্পনা করা হয় (মাঝখানে 'মতো' বা 'যেন' থাকে না)। * রূপক (যেমন: "রূপসা নদীটির খেলা"): অভেদাত্মক রূপ। * উৎপ্রেক্ষা (যেমন: "মুখ যেন চাঁদ"): উপমেয়কে যখন উপমান বলে কল্পনা বা সম্ভাবনা করা হয় (সাধারণত 'যেন', 'মতো' থাকে)। * উৎপ্রেক্ষা (যেমন: "সে এমনভাবে তাকাল, যেন সে সব জানে"): সম্ভাবনামূলক প্রকাশ। * অতিশয়োক্তি (যেমন: "কান্নায় বুক ভেসে গেল"): স্বাভাবিক সীমানা ছাড়িয়ে অসম্ভব বা বাড়িয়ে কিছু বলা। * অতিশয়োক্তি (যেমন: "রক্তের নদী বয়ে গেল"): অতিরঞ্জিত বর্ণনা। * বিরোধাভাস (যেমন: "ছোট হলেও সে মস্ত বড়"): আপাতবিরোধী কিন্তু অন্তরে সত্য এমন ভাবের প্রকাশ। * সমাসোক্তি (যেমন: "দিগ্বধূ লজ্জিত মুখে চাইল"): জড় বা অচেতন বস্তুর ওপর মানবীয় ভাব বা গুণ আরোপ করা। * প্রতিবস্তুন্যাস (যেমন: ভালো মানুষ সহজে মরে না, হীরা সহজে ভাঙে না): দুটি ভিন্ন বাক্যের মাধ্যমে একই অর্থের সমর্থন। * ব্যাজস্তুতি (যেমন: "বাঃ! তুমি তো মস্ত বড় পন্ডিত যে সহজ অঙ্কটাও পারলে না!"): বাইরে প্রশংসা কিন্তু ভেতরে নিন্দা বা ব্যঙ্গ করা। * ব্যাজনিন্দা (বাইরে নিন্দা কিন্তু ভেতরে প্রশংসা): উল্টো ভাব প্রকাশ। * দৃষ্টান্ত অলংকার: কোনো সত্যকে প্রমাণের জন্য উদাহরণ টেনে আনা। * সহোক্তি অলংকার: একসাথে দুটি কাজের উপস্থিতি বোঝানো। * অর্থান্তরন্যাস অলংকার: বিশেষ বিষয়ের সমর্থনে সাধারণ সত্য বা সাধারণের সমর্থনে বিশেষ সত্য উপস্থাপন। * দীপক অলংকার: একটিমাত্র পদ দিয়ে একাধিক বাক্যের অর্থ প্রকাশ করা। * স্বভাবোক্তি অলংকার (যেমন: "বাঘটি বনের ছায়ায় লুকিয়ে আছে"): কোনো কিছুর স্বভাবের নিখুঁত ও বাস্তব বর্ণনা। * উল্লেক্ষ্য অলংকার: একই বস্তুকে নানাভাবে বর্ণনা করা। * সন্দেহ অলংকার: একটি বস্তুকে দেখে অন্য বস্তু বলে সন্দেহ হওয়া। * ভ্রান্তিময় অলংকার: ভুলবশত এক বস্তুকে অন্য বস্তু বলে ভেবে নেওয়া। * নিদর্শন অলংকার: কাজের মাধ্যম দিয়ে সত্য ফুটিয়ে তোলা। * অনন্য সাধারণ উপমা: অতুলনীয় তুলনা। * প্রতীপ অলংকার: উপমানকে উপমেয় এবং উপমেয়কে উপমান বানিয়ে তুলনা করা। * ব্যতিরেক অলংকার: উপমেয় যখন উপমানকে ছাড়িয়ে যায়। * সমাসোক্তির ভাবরূপ: কবিতার গভীর ব্যঞ্জনা। * ভাবের গভীরতা: অর্থালংকারের প্রাণশক্তি। * কবির মননশীলতা: কবির মনস্তাত্ত্বিক প্রকাশ। * সৌন্দর্যবর্ধক অর্থ: লেখার ভেতরের রস সৃষ্টি করা। * রসাভাস বা রসোত্তীর্ণ প্রকাশ: কাব্যের চূড়ান্ত রূপ দান করা। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ পাঠ্যসূচির ধারাবাহিকতায় একাদশ অধ্যায় হিসেবে "বাচ্য ও উক্তি পরিবর্তন (Voice and Narration)"-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিচে এই অধ্যায়ের বিস্তারিত আলোচনা, প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা এবং প্রতি টপিক থেকে ৩০টি করে উদাহরণ ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। অধ্যায় ১১: বাচ্য ও উক্তি পরিবর্তন (Voice and Narration) ১. বাচ্য (Voice) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বাক্যের অর্থসঙ্গতি রক্ষা করার জন্য কর্তা, কর্ম কিংবা ভাবের যে রূপান্তর ঘটে, তাকে বাচ্য বলে। বাচ্য প্রধানত চার প্রকার: কর্তৃবাচ্য (যেখানে কর্তার প্রাধান্য থাকে), কর্মবাচ্য (যেখানে কর্মের প্রাধান্য থাকে), ভাববাচ্য (যেখানে ক্রিয়ার ভাব বা কাজের প্রকাশ প্রধান হয়) এবং কর্মকর্তৃবাচ্য (যেখানে কর্ম নিজেই কর্তার মতো কাজ করে)। বাচ্যের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * রফিক বই পড়ছে (কর্তৃবাচ্য): এখানে কর্তা 'রফিক'-এর প্রত্যক্ষ প্রাধান্য রয়েছে। * পাখি উড়ছে (কর্তৃবাচ্য): কর্তার কাজ সরাসরি প্রকাশিত। * মা ভাত রান্না করছেন (কর্তৃবাচ্য): কর্তানির্ভর বাক্য। * ছাত্ররা ফুটবল খেলছে (কর্তৃবাচ্য): কর্তৃবাচ্যের সাধারণ রূপ। * কর্তৃক বিজিত হলো শত্রু (কর্মবাচ্য): কর্মপদটি প্রধান হয়ে উঠেছে এবং 'কর্তৃক' অনুসর্গ যুক্ত হয়েছে। * চোরটা ধরা পড়েছে (কর্মবাচ্য): কর্মের প্রধান্যমূলক বাক্য। * পুলিশ দ্বারা চোরটি ধৃত হলো (কর্মবাচ্য): কর্মবাচ্যের সুনির্দিষ্ট রূপ। * বিদ্বান ব্যক্তিগণ সকলের দ্বারা আদৃত হন (কর্মবাচ্য): সম্মানসূচক কর্মবাচ্য। * আমাকে একটি কলম দেওয়া হোক (কর্মবাচ্য বা ভাববাচ্য রূপ): কর্মের প্রাধান্য। * আমার যাওয়া হবে না (ভাববাচ্য): এখানে কর্তা বা কর্ম নয়, বরং কাজের ভাব বা অক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে। * কোথায় বসা হয়? (ভাববাচ্য): স্থান বা ভাবের প্রকাশ। * এভাবে আর চলা যায় না (ভাববাচ্য): ভাব বা অবস্থার প্রকাশ। * এবার ঘরে চলো (ভাববাচ্য): অনুরোধ বা ভাবের প্রকাশ। * বাঁশি বাজে মধুর সুরে (কর্মকর্তৃবাচ্য): এখানে 'বাঁশি' কর্ম হওয়া সত্ত্বেও কর্তার মতো আচরণ করছে। * কলমটা ভালো লেখে (কর্মকর্তৃবাচ্য): কর্মপদ কর্তার স্থলাভিষিক্ত। * পাট ভালোই বিকোচ্ছে (কর্মকর্তৃবাচ্য): বিক্রির কাজটি কর্ম নিজে প্রকাশ করছে। * শঙ্খ বাজে (কর্মকর্তৃবাচ্য): স্বয়ংক্রিয় কর্মের প্রকাশ। * চাল সহজে সেদ্ধ হয় (কর্মকর্তৃবাচ্য): কর্মের কর্তামুখী রূপ। * শিক্ষক মহাশয় পড়াচ্ছেন (কর্তৃবাচ্য): কর্তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা। * বইটি ছাপা হচ্ছে (কর্মবাচ্য): মুদ্রণের কাজ কর্মকে কেন্দ্র করে চলছে। * দেশ সেবা করা আমাদের কর্তব্য (কর্তৃবাচ্য): সাধারণ বাক্য। * তার দ্বারা এ কাজ হবে না (কর্মবাচ্য): অসমর্থতা প্রকাশমূলক কর্মবাচ্য। * আমাদের খেলা দেখতে যাওয়া হবে না (ভাববাচ্য): সমষ্টিগত ভাববাচক বাক্য। * সকালবেলা হাঁটতে হয় (ভাববাচ্য): সাধারণ নিয়ম বা ভাব প্রকাশ। * সুখে থাকতে কে না চায়? (কর্তৃবাচ্য): প্রশ্নবোধক কর্তৃবাচ্য। * চোর ধরা পড়েছে (কর্মবাচ্য): কর্মের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। * আমাদের কাজটি সম্পন্ন করতে হবে (কর্তৃবাচ্য): কর্তানির্ভর বাধ্যবাধকতা। * কথাটি শোনা গেল (কর্মবাচ্য): কর্মের উপস্থিতি। * শহরটি আলোকিত হয়েছে (কর্তৃবাচ্য বা ভাববাচ্য): অবস্থা প্রকাশক। * ধীরে সুস্থে কাজ করো (কর্তৃবাচ্য / অনুজ্ঞাসূচক): সরাসরি নির্দেশ। ২. উক্তি পরিবর্তন (Narration) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বক্তার বক্তব্য অন্য কারো কাছে