মেনু ও পেজসমূহ

দশম শ্রেণির ভূগোল


 * বহির্জাত প্রক্রিয়া ও তাদের সৃষ্ট ভূমিরূপ (নদীর কাজ, হিমবাহের কাজ এবং বায়ুর কাজ)

 * বায়ুমণ্ডল

 * বারিমণ্ডল

 * বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

 * ভারতের কৃষি

 * ভারতের পরিবহণ ব্যবস্থা

 * উপগ্রহ চিত্র ও বৈচিত্র্য সূচক মানচিত্র






প্রথম অধ্যায়: বহির্জাত প্রক্রিয়া ও তাদের সৃষ্ট ভূমিরূপ – প্রথম পর্ব (নদীর কাজ)-এর ওপর ভিত্তি করে আপনার চাওয়া ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ১০টি টীকা এবং ৫টি বড় প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো।

পর্ব ১: ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)

১. বহির্জাত প্রক্রিয়ার মূল শক্তি বা উৎস কী?

উত্তর: সূর্য।

২. যে প্রক্রিয়ায় ভূপৃষ্ঠের উঁচু জায়গার উচ্চতা হ্রাস পায় তাকে কী বলে?

উত্তর: অবরোহণ (Degradation)।

৩. যে প্রক্রিয়ায় নিচু স্থান ভরাট হয়ে উচ্চতা বৃদ্ধি পায় তাকে কী বলে?

উত্তর: আরোহণ (Aggradation)।

৪. অবরোহণ ও আরোহণের সম্মিলিত ফল কী?

উত্তর: পর্যায়ন (Gradation)।

৫. 'পর্যায়ন' (Gradation) শব্দটি প্রথম কে ব্যবহার করেন?

উত্তর: ভূতত্ত্ববিদ চেম্বারলিন ও স্যালিসবারি।

৬. নদীর প্রধান কাজ কয়টি ও কী কী?

উত্তর: ৩টি (ক্ষয়, বহন এবং সঞ্চয় বা অবক্ষেপণ)।

৭. পৃথিবীর বৃহত্তম নদী অববাহিকা কোনটি?

উত্তর: আমাজন নদী অববাহিকা।

৮. ভারতের বৃহত্তম নদী অববাহিকা কোনটি?

উত্তর: গঙ্গা নদী অববাহিকা।

৯. নদীর জলপ্রবাহ মাপার একক কী?

উত্তর: কিউসেক এবং কিউমেক।

১০. আদর্শ নদী কাকে বলে?

উত্তর: যে নদীর গতিপথে উচ্চগতি, মধ্যগতি ও নিম্নগতি—এই তিনটি গতিই স্পষ্টভাবে দেখা যায় তাকে আদর্শ নদী বলে (যেমন- গঙ্গা)।

১১. নদীর উচ্চ বা পার্বত্য গতির প্রধান কাজ কী?

উত্তর: ক্ষয়কাজ।

১২. নদীর মধ্য গতির প্রধান কাজ কী?

উত্তর: বহন ও সামান্য সঞ্চয়।

১৩. নদীর নিম্ন গতির প্রধান কাজ কী?

উত্তর: সঞ্চয় বা অবক্ষেপণ।

১৪. 'I' আকৃতির নদী উপত্যকাকে কী বলে?

উত্তর: ক্যানিয়ন (Canyon)।

১৫. 'V' আকৃতির নদী উপত্যকাকে কী বলে?

উত্তর: গিরিখাত (Gorge)।

১৬. পৃথিবীর গভীরতম গিরিখাত কোনটি?

উত্তর: নেপালের কালীগণ্ডকী নদীর গিরিখাত (অন্ধ গলচি)।

১৭. পৃথিবীর দীর্ঘতম ক্যানিয়ন কোনটি?

উত্তর: কলোরাডো নদীর 'গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন'।

১৮. জলপ্রপাতের তলদেশে সৃষ্ট হাঁড়ির মতো গর্তকে কী বলে?

উত্তর: প্রপাতকূপ (Plunge pool)।

১৯. নদীর নদীগর্ভে সৃষ্ট ছোট ছোট গোলাকার গর্তকে কী বলে?

উত্তর: মন্তকূপ (Pothole)।

২০. পলল শঙ্কু ও পলল ব্যজনী নদীর কোন গতিতে সৃষ্টি হয়?

উত্তর: উচ্চগতি থেকে মধ্যগতিতে প্রবেশের সময় (পাহাড়ের পাদদেশে)।

২১. নদীবাঁক বা মিয়েন্ডার (Meander) নামকরণ কোন নদীর নামানুসারে হয়েছে?

উত্তর: তুরস্কের 'মিয়েনড্রেস' নদীর নামানুসারে।

২২. অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ নদীর কোন গতিতে দেখা যায়?

উত্তর: নিম্নগতিতে (কখনো কখনো মধ্যগতির শেষভাগেও দেখা যায়)।

২৩. প্লাবনভূমি কোথায় সৃষ্টি হয়?

উত্তর: নদীর নিম্নগতিতে।

২৪. স্বাভাবিক বাঁধ (Natural Levee) কোথায় গড়ে ওঠে?

উত্তর: প্লাবনভূমির দুপাশে নদীর তীর বরাবর।

২৫. পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ কোনটি?

উত্তর: গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীর ব-দ্বীপ।

২৬. পাখির পায়ের মতো আকৃতির ব-দ্বীপ কোন নদীর মোহনায় দেখা যায়?

উত্তর: মিসিসিপি-মিসৌরি নদীর মোহনায়।

২৭. ব-দ্বীপ (Delta) সৃষ্টির একটি প্রধান অনুকূল পরিবেশ লেখো।

উত্তর: নদীর মোহনায় অগভীর সমুদ্র ও স্রোতের বেগ কম থাকা।

২৮. ষষ্ঠ ঘাতের সূত্র (Sixth Power Law) কে আবিষ্কার করেন?

উত্তর: ডব্লিউ হপকিন্স (W. Hopkins)।

২৯. ষষ্ঠ ঘাতের সূত্র অনুযায়ী নদীর বেগ দ্বিগুণ হলে বহন ক্ষমতা কত গুণ বাড়ে?

উত্তর: ৬৪ গুণ।

৩০. কিউসেক কী?

উত্তর: নদীর নির্দিষ্ট স্থান দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে কত ঘনফুট জল প্রবাহিত হয় তার পরিমাপ।

৩১. কিউমেক কী?

উত্তর: প্রতি সেকেন্ডে কত ঘনমিটার জল প্রবাহিত হয় তার পরিমাপ।

৩২. শৃঙ্খলিত শৈলশিরা (Interlocking spur) নদীর কোন গতিতে দেখা যায়?

উত্তর: উচ্চ গতিতে।

৩৩. খরস্রোত বা Rapids কোথায় দেখা যায়?

উত্তর: উচ্চ গতিতে, কঠিন ও কোমল শিলা উলম্বভাবে অবস্থান করলে।

৩৪. ভারতের উচ্চতম জলপ্রপাত কোনটি?

উত্তর: কর্ণাটকের বরাহী নদীর উপর অবস্থিত কুঞ্চিকল (Kunchikal)।

৩৫. শুষ্ক অঞ্চলের গিরিখাতকে কী বলে?

উত্তর: ক্যানিয়ন।

৩৬. নদীর উৎস অঞ্চলের অববাহিকাকে কী বলে?

উত্তর: ধারণ অববাহিকা (Catchment Area)।

৩৭. দুটি নদীর মধ্যবর্তী স্থানকে কী বলে?

উত্তর: দোয়াব।

৩৮. খাড়ি (Estuary) কী?

উত্তর: নদীর ফানেল আকৃতির চওড়া মোহনাকে খাড়ি বলে।

৩৯. একটি তীক্ষ্ণাগ্র (Cuspate) ব-দ্বীপের উদাহরণ দাও।

উত্তর: ইতালির তাইবার নদীর ব-দ্বীপ বা ভারতের সুবর্ণরেখা নদীর ব-দ্বীপ।

৪০. পৃথিবীর বৃহত্তম নদী-দ্বীপ বা চর কোনটি?