প্রকাশ করার পদ্ধতিকে উক্তি বলে। উক্তি দুই প্রকার: প্রত্যক্ষ উক্তি (Direct Speech - বক্তার আসল কথা ইনভার্টেড কমার ভেতরে রাখা হয়) এবং পরোক্ষ উক্তি (Indirect Speech - বক্তার কথা অন্যের ভাষায় ঘুরিয়ে বা পরিবর্তন করে বলা হয়)। উক্তি পরিবর্তনের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * Direct: সে বলল, "আমি আসি।" > Indirect: সে বলল যে, সে আসল। (উক্তি পরিবর্তন) * Direct: রহিম বলল, "আমি বই পড়ছি।" > Indirect: রহিম বলল যে, সে বই পড়ছে। * Direct: শিক্ষক বললেন, "সততাই সর্বোত্তম পন্থা।" > Indirect: শিক্ষক বললেন যে, সততাই সর্বোত্তম পন্থা। (চিরন্তন সত্য অপরিবর্তিত থাকে) * Direct: মিনা বলল, "আমি গতকাল ঢাকা গিয়েছিলাম।" > Indirect: মিনা বলল যে, সে পূর্বের দিন ঢাকা গিয়েছিল। * Direct: সে আমাকে বলল, "তুমি কেমন আছো?" > Indirect: সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল যে, আমি কেমন আছি। * Direct: বালিকাটি বলল, "আমি খুব ক্লান্ত।" > Indirect: বালিকাটি বলল যে, সে খুব ক্লান্ত। * Direct: তিনি বললেন, "আগামীকাল অনুষ্ঠান হবে।" > Indirect: তিনি বললেন যে, তার পরের দিন অনুষ্ঠান হবে। * Direct: শিক্ষক ছাত্রকে বললেন, "মন দিয়ে পড়াশোনা করো।" > Indirect: শিক্ষক ছাত্রকে মন দিয়ে পড়াশোনা করার পরামর্শ দিলেন। * Direct: রাশেদ বলল, "আহা! আমার সব শেষ হয়ে গেল।" > Indirect: রাশেদ দুঃখ প্রকাশ করে বলল যে, তার সব শেষ হয়ে গেছে। * Direct: সে বলল, "বাহ! চমৎকার দৃশ্যটি।" > Indirect: সে উল্লাস প্রকাশ করে বলল যে, দৃশ্যটি খুব চমৎকার। * Direct: মা বললেন, "সবসময় সত্যি কথা বলবে।" > Indirect: মা সত্য কথা বলার উপদেশ দিলেন। * Direct: সে বলল, "আমি কি ভেতরে আসতে পারি?" > Indirect: সে অনুমতি চেয়ে বলল যে, সে ভেতরে আসতে পারে কি না। * Direct: রাজা বললেন, "শত্রুকে বন্দি করো।" > Indirect: রাজা শত্রুকে বন্দি করার আদেশ দিলেন। * Direct: সে বলল, "ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুন।" > Indirect: সে প্রার্থনা করল যেন ঈশ্বর সকলের মঙ্গল করেন। * Direct: আমি বললাম, "আমি আজ আসব না।" > Indirect: আমি বললাম যে, আমি সেদিন আসব না। * Direct: বালকটি বলল, "বাবা, আমাকে একটি কলম কিনে দাও।" > Indirect: বালকটি তার বাবাকে একটি কলম কিনে দেওয়ার অনুরোধ করল। * Direct: সে আমাকে বলল, "তুমি কোথায় যাচ্ছো?" > Indirect: সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল যে, আমি কোথায় যাচ্ছি। * Direct: মিতু বলল, "আমি ভাত খাব না।" > Indirect: মিতু বলল যে, সে ভাত খাবে না। * Direct: তিনি বললেন, "পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে।" > Indirect: তিনি বললেন যে, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। (চিরন্তন সত্য) * Direct: সে বলল, "হায়! আমি মারা গেলাম।" > Indirect: সে শোকাভিভূত হয়ে বলল যে, সে মারা গেছে। * Direct: বন্ধু বলল, "চল আমরা খেলি।" > Indirect: বন্ধু খেলার প্রস্তাব দিল। * Direct: সে বলল, "আমি এই কাজ করতে পারব না।" > Indirect: সে বলল যে, সে সেই কাজ করতে পারবে না। * Direct: শিক্ষক বললেন, "তোমরা কি বুঝতে পেরেছ?" > Indirect: শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন যে, তারা বুঝতে পেরেছে কি না। * Direct: সে আমাকে বলল, "তোমার নাম কী?" > Indirect: সে আমার নাম জানতে চাইল। * Direct: সে বলল, "ইশ! যদি পাখি হতে পারতাম!" > Indirect: সে আক্ষেপ করে বলল যে, সে যদি পাখি হতে পারত! * Direct: রফিক বলল, "আমি গত বছর পাস করেছি।" > Indirect: রফিক বলল যে, সে তার আগের বছর পাস করেছিল। * Direct: সে বলল, "আমি আগামীকাল বাড়ি যাব।" > Indirect: সে বলল যে, সে তার পরের দিন বাড়ি যাবে। * Direct: সে বলল, "ধন্যবাদ!" > Indirect: সে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করল। * Direct: সে বলল, "বিদায় বন্ধুরা!" > Indirect: সে বন্ধুদের বিদায় সম্ভাষণ জানাল। * Direct: রীনা বলল, "আমি অনেক খুশি।" > Indirect: রীনা আনন্দ প্রকাশ করে বলল যে, সে অনেক খুশি। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ পাঠ্যসূচির ধারাবাহিকতায় দ্বাদশ অধ্যায় হিসেবে "পদাশ্রিত নির্দেশক ও বিরামচিহ্ন (Articles / Markers and Punctuation)"-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিচে এই অধ্যায়ের বিস্তারিত আলোচনা, প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা এবং প্রতি টপিক থেকে ৩০টি করে উদাহরণ ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। অধ্যায় ১২: পদাশ্রিত নির্দেশক ও বিরামচিহ্ন (Articles and Punctuation) ১. পদাশ্রিত নির্দেশক (Articles / Markers) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা যে সমস্ত বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি (যেমন—টি, টা, খানি, খানা, গুলো, গুলি ইত্যাদি) বিশেষ্য পদের পরে যুক্ত হয়ে নির্দিষ্টতা, অনির্দিষ্টতা, একবচন বা বহুবচন নির্দেশ করে, সেগুলোকে পদাশ্রিত নির্দেশক বলে। এগুলো মূলত পদের আশ্রয়ে থেকে নির্দেশক বা পদের রূপ ফুটিয়ে তোলে। পদাশ্রিত নির্দেশকের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * বইটি (নির্দিষ্টতা - 'টি'): নির্দিষ্ট কোনো একক বস্তু বা বই বোঝাতে 'টি' যুক্ত হয়েছে। * কলমটা (নির্দিষ্টতা - 'টা'): বস্তুবাচক বিশেষ্যের পরে নির্দিষ্টকরণ অর্থে 'টা' বসেছে। * গাছখানি (নির্দিষ্টতা - 'খানি'): আদরের বা নির্দিষ্ট রূপের প্রকাশ ঘটাতে 'খানি' ব্যবহৃত হয়েছে। * খাতাখানা (নির্দিষ্টতা - 'খানা'): খাতা বা কাগজ জাতীয় বস্তুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রূপ। * টাকাগুলো (বহুবচন ও নির্দিষ্টতা - 'গুলো'): একাধিক বস্তু বা নির্দিষ্ট বহুবচন বোঝাতে 'গুলো' যুক্ত হয়েছে। * আমগুলি (বহুবচন - 'গুলি'): ফলের বহুবচন ও নির্দিষ্টতা প্রকাশ করতে। * লোকটা (নির্দিষ্ট ব্যক্তি): নির্দিষ্ট কোনো মানুষকে নির্দেশ করতে 'টা' যুক্ত হয়েছে। * পুতুলটি (নির্দিষ্ট খেলনা): ক্ষুদ্র বা নির্দিষ্ট বস্তু বোঝাতে 'টি'। * গাছগুলো (বহুবচন নির্দেশক): একাধিক গাছের উপস্থিতি বোঝাতে। * সে একটা পাগল (অনির্দিষ্টতা - 'একটা'): নির্দিষ্ট নয় এমন বা অনির্দিষ্ট একক বোঝাতে। * লোকটি কে? (নির্দিষ্ট ব্যক্তি): প্রশ্নবাচক বা নির্দিষ্টকরণে 'টি'। * বইখানা কোথায়? (নির্দিষ্ট বস্তু): নির্দিষ্ট খানা নির্দেশক। * কলমটি হারিয়েছে (নির্দিষ্ট একক): নির্দিষ্ট কলমের হারানো বোঝাতে। * পাখিটা উড়ে গেল (নির্দিষ্ট প্রাণিবাচক): নির্দিষ্ট পাখি বোঝাতে 'টা'। * ছেলেটি ভালো (নির্দিষ্ট বালক): বিশেষ কোনো ছেলেকে বোঝাতে 'টি'। * মেয়েটি গান গাইছে (নির্দিষ্ট বালিকা): নির্দিষ্টকরণ অর্থে 'টি'। * টাকাটা দাও (নির্দিষ্ট পরিমাণ বা একক): নির্দিষ্ট মুদ্রা বোঝাতে 'টা'। * বাড়ি খানি সুন্দর (নির্দিষ্ট আশ্রয় বা গৃহ): সুনির্দিষ্ট বাড়ি বোঝাতে 'খানি'। * ছাগলগুলো মাঠে চরছে (বহুবচন): একাধিক পশুর নির্দিষ্ট দল। * কথাটি সত্যি (নির্দিষ্ট বিষয়): নির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য বা সত্যতা প্রকাশ করতে। * আমটা মিষ্টি (নির্দিষ্ট ফল): নির্দিষ্ট আমের স্বাদ বোঝাতে। * নদীটি বড় (নির্দিষ্ট জলস্রোত): নির্দিষ্ট নদী বোঝাতে 'টি'। * খাতাটা নাও (নির্দিষ্ট বস্তুর গ্রহণ): নির্দিষ্ট খাতা নির্দেশ করতে। * পাগলটা আবার এল (নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা অবজ্ঞা): নির্দিষ্টকরণ অর্থে 'টা'। * ফুলগুলো শুকিয়ে গেছে (বহুবচন): নির্দিষ্ট ফুলের সমাহার। * পাখিগুলো ডাকছে (বহুবচন): একাধিক পাখির নির্দিষ্ট আওয়াজ। * ঘটনাটি দুঃখজনক (নির্দিষ্ট বিষয়): সুনির্দিষ্ট ঘটনা বোঝাতে 'টি'। * সমস্যাটি সমাধান করো (নির্দিষ্ট সমস্যা): নির্দিষ্ট বিষয় নির্দেশ করতে। * দিনটা ভালো কাটল (নির্দিষ্ট কাল): নির্দিষ্ট দিন বোঝাতে 'টা'। * রাতটা দীর্ঘ ছিল (নির্দিষ্ট সময়): নির্দিষ্ট রাত বোঝাতে 'টা'। ২. বিরামচিহ্ন বা যতিচিহ্ন (Punctuation Marks) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা লেখার সময় বাক্যের অর্থ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার জন্য, বক্তার মনের ভাব ও আবেগ বোঝানোর জন্য এবং শ্বাস নেওয়ার বা বিরতি নেওয়ার জন্য যে সমস্ত চিহ্ন ব্যবহার করা হয়, সেগুলোকে বিরামচিহ্ন বা যতিচিহ্ন বলে। বাংলা ভাষায় প্রমিত বিরামচিহ্নের প্রচলন করেন বিদ্যাসাগর মহাশয়। বিরামচিহ্নের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * দাঁড়ি বা পূর্ণচ্ছেদ (।): বাক্যের সমাপ্তি বোঝাতে ব্যবহৃত হয় (যেমন: আমি স্কুলে যাই।) * কমা (,): অল্প বিরতি বা সমজাতীয় পদ আলাদা করতে ব্যবহৃত হয় (যেমন: আম, কাঁঠাল, লিচু আমার প্রিয়।) * সেমিকোলন (;): কমার চেয়ে একটু বেশি বিরতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয় (যেমন: কাল বৃষ্টি হতে পারে; তাই ছাতা নিয়ে যাও।) * কোলন (:): কোনো উদাহরণের বা বিবৃতির আগে ব্যবহৃত হয় (যেমন: নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:) * প্রশ্নচিহ্ন বা জিজ্ঞাসা চিহ্ন (?): বাক্যে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা বা প্রশ্ন করা হলে (যেমন: তোমার নাম কী?) * বিস্ময়সূচক চিহ্ন (!): আবেগ, বিস্ময়, ঘৃণা বা হর্ষ প্রকাশ করতে (যেমন: বাঃ! কী সুন্দর দৃশ্য!) * উদ্ধরণ চিহ্ন (“ ”): কারোর সরাসরি উক্তি বা উদ্ধৃতি বোঝাতে (যেমন: রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে।”) * হাইফেন বা সংযোগ চিহ্ন (-): সমাসবদ্ধ পদ বা দুটি শব্দকে এক করতে (যেমন: বাবা-মা, ভাই-বোন)। * ড্যাস (—): বিবৃতির পরিসর বাড়াতে বা উদাহরণের পূর্বে (যেমন: তিনি হলেন—আমাদের প্রধান শিক্ষক)। * ব্র্যাকেট বা বন্ধনচিহ্ন ((), {}, []): অতিরিক্ত তথ্য বা স্পষ্টীকরণের জন্য (যেমন: কাজী নজরুল ইসলাম (বিদ্রোহী কবি) ১৯১৮ সালে...) * বলো তো কে এলো? (প্রশ্নবোধক চিহ্ন): প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত যতি। * আহা! বড় কষ্ট হলো (বিস্ময়সূচক চিহ্ন): দুঃখ বা অনুশোচনা প্রকাশ করতে। * বই, খাতা, কলম (কমা): একাধিক বিশেষ্য পদ পাশাপাশি বসালে। * একটি পাকা আম দাও (দাঁড়ি): বাক্য শেষে পূর্ণাঙ্গ সমাপ্তি। * লোকটি বলল, "আমি যাব" (কমা ও উদ্ধরণ চিহ্ন): উক্তির শুরুতে কমা এবং ভেতরে উদ্ধৃতি। * ওগো শোনো (সম্বোধন পদ ও কমা): কাউকে ডেকে কথা বলার সময় কমা বসে। * সবশেষে পূর্ণচ্ছেদ (।): অনুচ্ছেদ বা বাক্যের ইতি টানতে। * এ-সব কথা এখন বাদ দাও (হাইফেন): পদের মাঝের সংযোগ রক্ষা করতে। * বিরামচিহ্নের প্রবর্তক (প্রসঙ্গগত তথ্য): ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ব্যাকরণে বিরামচিহ্নের সফল ব্যবহার করেন। * সে কাল আসবে কি না জানি না (দাঁড়ি): বিবৃতিমূলক বাক্যের সমাপ্তি। * বাহ! চমৎকার লিখেছ (বিস্ময়চিহ্ন): উচ্ছ্বাস প্রকাশে। * বিজ্ঞান বলে: পৃথিবী ঘোরে (কোলন): বড় বিবৃতির আগে। * যদি তুমি আসো; তবে আমি যাব (সেমিকোলন): জটিল বাক্যের খণ্ডাংশে বিরতি। * সততাই সর্বোত্তম পন্থা (দাঁড়ি): প্রবাদের সমাপ্তি। * কেমন আছো তুমি? (প্রশ্নচিহ্ন): কুশল বিনিময়ে। * হায়! সব শেষ হয়ে গেল (বিস্ময়চিহ্ন): আকস্মিক বিপর্যয়ে। * লাল, নীল, হলুদ ফুল (কমা): রঙের তালিকা বোঝাতে। * কথাটি সত্য—এতে কোনো সন্দেহ নেই (ড্যাস): বক্তব্যের গভীরতা বাড়াতে। * মা-বাবা আমাদের গুরুজন (হাইফেন): যুগল শব্দে। * সমাপ্ত (পূর্ণচ্ছেদ): লেখার চূড়ান্ত সমাপ্তি নির্দেশক। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ পাঠ্যসূচির ধারাবাহিকতায় ত্রয়দশ অধ্যায় হিসেবে "বাংলা ভাষার পরিভাষা ও পারিভাষিক শব্দ (Terminology)"-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিচে এই অধ্যায়ের বিস্তারিত আলোচনা, প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা এবং ত্রিশটি গুরুত্বপূর্ণ পারিভাষিক শব্দের উদাহরণ ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। অধ্যায় ১৩: বাংলা ভাষার পরিভাষা ও পারিভাষিক শব্দ (Terminology) পারিভাষিক শব্দ (Terminology) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসন, আইন, সাহিত্য বা বিভিন্ন শাস্ত্রের বিশেষ অর্থবোধক বিদেশি শব্দকে হুবহু ব্যবহার না করে, তার সমার্থক বা ভাবার্থমূলক যে সুনির্দিষ্ট বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়, তাকে পারিভাষিক শব্দ বলে। পরিভাষার