উত্তর: ব্রহ্মপুত্র নদের 'মাজুলি' দ্বীপ।

পর্ব ২: ১০টি টীকা (মান - ২ বা ৩)

১. পর্যায়ন (Gradation): বহির্জাত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উঁচু স্থান ক্ষয় পেয়ে নিচু হওয়া (অবরোহণ) এবং নিচু স্থান সঞ্চয় কাজের মাধ্যমে ভরাট হয়ে উঁচু হওয়ার (আরোহণ) ফলে ভূপৃষ্ঠের একটি সাধারণ বা সমতল তল তৈরি হওয়ার সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে পর্যায়ন বলে।

২. ধারণ অববাহিকা (Catchment Area): পার্বত্য অঞ্চলে বা নদীর উৎস অঞ্চলে বৃষ্টির জল, বরফগলা জল বা ছোট ছোট উপনদীগুলি যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে জল সংগ্রহ করে প্রধান নদী সৃষ্টি করে, সেই সমগ্র অঞ্চলটিকে ওই নদীর ধারণ অববাহিকা বলে।

৩. ষষ্ঠ ঘাতের সূত্র (Sixth Power law): নদীর জলের পরিমাণ এবং গতিবেগের উপর নদীর বহন ক্ষমতা নির্ভর করে। ১৮৪২ সালে ডব্লিউ হপকিন্স দেখান যে, নদীর জলের গতিবেগ যদি দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়, তবে নদীর ওই জলের কোনো পদার্থ বহনের ক্ষমতা ৬৪ গুণ (২^৬) বৃদ্ধি পায়। একেই ষষ্ঠ ঘাতের সূত্র বলে।

৪. মন্তকূপ (Potholes): নদীর উচ্চগতিতে অবঘর্ষ ক্ষয়ের ফলে নদীগর্ভের কোমল শিলায় যে ছোট ছোট গোলাকার হাঁড়ির মতো গর্তের সৃষ্টি হয়, তাকে মন্তকূপ বা পটহোল বলে। এগুলি একসঙ্গে অনেক থাকলে তাকে পটহোল কলোনি বলে।

৫. প্রপাতকূপ (Plunge Pool): জলপ্রপাতের জল তীব্র বেগে অনেক উঁচু থেকে খাড়াভাবে নদীগর্ভে পড়লে অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় সেখানে যে বিশাল গোলাকার ও গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়, তাকে প্রপাতকূপ বলে।

৬. পলল ব্যজনী (Alluvial Fan): নদী যখন পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে সমভূমিতে এসে পড়ে, তখন ভূমির ঢাল হঠাৎ কমে যাওয়ায় নদীর বহন ক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে পর্বতের পাদদেশে পলি, বালি, কাঁকর ইত্যাদি সঞ্চিত হয়ে যে হাতপাখার মতো বা অর্ধগোলাকার ভূমিরূপ গঠন করে তাকে পলল ব্যজনী বলে।

৭. অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ (Ox-bow Lake): নদীর নিম্নগতিতে নদী খুব বেশি এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হলে দুটি বাঁকের মধ্যবর্তী অংশ ক্ষয় পেতে পেতে কাছাকাছি চলে আসে। একসময় নদী সোজা পথে বইতে শুরু করে এবং পরিত্যক্ত বাঁকা অংশটি অশ্বের (ঘোড়ার) ক্ষুরের মতো আকৃতি নিয়ে মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হ্রদরূপে অবস্থান করে। একে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলে।

৮. মিয়েন্ডার (Meander): সমভূমি বা নিম্নগতিতে ভূমির ঢাল কম থাকায় নদীর স্রোত কমে যায়। সামনে কোনো ছোটখাটো বাধা এলেও নদী তাকে ক্ষয় করতে না পেরে পাশ কাটিয়ে এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়। নদীর এই আঁকাবাঁকা গতিপথকেই মিয়েন্ডার বলা হয়।

৯. স্বাভাবিক বাঁধ (Natural Levee): নিম্নগতিতে বর্ষাকালে নদীতে অতিরিক্ত জল এলে দুকূল ছাপিয়ে বন্যা হয়। বন্যার জলের সাথে বাহিত পলি, বালি, কাদা নদীর পাড়ে সঞ্চিত হয়। বছরের পর বছর এই সঞ্চয়ের ফলে নদীর দুপাশে যে উঁচু বাঁধের মতো ভূমিরূপ তৈরি হয়, তাকে স্বাভাবিক বাঁধ বলে।