মূল উদ্দেশ্য হলো বিদেশি বা জটিল ধারণাকে মাতৃভাষায় সহজ ও নির্ভুলভাবে ফুটিয়ে তোলা। পারিভাষিক শব্দের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * Act (অ্যাক্ট): আইন বা বিধান। (আইনগত দলিল বা বিধি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়)। * Affidavit (অ্যাফিডেভিট): হলফনামা। (লিখিত ও শপথপূর্বক বিবৃতি)। * Agenda (এজেন্ডা): কার্যতালিকা। (কোনো সভার আলোচনার নির্ধারিত সূচি)। * Audit (অডিট): নিরীক্ষা। (হিসাবপত্র পরীক্ষা ও যাচাই করার প্রক্রিয়া)। * Autobiography (অটোবায়োগ্রাফি): আত্মজীবনী। (নিজের জীবনের কাহিনি নিজে লেখা)। * Bibliography (বিবলিওগ্রাফি): গ্রন্থপঞ্জি। (ব্যবহৃত বা পঠিত বইগুলোর তালিকা)। * Budget (বাজেট): বাজেট বা আর্থিক প্রাক্কলন। (নির্দিষ্ট সময়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব)। * Cabinet (ক্যাবিনেট): মন্ত্রীপরিষদ। (সরকারের নীতিনির্ধারক মন্ত্রীদের সভা)। * Census (সেন্সাস): জনগণনা বা আদমশুমারি। (জনসংখ্যা গণনার প্রাতিষ্ঠানিক কাজ)। * Certificate (সার্টিফিকেট): প্রত্যয়নপত্র বা শংসাপত্র। (যোগ্যতা বা পদের দাপ্তরিক সনদ)। * Code (কোড): সংহিতা বা বিধি। (আইন বা নিয়মের সংকলন)। * copyright (কপিরাইট): গ্রন্থস্বত্ব। (লেখকের লেখার ওপর আইনি অধিকার)। * Deficit (ডেফিসিট): ঘাটতি। (আয়ের তুলনায় ব্যয়ের আধিক্য বা কমতি)। * Delegation (ডেলিগেশন): প্রতিনিধিদল। (কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রেরিত দল)। * Dictionary (ডিকশনারি): অভিধান। (শব্দের ভাণ্ডার ও অর্থসম্বলিত গ্রন্থ)। * Diplomacy (ডিপ্লোম্যাসি): কূটনীতি। (রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক রক্ষার কৌশল)। * Draft (ড্রাফট): مسودة বা খসড়া। (কোনো লেখার প্রাথমিক বা কাঁচা রূপ)। * Economy (ইকোনমি): অর্থনীতি। (সম্পদ উৎপাদন ও বণ্টনের বিজ্ঞান)। * Embargo (এম্বারগো): অবরোধ। (বাণিজ্যিক বা চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা)। * Epidemic (এপিডেমিক): মহামারি। (ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া রোগ)। * Gazette (গেজেট): সরকারি প্রজ্ঞাপন বা গ্যাজেট। (সরকারের ಅಧಿಕৃত ঘোষণা)। * Honorarium (হনোরারিয়াম): সম্মাননা বা পারিশ্রমিক। (সেবার বিনিময়ে প্রদত্ত সম্মানজনক অর্থ)। * Hypothesis (হাইপোথিসিস): অনুকল্প। (কোনো গবেষণার প্রাথমিক ধারণা বা অনুমান)। * Inflation (ইনফ্লেশন): মুদ্রাস্ফীতি। (টাকার মান কমে যাওয়া ও পণ্যের দাম বৃদ্ধি)। * Interim (ইন্টেরিম): অন্তর্বর্তীকালীন। (স্থায়ী হওয়ার পূর্ববর্তী সাময়িক সময়)। * Manifesto (ম্যানিফেস্টো): ইশতেহার। (রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের নির্বাচনী ঘোষণা)। * Monopoly (মনোপলি): একচেটিয়া। (কোনো ব্যবসার ওপর একক অধিকার)। * Nominee (নমিনি): মনোনীত ব্যক্তি। (কোনো সুবিধার জন্য পূর্বে নির্ধারিত ব্যক্তি)। * Passport (পাসপোর্ট): ছাড়পত্র বা পাসপোর্ট। (আন্তর্জাতিক ভ্রমণের পরিচয়পত্র)। * Plagiarism (প্লেজিয়ারিজম): ভাবচুরি। (অন্যের লেখা বা গবেষণা নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া)। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ পাঠ্যসূচির ধারাবাহিকতায় চতুর্দশ অধ্যায় হিসেবে "বাক্য রূপান্তর ও বাক্য সংকোচন (Sentence Transformation and One-Word Substitution)"-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিচে এই অধ্যায়ের বিস্তারিত আলোচনা, প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা এবং প্রতি টপিক থেকে ত্রিশটি করে উদাহরণ ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। অধ্যায় ১৪: বাক্য রূপান্তর ও বাক্য সংকোচন (Sentence Transformation and One-Word Substitution) ১. বাক্য রূপান্তর (Transformation of Sentences) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা অর্থ অপরিবর্তিত রেখে বাক্যের গঠনগত বা ভাবগত কাঠামোর পরিবর্তন ঘটানোর প্রক্রিয়াকে বাক্য রূপান্তর বলে। যেমন—একটি সরল বাক্যকে জটিল বা যৌগিক বাক্যে রূপান্তর করা কিংবা ইতিবাচক বাক্যকে নেতিবাচক বাক্যে রূপান্তর করা। বাক্য রূপান্তরের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা (মূল বাক্য > রূপান্তরিত রূপ) * মূল বাক্য (সরল): সূর্যোদয়ে অন্ধকার দূর হয়। > রূপান্তরিত (জটিল): যখন সূর্য ওঠে, তখন অন্ধকার দূর হয়। (সরল থেকে জটিল) * মূল বাক্য (জটিল): যে পরিশ্রম করে, সে-ই সফল হয়। > রূপান্তরিত (সরল): পরিশ্রমী ব্যক্তিরাই সফল হয়। (জটিল থেকে সরল) * মূল বাক্য (যৌগিক): সে গরিব, কিন্তু অত্যন্ত সৎ। > রূপান্তরিত (জটিল): যদিও সে গরিব, তবুও সে অত্যন্ত সৎ। (যৌগিক থেকে জটিল) * মূল বাক্য (সরল): জ্ঞানীরা সর্বদাই সম্মানিত হন। > রূপান্তরিত (জটিল): যারা জ্ঞানী, তারা সর্বদাই সম্মানিত হন। * মূল বাক্য (ইতিবাচক): মানুষ মরণশীল। > রূপান্তরিত (নেতিবাচক): মানুষ অমর নয়। (অর্থ ঠিক রেখে নেতিবাচক করা) * মূল বাক্য (নেতিবাচক): আমি কখনোই মিথ্যা বলি না। > রূপান্তরিত (ইতিবাচক): আমি সর্বদা সত্যি কথা বলি। * মূল বাক্য (বিবৃতিমূলক): এ দৃশ্য অত্যন্ত মনোরম। > রূপান্তরিত (আবেগসূচক): বাঃ! কী মনোরম দৃশ্য এটি! * মূল বাক্য (আবেগসূচক): হায়! আমার সব শেষ হয়ে গেল। > রূপান্তরিত (বিবৃতিমূলক): এটি অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে আমার সব শেষ হয়ে গেছে। * মূল বাক্য (প্রশ্নসূচক): কে না দেশপ্রেমিক হতে চায়? > রূপান্তরিত (বিবৃতিমূলক): সবাই দেশপ্রেমিক হতে চায়। * মূল বাক্য (বিবৃতিমূলক): সবাই তাকে ভালোবাসে। > রূপান্তরিত (প্রশ্নসূচক): তাকে কে না ভালোবাসে? * মূল বাক্য (অনুজ্ঞাসূচক): দরজাটি বন্ধ করো। > রূপান্তরিত (বিবৃতিমূলক): তোমার প্রতি আমার অনুরোধ, দরজাটি বন্ধ করো। * মূল বাক্য (সরল): বিপদে পড়ে আমাকে সাহায্য করো। > রূপান্তরিত (জটিল): যখন তুমি বিপদে পড়বে, তখন আমাকে সাহায্য করো। * মূল বাক্য (যৌগিক): সে কষ্ট করল এবং সফল হলো। > রূপান্তরিত (সরল): কষ্ট করে সে সফল হলো। * মূল বাক্য (জটিল): যদি তুমি আসো, তবে আমি যাব। > রূপান্তরিত (যৌগিক): তুমি এসো এবং আমি যাব। * মূল বাক্য (ইতিবাচক): তিনি খুব ধনী। > রূপান্তরিত (নেতিবাচক): তিনি গরিব নন। * মূল বাক্য (নেতিবাচক): সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। > রূপান্তরিত (ইতিবাচক): কেবল সে-ই ছিল। * মূল বাক্য (প্রশ্নসূচক): নদীর সৌন্দর্য কে না মুগ্ধ করে? > রূপান্তরিত (বিবৃতিমূলক): নদীর সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে। * মূল বাক্য (বিবৃতিমূলক): আমাদের কঠোর পরিশ্রম করা উচিত। > রূপান্তরিত (অনুজ্ঞাসূচক): কঠোর পরিশ্রম করো। * মূল বাক্য (সরল): সাঁতার কাটা একটি ভালো ব্যায়াম। > রূপান্তরিত (জটিল): যা সাঁতার কাটা, তা একটি ভালো ব্যায়াম। * মূল বাক্য (জটিল): যিনি সৎ, তাকে সবাই শ্রদ্ধা করে। > রূপান্তরিত (সরল): সৎ ব্যক্তিকে সবাই শ্রদ্ধা করে। * মূল বাক্য (যৌগিক): সকাল হলো এবং পাখিরা গান গাইল। > রূপান্তরিত (সরল): সকাল হওয়াতে পাখিরা গান গাইল। * মূল বাক্য (ইতিবাচক): আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। > রূপান্তরিত (নেতিবাচক): আমি তোমাকে অবিশ্বাসী করি না / আমি তোমাকে অবিশ্বাস করি না। * মূল বাক্য (নেতিবাচক): এ কথা অস্বীকার করা যায় না। > রূপান্তরিত (ইতিবাচক): এ কথা অনস্বীকার্য। * মূল বাক্য (বিবৃতিমূলক): ফুলটি দেখতে খুব সুন্দর। > রূপান্তরিত (আবেগসূচক): কী সুন্দর ফুলটি! * মূল বাক্য (আবেগসূচক): শাবাশ! তোমরা জিতে গেছ। > রূপান্তরিত (বিবৃতিমূলক): এটি অত্যন্ত আনন্দের বিষয় যে তোমরা জিতে গেছ। * মূল বাক্য (প্রশ্নসূচক): জলে কি কুমির থাকে না? > রূপান্তরিত (বিবৃতিমূলক): জলে কুমির থাকে। * মূল বাক্য (সরল): মৃত্যুর পর সবাই স্মরণ করে। > রূপান্তরিত (জটিল): যখন মানুষ মারা যায়, তখন সবাই স্মরণ করে। * মূল বাক্য (যৌগিক): সে ঘরে প্রবেশ করল এবং আলো জ্বালাল। > রূপান্তরিত (সরল): সে ঘরে প্রবেশ করে আলো জ্বালাল। * মূল বাক্য (ইতিবাচক): কাজটি সহজ। > রূপান্তরিত (নেতিবাচক): কাজটি কঠিন নয়। * মূল বাক্য (জটিল): সে এতই দুর্বল যে হাঁটতে পারে না। > রূপান্তরিত (সরল): সে দুর্বল হওয়ার কারণে হাঁটতে পারে না। ২. বাক্য সংকোচন বা এককথায় প্রকাশ (One-Word Substitution) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বড় কোনো বাক্য বা বাক্যাংশকে যখন একটিমাত্র সংহত ও সুন্দর শব্দে প্রকাশ করা হয়, তখন তাকে বাক্য সংকোচন বা এককথায় প্রকাশ বলে। এটি ভাষার সংক্ষিপ্ততা ও ভাব প্রকাশের প্রাঞ্জলতা বৃদ্ধি করে। বাক্য সংকোচনের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * অক্ষির সমক্ষে বর্তমান = প্রত্যক্ষ: যা চোখের সামনে ঘটছে। * অক্ষির অগোচরে = পরোক্ষ: যা চোখের আড়ালে ঘটে। * অহংকার নেই যার = নিরহংকার: বিনয়ী ব্যক্তি। * অগ্রে জন্মেছে যে = অগ্রজ: বড় ভাই। * পশ্চাতে জন্মেছে যে = অনুজ: ছোট ভাই। * ইতিহাস রচনা করেন যিনি = ঐতিহাসিক: ইতিহাসবিদ। * উপকার স্বীকার করে যে = কৃতজ্ঞ: যে মানুষের উপকার মনে রাখে। * উপকার স্বীকার করে না যে = অকৃতজ্ঞ: যে উপকার ভুলে যায়। * একই গুরুর শিষ্য = সহাধ্যায়ী বা সহপাঠী: যারা একসাথে পড়াশোনা করে। * অনেকের মধ্যে একজন = অন্যতম: বহু জনের ভেতর বিশিষ্ট। * কর্ম করার শক্তি নেই যার = অকর্মা: অলস বা অকর্মণ্য। * কষ্টে জয় করা যায় যা = দুর্জয়: যা সহজে জয় করা যায় না। * জানার ইচ্ছা = জিজ্ঞাসা: জানার প্রবল স্পৃহা। * জয় করার ইচ্ছা = জিগীষা: বিজয়ী হওয়ার আকুতি। * লাভ করার ইচ্ছা = লিপ্সা: পাওয়ার প্রবল বাসনা। * যা বলা হয়নি = অনুক্ত: যা ব্যক্ত করা হয়নি। * যা সহজে পাওয়া যায় = সুলভ: যা সহজে মেলে। * যা সহজে মেলে না = দুর্লভ: যা অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য। * যা নিবারণ করা যায় না = অনিবার্য: যা অবশ্যম্ভাবী। * যা পূর্বে দেখা যায়নি = অদৃষ্টপূর্ব: যা কভু দেখা যায়নি। * যে নারীর স্বামী ও পুত্র নেই = অবীরা: সহায়হীন নারী। * যে পুরুষের স্ত্রী মারা গেছে = বিদুর: পত্নীহারা পুরুষ। * যে নারীর স্বামী বিদেশে থাকে = প্রোষিতভর্তৃকা: স্বামীর অনুপস্থিতিতে থাকা নারী। * হাতির ডাক = বৃংহিত: হাতির গর্জন। * সিংহের ডাক = নাদ: সিংহের হুংকার। * ঘোড়ার ডাক = হ্রেষা: অশ্বের আওয়াজ। * পায়ের থেকে মাথা পর্যন্ত = আপাদমস্তক: সম্পূর্ণ শরীর। * সকলের জন্য হিতকর = সর্বজনীন: যা সবার জন্য প্রযোজ্য। * সমুদ্রের তীর = বেলাভূমি বা সৈকত: সাগরের তটদেশ। * অরণ্যের আগুন = দাবানল: বনে লাগা আগুন। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ পাঠ্যসূচির ধারাবাহিকতায় পঞ্চদশ অধ্যায় হিসেবে "সন্ধি (Sandhi)"-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিচে এই অধ্যায়ের বিস্তারিত আলোচনা, প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা এবং স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গসন্ধি থেকে প্রতি টপিক থেকে ত্রিশটি করে উদাহরণ ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। অধ্যায় ১৫: সন্ধি (Sandhi) ১. স্বরসন্ধি (Vowel Sandhi) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা স্বরধ্বনির সাথে স্বরধ্বনির মিলনের ফলে যে ধ্বনিগত পরিবর্তন বা একরূফতা সৃষ্টি হয়, তাকে স্বরসন্ধি বলে। পাশাপাশি দুটি পদের প্রথম পদের শেষ ধ্বনি এবং দ্বিতীয় পদের প্রথম ধ্বনি যদি উভয়ই স্বরধ্বনি হয়, তবে তাকে স্বরসন্ধি বলা হয়। স্বরসন্ধির ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়: অ বা আ-এর পরে অ বা আ থাকলে উভয়ে মিলে 'আ' হয় (দীর্ঘ স্বরসন্ধি)। * রবীন্দ্র = রবি + ইন্দ্র: ই বা ঈ-এর পরে ই বা ঈ থাকলে উভয়ে মিলে দীর্ঘ 'ঈ' হয়। * পরীক্ষা = পরি + ঈক্ষা: ই-কার ও ঈ-কার মিলে দীর্ঘ ঈ-কার হয়েছে। * ভানুযুক্ত = ভানু + উদয়: উ-কার ও উ-কার মিলে দীর্ঘ ঊ-কার হয়েছে। * মহোৎসব = মহা + উৎসব: আ-এর সাথে উ যুক্ত হয়ে 'ও'-কার হয়েছে (গুণসন্ধি)। * সূর্যোদয় = সূর্য + উদয়: অ + উ = ও (গুণসন্ধি)। * মহর্ষি = মহা + ঋষি: আ + ঋ মিলে 'অর্' (রেফ) হয়েছে (গুণসন্ধি)। * একৈক = এক + এক: অ + এ মিলে 'ঐ'-কার হয়েছে (বৃদ্ধি সন্ধি)। * জলৌকা = জল + ওকা: অ + ও মিলে 'ঔ'-কার হয়েছে (বৃদ্ধি সন্ধি)। * প্রতি + এক = প্রত্যেক: ই বা ই-এর পরে ভিন্ন স্বর থাকলে ই স্থানে 'য়' হয় (যণসন্ধি)। * সু + আগত = স্বাগত: উ বা ঊ-এর পরে ভিন্ন স্বর থাকলে উ স্থানে 'ব' হয় (যণসন্ধি)। * নয়ন = নে + অন: এ-এর পরে ভিন্ন স্বর থাকায় এ স্থানে 'অয়' হয় (হাদাদি সন্ধি)। * গায়ক = গৈ + অক: ঐ-এর পরে স্বরধ্বনি থাকায় ঐ স্থানে 'আই' হয়। * পবন = পো + অন: ও-এর পরে স্বরধ্বনি থাকায় ও স্থানে 'অব' হয়। * গবাক্ষ = গো + অক্ষ: ও + অ মিলে 'অব' হয়েছে। * নাভিক = নৌ + ইক: ঔ-এর পরে স্বরধ্বনি থাকায় ঔ স্থানে 'আব' হয়। * মহেন্দ্র = মহা + ইন্দ্র: আ + ই = এ (গুণসন্ধি)। * পরােপকার = পর + উপকার: অ + উ = ও (গুণসন্ধি)। * সদয় = স + দয়: সাধারণ স্বরসন্ধি। * বিদ্যালয় = বিদ্যা + আলয়: দীর্ঘ স্বরসন্ধি। * মহাশয় = মহা + আশয়: আ + আ = আ। * হিতৈষী = হিত + এষী: অ + এ = ঐ। * জলৌষধ = জল + ওষধি: অ + ও = ঔ। * যদি + অপি = যদিপি (যদ্যপি): ই + অ = য্য। * অনু + ইত = অন্বিত: উ + ই = ন্বিত। * গবষণ = গো + এষণ: ও + এ = গবষণ (গবেষণা)। * সতি + ইন্দ্র = সতীন্দ্র: ই + ই = ঈ। * বূহু + উদয় = ভানুদয়: উ + উ = ঊ। * সপ্তর্ষি = সপ্ত + ঋষি: অ + ঋ = অর্। * ইতি + আদি = ইত্যাদি: ই + আ = যা (যণসন্ধি)। ২. ব্যঞ্জনসন্ধি (Consonant Sandhi) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে স্বরধ্বনি, স্বরধ্বনির সাথে ব্যঞ্জনধ্বনি কিংবা ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে ব্যঞ্জনধ্বনির মিলনের ফলে যে সন্ধি গঠিত হয়, তাকে ব্যঞ্জনসন্ধি বলে। ব্যঞ্জনসন্ধির ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * উচ্চারণ = উৎ + চারণ: ত বা দ-এর পরে চ বা ছ থাকলে ত বা দ স্থানে চ হয়। * বিপদজনক = বিপদ + জনক: দ-এর সাথে জ যুক্ত হয়ে জ-ফলা হয়েছে। * দিগন্ত = দিক + অন্ত: বর্গের প্রথম ধ্বনি ক-এর পরে স্বরধ্বনি আসায় তা গ-এ পরিণত হয়েছে। * জগদীশ = জগৎ + ঈশ: ত-এর জায়গায় দ হয়েছে। * সংবাদ = সম্ + বাদ: ম-এর পরে ব থাকায় ম স্থানে অনুস্বার (ং) হয়েছে। * পদ্ধতি = পথ্ + হতি: ত + হ মিলে 'দ্ধ' হয়েছে। * উল্লাস = উৎ + উল্লাস: ত-এর পরে ল থাকায় ত ল-এ রূপান্তরিত হয়েছে। * সৎকর্ম = সৎ + কর্ম: ব্যঞ্জনে ব্যঞ্জনে মিলনের নিখাদ রূপ। * পরিচ্ছেদ = পরি + চেদ: স্বরধ্বনির পরে ছ থাকলে চ্ছ হয়। * সম্পূর্ণ = সম্ + পূর্ণ: ম-এর পরে প থাকায় ম স্থানে অনুস্বার বা ম বহাল থাকে। * সঞ্চয় = সম্ + চয়: ম-এর পরে চ থাকায় ম স্থানে ঞ হয়েছে। * সঞ্চালন = সম্ + চালন: ম স্থানে ঞ-এর ব্যবহার। * উন্নতি = উৎ + নতি: ত-এর পরে ন থাকায় ত ন-এ পরিণত হয়েছে। * ষান্মাসিক = ষট্ + মাসিক: ট-এর পরে ম থাকায় ট ণ হয়েছে। * জগন্নাথ = জগৎ + नाथ (নাথ): ত-এর পরে ন থাকায় ন-এ রূপান্তর। * তদ্গত = তৎ + গত: ত-এর পরে গ থাকায় ত দ হয়েছে। * বিপদসংকুল = বিপদ + সংকুল: ব্যঞ্জনধ্বনির মিলন। * সংসার = সম্ + সার: স-এর পূর্বে ম স্থানে অনুস্বার হয়েছে। * সংহার = সম্ + হার: ম স্থানে অনুস্বার। * সঙ্কলন = সম্ + কলন: ম স্থানে ঙ হয়েছে। * বাকজালের = বাক্ + জাল: ক গ হয়েছে। * অচিরাৎ = অচির্ + আৎ: ত-এর রূপান্তর। * মরুৎ + ময় = মরুণ্ময়: ত বর্গের পরিবর্তন। * সৎ + ধর্ম = সদ্ধর্ম: ত দ হয়েছে। * বৃহৎ + হরি = বৃহচ্ছরি: ত ও হ-এর মিলন। * উৎ + শ্বাস = উচ্ছ্বাস: ত ও শ-এর মিলনে চ্ছ হয়েছে। * তৎ + সম = তৎসম: ব্যঞ্জনসন্ধির সহজ রূপ। * খণ্ডিত = খণ্ড্ + ইত: স্বর ও ব্যঞ্জনের মিলন। * সদুপদেশ = সৎ + উপদেশ: ত দ হয়েছে। * বিচ্ছেদ = বি + ছেদ: স্বরধ্বনির পরে ছ থাকায় চ্ছ হয়েছে। ৩. বিসর্গসন্ধি (Visarga Sandhi) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বিসর্গ (ঃ)-এর সাথে স্বরধ্বনি বা ব্যঞ্জনধ্বনির মিলনের ফলে বিসর্গ লোপ পেয়ে বা পরিবর্তিত হয়ে যে নতুন শব্দ গঠিত হয়, তাকে বিসর্গসন্ধি বলে। বিসর্গসন্ধি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত (র-জাত এবং ও-কার জাত)। বিসর্গসন্ধির ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * নিস্তব্ধ = নিস্ + স্তব্ধ: বিসর্গের পরে স থাকলে বিসর্গ স্থানে স হয়। * মনোহর = মনঃ + হর: বিসর্গ অ-কারের পরে থাকলে তা 'ও'কারে পরিণত হয়। * আশীর্বাদ = আঃ + বাদ: বিসর্গ লোপ পেয়ে রেফ বা র-কার হয়েছে। * দুর্গম = দুঃ + গম: বিসর্গ স্থানে 'র্' বা রেফ হয়েছে। * অহর্নিশ = অহঃ + নিশ: বিসর্গ স্থানে র-কার যুক্ত হয়েছে। * নির্বোধ = নিঃ + বোধ: বিসর্গ স্থানে রেফ হয়েছে। * দুরাচার = দুঃ + আচার: বিসর্গ র-এ রূপান্তরিত হয়েছে। * নিষ্কলঙ্ক = নিঃ + কলঙ্ক: বিসর্গ স্থানে মূর্ধন্য ষ হয়েছে। * নমস্কার = নমঃ + কার: বিসর্গ স্থানে দন্ত্য স হয়েছে। * বয়োধিক = বয়ঃ + অধিক: বিসর্গ ও-কারে পরিণত হয়েছে। * অন্তরঙ্গ = অন্তঃ + অঙ্গ: বিসর্গ র হয়েছে। * মনোরম = মনঃ + রম: বিসর্গ ও-কার হয়েছে। * পুরোহিত = পুরঃ + হিত: ও-কার জাত বিসর্গসন্ধি। * তপোবন = তপঃ + বন: বিসর্গ ও-কারে রূপান্তরিত হয়েছে। * তেজোদীপ্ত = তেজঃ + দীপ্ত: ও-কার জাত সন্ধি। * তিরোভাব = তিরঃ + ভাব: বিসর্গ ও-কার হয়েছে। * পয়োধর = পয়ঃ + ধর: মেঘ অর্থে বিসর্গ ও-কার রূপ নিয়েছে। * শিরোভূষণ = শিরঃ + ভূষণ: বিসর্গ ও-কার হয়েছে। * মনোযোগ = মনঃ + যোগ: মনোযোগ শব্দে বিসর্গ ও-কার হয়েছে। * নিষ্ফল = নিঃ + ফল: বিসর্গ ষ হয়েছে। * দুশ্চিন্তা = দুঃ + চিন্তা: বিসর্গ চ থাকায় শ হয়েছে। * নিশ্চিন্ত = নিঃ + চিন্ত: বিসর্গ স্থানে শ হয়েছে। * দুঃসাহস = দুঃ + সাহস: বিসর্গ ও স অক্ষত বা স-এ রূপান্তর। * অন্তঃকরণ = অন্তঃ + করণ: বিসর্গের অপরিবর্তিত রূপ। * ভাঃ + কর = ভাস্কর: ব্যতিক্রমী নিয়মে বিসর্গ লোপ পেয়ে দন্ত্য স হয়েছে। * বৃহস্পতি = বৃহতঃ + পতি: বিসর্গের বিশেষ রূপ। * অহর্টিকা = অহঃ + টীকা: র-জাত বিসর্গসন্ধি। * পুনরায় = পুনর + আয় (পুনঃ + আয়): বিসর্গ র হয়েছে। * অন্তিম = অন্তঃ + ম: বিসর্গসন্ধির প্রয়োগ। * অন্তর্জলী = অন্তঃ + জল: বিসর্গ র-এ রূপান্তরিত হয়েছে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ পাঠ্যসূচির ধারাবাহিকতায় ষোড়শ অধ্যায় হিসেবে "কারক ও বিভক্তি (Case and Inflection)"-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিচে এই অধ্যায়ের বিস্তারিত আলোচনা, প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা এবং প্রতি টপিক থেকে ত্রিশটি করে উদাহরণ ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। অধ্যায় ১৬: কারক ও বিভক্তি (Case and Inflection) ১. কারক (Case) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বাক্যস্থিত ক্রিয়াপদের সাথে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের যে সরাসরি সম্পর্ক বা অন্বয় থাকে, তাকে কারক বলে। বাক্যের ক্রিয়াপদকে কে, কি, কাকে, কোথায়, কখন ইত্যাদি প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায়, তার ওপর ভিত্তি করে কারক প্রধানত ছয় প্রকার: কর্তৃকারক, কর্মকারক, করণকারক, সম্প্রদান (বা নিমিত্ত) কারক, অপাদান কারক এবং অধিকরণ কারক। কারকের ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * পাগলে কিনা বলে! (কর্তৃকারক - ৭মী বিভক্তি): বাক্যের মূল কাজ সম্পাদনকারী 'পাগল' হলো কর্তৃকারক। * বুলবুলিতে ধান খেয়েছে (কর্তৃকারক - তে বিভক্তি): ধান খাওয়ার কাজটি বুলবুলি নিজে সম্পন্ন করছে। * ডাক্তার ডাকো (কর্মকারক - শূন্য বিভক্তি): যাকে আশ্রয় করে বা যাকে নিয়ে ক্রিয়া সম্পন্ন হয় তা কর্মকারক। * আমাকে একটি কলম দাও (কর্মকারক - কে বিভক্তি): গৌণ কর্মে 'কে' বিভক্তি যুক্ত হয়েছে। * ফুলে ফুলে ঘর ভরেছে (করণ কারক - এ বিভক্তি): যার মাধ্যমে বা যে উপায়ে কাজ সম্পন্ন হয় তা করণ কারক। * লাঠি দিয়ে সাপ মারো (করণ কারক - দিয়ে অনুসর্গ): মারার মাধ্যম বা যন্ত্র হলো লাঠি। * সৎপাত্রে কন্যা দান কর (সম্প্রদান কারক - সপ্তমী বিভক্তি): স্বত্ব ত্যাগ করে কিছু দান করা বুঝলে সম্প্রদান কারক হয় (আধুনিক ব্যাকরণে একে নিমিত্ত কারকও বলা হয়)। * অন্ধকে আলো দাও (সম্প্রদান কারক - কে বিভক্তি): নিঃস্বার্থ সাহায্য বা দান অর্থে। * গাছ থেকে পাতা পড়ে (অপাদান কারক - থেকে অনুসর্গ): যা থেকে কিছু বিচ্যুত, জাত, ভীত বা রক্ষিত হয় তা অপাদান কারক। * বিপদ থেকে বাঁচাও (অপাদান কারক - থেকে অনুসর্গ): রক্ষা পাওয়া বা মুক্তি অর্থে অপাদান। * বনে বাঘ থাকে (অধিকরণ কারক - এ বিভক্তি): স্থান, কাল বা বিষয়কে অধিকরণ কারক বলে। * সকালে সূর্য ওঠে (অধিকরণ কারক - কালাধিকরণ): সময় নির্দেশক অধিকরণ কারক। * ব্যাকরণে আমার আগ্রহ আছে (অধিকরণ কারক - বিষয়াবলম্বন): কোনো বিষয়ে পারদর্শিতা বা আগ্রহ বোঝালে। * টেবিলে বই রাখা আছে (অধিকরণ কারক - আধার অধিকরণ): স্থানবাচক অধিকরণ। * শিক্ষক মহাশয় পড়াচ্ছেন (কর্তৃকারক - মুখ্য কর্তা): মূল কর্তা নিজে সরাসরি কাজ করছেন। * পিতা পুত্রকে পড়াচ্ছেন (প্রযোজক কর্তা ও প্রযোজ্য কর্ম): মূল কর্তা যখন অপরকে কাজে নিয়োজিত করেন। * বিনা মেঘে বজ্রপাত (অপাদান কারক - উৎস বা কারণ): আকাশ থেকে বজ্রপাত জাত অর্থে অপাদান। * পাপীকে ঘৃণা করো (কর্মকারক): কাকে ঘৃণা করবে?—পাপীকে (কর্মপদ)। * কলমে লেখা যায় (করণ কারক): লেখার যন্ত্র বা মাধ্যম হলো কলম। * অংকে আমার ভয় (অপাদান কারক - ভীতিবাচক): যেখানে ভয় বা আতঙ্ক উৎপন্ন হয়। * চিনিতে মিষ্টি হয় (কর্তৃকারক - গুণবাচক): বস্তুর স্বাভাবিক গুণের প্রকাশ। * টাকায় কি না হয়! (করণ কারক - উপায়): টাকার মাধ্যমে সব কাজ সম্ভব। * গুরুজনে ভক্তি কর (কর্মকারক): শ্রদ্ধা বা ভক্তির কর্ম। * পুকুরে মাছ আছে (অধিকরণ কারক - স্থান): পুকুর হলো মাছের আধার। * বর্ষায় বৃষ্টি হয় (অধিকরণ কারক - কালবাচক): বর্ষাকালীন সময় নির্দেশক। * নদীতে পানি আছে (অধিকরণ কারক): জলধারার আধার বা স্থান। * তিনি ব্যাকরণে পণ্ডিত (অধিকরণ কারক - বিষয়): পারদর্শিতা বোঝাতে অধিকরণ। * সাপের ভয়ে কে না কাঁপে (অপাদান কারক): ভীতি বা আতঙ্কগ্রস্ত হওয়া। * ঐ দেখ পাখি উড়ে যায় (কর্তৃকারক): ওড়ার কাজ পাখি নিজেই করছে। * আমাকে একটি আম দাও (কর্মকারক): দ্বিকর্মক বাক্যের গৌণ কর্মের ব্যবহার। ২. বিভক্তি (Inflection / Case Markers) প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা শব্দের সাথে যে বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি যুক্ত হয়ে পদ গঠন করে এবং বাক্যের মধ্যে কারক বা পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাতে সাহায্য করে, তাকে বিভক্তি বলে। বাংলা ব্যাকরণে বিভক্তি প্রধানত শব্দবিভক্তি (যেমন—কে, রে, এ, তে ইত্যাদি) এবং ক্রিয়াবিভক্তি হিসেবে পরিচিত। বিভক্তির ৩০টি উদাহরণ ও ব্যাখ্যা * বইটি (শূন্য বিভক্তি বা অ-বিভক্তি): যেখানে দৃশ্যমান কোনো বিভক্তি যুক্ত হয় না (বা অদৃশ্যভাবে থাকে)। * কলমে (এ বিভক্তি): 'কলম' শব্দের সাথে 'এ' বিভক্তি যুক্ত হয়ে করণ কারক হয়েছে। * ছেলেরা (এরা বিভক্তি): বহুবচন ও কারক নির্দেশক বিভক্তি। * নদীতে (তে বিভক্তি): অধিকরণ কারকে 'তে' বিভক্তি যুক্ত রূপ। * স্কুলে (এ বিভক্তি): স্থান বা অধিকরণ বোঝাতে 'এ' বিভক্তি। * বাবাকে (কে বিভক্তি): কর্মকারকে 'কে' বিভক্তি। * মাকে (কে বিভক্তি): গৌণ কর্মে বিভক্তির প্রয়োগ। * পাগলে (এ বিভক্তি): কর্তৃকারকে 'এ' বিভক্তি। * বুলবুলিতে (তে বিভক্তি): কর্তৃকারকে 'তে' বা 'এতে' বিভক্তি। * টাকায় (য় বিভক্তি বা অন্ত্যস্থ অ): করণ কারকে বিভক্তির রূপ। * দেশকে (কে বিভক্তি): কর্মকারকের বিভক্তি। * ঘরে (এ বিভক্তি): অধিকরণ কারকে ঘরের সাথে 'এ'। * বনে (এ বিভক্তি): স্থানবাচক অধিকরণে 'এ'। * সকালে (এ বিভক্তি): কালবাচক অধিকরণে বিভক্তি। * জনে জনে (এ বিভক্তি): বচন ও বিভক্তির মেলবন্ধন। * গাছে (এ বিভক্তি): অপাদান বা অধিকরণে বিভক্তির রূপ। * খাতায় (য় বিভক্তি): করণে বা অধিকরণে ব্যবহৃত বিভক্তি। * ফুলে (এ বিভক্তি): করণ কারকে বিভক্তি। * অগ্নিতে (তে বিভক্তি): অধিকরণে বিভক্তি। * সমুদ্রে (এ বিভক্তি): আধার অধিকরণে বিভক্তি। * মনে (এ বিভক্তি): বিষয় বা অধিকরণ বোঝাতে। * পদ্মা নদীর (এর বিভক্তি): ষষ্ঠী বিভক্তি বা সম্বন্ধ পদ গঠনে। * রহিমের (এর বিভক্তি): সম্বন্ধ পদের বিভক্তি। * আমার (র বিভক্তি): সর্বনাম পদের সাথে 'র' বিভক্তি। * তোমার (র বিভক্তি): সম্বন্ধ পদে বিভক্তি। * তাদের (দের বিভক্তি): বহুবচনান্তক বিভক্তি। * ছাত্রদের (দের বিভক্তি): সম্বন্ধ পদে বহুবচন নির্দেশক। * পণ্ডিতের (এর বিভক্তি): বিশেষ্যের সাথে বিভক্তি। * মায়ের (এর বিভক্তি): মাতৃসংক্রান্ত সম্বন্ধ পদ। * দেশের (এর বিভক্তি): দেশবাচক শব্দের সাথে বিভক্তি।

দ্বিতীয় ভাগ: বাংলা নির্মিতি (Composition)

১. অনুচ্ছেদ ও রচনা রচনা (Paragraph and Essay Writing)

  • সারাংশ ও সারমর্ম লিখন

  • ভাবসম্প্রসারণ (গদ্য ও পদ্য)

  • প্রতিবেদন রচনা (সংবাদপত্র বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন)

  • প্রবন্ধ রচনা (বিজ্ঞান, পরিবেশ, ছাত্রজীবন, ঐতিহ্য, সমাজসচেতনতামূলক ইত্যাদি)

২. পত্র লিখন (Letter Writing)

  • ব্যক্তিগত চিঠি (বন্ধু বা আত্মীয়ের কাছে)

  • প্রাতিষ্ঠানিক বা আবেদনপত্র (প্রধান শিক্ষক/প্রধান শিক্ষকের নিকট ছুটির আবেদন, চাকরির আবেদন ইত্যাদি)

  • ব্যবসায়িক বা সম্পাদকীয় পত্র (সংবাদপত্রের সম্পাদকের কাছে চিঠি)

৩. সংলাপ ও কথকথন (Dialogue Writing)

  • দুটি চরিত্রের মধ্যে কাল্পনিক সংলাপ রচনা (যেমন: পরিবেশ দূষণ রোধে দুই বন্ধুর কথোপকথন, বইমেলা নিয়ে আলোচনা ইত্যাদি)

  • বাংলা নির্মিতির (দ্বিতীয় ভাগ) প্রতিটি অংশের একটি করে মানসম্মত উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

    ১. অনুচ্ছেদ ও রচনা রচনা (Paragraph & Composition)

    • ক) সারমর্ম (কবিতা অংশ):

      মূল কবিতা বা অংশ: গত হ’ল দিন, রাতে হ’ল শেষ, আসিল নতুন প্রভাত অশেষ...
      সারমর্ম: অতীতকে নিয়ে পড়ে না থেকে বর্তমানের কর্মের মধ্য দিয়েই মানুষের জীবনকে সুন্দর ও সার্থক করে তুলতে হবে। নতুন দিন নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে আসে।

    • খ) ভাবসম্প্রসারণ:

      উক্তি: "পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি।"
      ভাবসম্প্রসারণ: মানুষের জীবনে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলেই সাফল্য আসে না। কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় হলো যেকোনো সফলতার চাবিকাঠি। অলস ব্যক্তির ভাগ্যও তার সহায় হয় না; একমাত্র কর্মঠ ও পরিশ্রমী মানুষই জীবনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।

    • গ) প্রতিবেদন রচনা:

      বিষয়: বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ পালন।
      প্রতিবেদন:
      বিদ্যালয়ে সাড়ম্বরে পালিত হলো বিশ্ব পরিবেশ দিবস
      নিজস্ব প্রতিনিধি, করদহ: গত ৫ই জুন করদহ বিদ্যাপীঠে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হলো। দিনটি উপলক্ষে সকালে এক বর্ণাঢ্য র‍্যালি বিদ্যালয়ের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এরপর বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে প্রধান শিক্ষক মহাশয় ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন ফল ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা হয়। ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে পরিবেশ সচেতনতামূলক একটি আলোচনাসভা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সমাপ্ত হয়।

    • ঘ) প্রবন্ধ রচনা:

      বিষয়ের রূপরেখা (যেমন: ছাত্রজীবনে খেলাধুলা):
      ১. ভূমিকা
      ২. ছাত্রজীবনে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা ও শারীরিক বিকাশ
      ৩. মানসিক উৎকর্ষ ও শৃঙ্খলাবোধ গঠনে খেলাধুলা
      ৪. পড়াশোনার সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা
      ৫. উপসংহার

    ২. পত্র লিখন (Letter Writing)

    • ক) প্রাতিষ্ঠানিক বা আবেদনপত্র (প্রধান শিক্ষকের নিকট):

      মাননীয় প্রধান শিক্ষক মহাশয়,

      করদহ বিদ্যাপীঠ, করদহ, দক্ষিণ দিনাজপুর।

      বিষয়: অসুস্থতার কারণে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার জন্য ছুটির আবেদন।

      মহাশয়,

      বিনীত নিবেদন এই যে, আমি আপনার বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির একজন ছাত্র। গত কাল হঠাৎ অতিরিক্ত জ্বর ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে আমি বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারিনি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আমাকে আগামী তিন দিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে।

      অতএব, মহাশয়ের নিকট একান্ত প্রার্থনা, গত ১৬/০৮/২০২৬ থেকে ১৮/০۸/২০২৬ তারিখ পর্যন্ত আমার তিন দিনের ছুটি মঞ্জুর করে বাধিত করবেন।

      নিবেদক,

      আপনার একান্ত অনুগত ছাত্র

      অর্ক সরকার (শ্রেণি: অষ্টম, রোল: ০৫)

    ৩. সংলাপ রচনা (Dialogue Writing)

    • বিষয়: মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার ও ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা নিয়ে দুই বন্ধুর কথোপকথন।

      অমিত: কিরে রাহুল, আজকাল তোকে অনলাইনে খুব কম দেখা যায়, তাছাড়া পড়াশোনার অবস্থাও কেমন যেন মনে হচ্ছে?

      রাহুল: আর বলিস না দোস্ত! মোবাইল ফোনে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া আর অনলাইন গেম খেলে সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পড়ার টেবিলে বসলেও মন টিকছে না।

      অমিত: বুঝতেই তো পারছিস, প্রযুক্তির প্রয়োজন রয়েছে, তবে তার অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের মনোযোগ ও সময় দুটোই নষ্ট করছে। আমাদের উচিত এখনই একটি নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করে পড়াশোনায় মন দেওয়া।

      রাহুল: একদম ঠিক বলেছিস। কাল থেকেই আমি মোবাইল ব্যবহারের সময় কমিয়ে দেবো বলে ভাবছি।