১০. কিউসেক ও কিউমেক (Cusec and Cumec): নদীর জলপ্রবাহ পরিমাপের একক হলো কিউসেক ও কিউমেক। কিউসেক অর্থাৎ Cubic foot per second, যার অর্থ নদীর কোনো নির্দিষ্ট অংশ দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে কত ঘনফুট জল প্রবাহিত হচ্ছে। আর কিউমেক হলো Cubic meter per second, অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে কত ঘনমিটার জল প্রবাহিত হচ্ছে।

পর্ব ৩: ৫টি রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৫)

১. নদীর উচ্চগতিতে বা পার্বত্য প্রবাহে ক্ষয়কাজের ফলে সৃষ্ট তিনটি প্রধান ভূমিরূপের বিবরণ দাও।

উত্তর: নদীর উচ্চগতিতে নদীর স্রোত বেশি থাকায় নদী মূলত অবঘর্ষ ও জলপ্রবাহ ক্ষয় প্রক্রিয়ায় ভূমিরূপ গঠন করে। প্রধান তিনটি ভূমিরূপ হলো:

 * V-আকৃতির উপত্যকা বা গিরিখাত: পার্বত্য প্রবাহে নদীর স্রোত বেশি থাকার কারণে নদী পার্শ্বক্ষয়ের থেকে নিম্নক্ষয় বেশি করে। এর ফলে নদী উপত্যকা গভীর ও সংকীর্ণ হয়ে ইংরেজি 'V' অক্ষরের মতো আকার ধারণ করে। একে গিরিখাত বলে। যেমন- হিমালয়ে গঙ্গা নদীর গিরিখাত।

 * ক্যানিয়ন: বৃষ্টিহীন শুষ্ক মরু অঞ্চলে পার্শ্বক্ষয় একেবারে না হওয়ায় নদী কেবল নিম্নক্ষয় করে। ফলে নদী উপত্যকা খুব সংকীর্ণ ও গভীর হয়ে ইংরেজি 'I' অক্ষরের রূপ নেয়। একে ক্যানিয়ন বলে। যেমন- কলোরাডো নদীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন।

 * জলপ্রপাত: নদীর গতিপথে কঠিন ও কোমল শিলা আড়াআড়ি বা লম্বালম্বিভাবে অবস্থান করলে কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এর ফলে নদীর জলস্রোত খাড়া ঢাল বেয়ে উপর থেকে সজোরে নিচে পতিত হয়। একে জলপ্রপাত বলে। যেমন- সুবর্ণরেখা নদীর হুড্রু জলপ্রপাত। (পরীক্ষায় উত্তর লেখার সময় প্রতিটি ভূমিরূপের পাশে পেনসিল দিয়ে সরল চিত্র আঁকা আবশ্যক)।

২. নদীর নিম্নগতিতে সঞ্চয়কাজের ফলে সৃষ্ট তিনটি প্রধান ভূমিরূপের বিবরণ দাও।

উত্তর: নিম্নগতিতে নদীর ঢাল প্রায় থাকে না বলে নদীর একমাত্র কাজ হলো সঞ্চয় করা। এর ফলে সৃষ্ট তিনটি ভূমিরূপ হলো:

 * প্লাবনভূমি: বর্ষাকালে নদীতে অতিরিক্ত জল এলে দুকূল ছাপিয়ে বন্যার সৃষ্টি হয়। বন্যার জল নেমে গেলে ওই অঞ্চলে নদী বাহিত পলি, বালি, কাদা থিতিয়ে পড়ে যে উর্বর সমভূমির সৃষ্টি করে তাকে প্লাবনভূমি বলে। গঙ্গা নদীর নিম্ন অববাহিকায় এমন প্লাবনভূমি দেখা যায়।

 * স্বাভাবিক বাঁধ: প্লাবনভূমিতে বন্যার সময় নদীবাহিত নুড়ি, বালি, পলি নদীর তীর বরাবর সঞ্চিত হতে থাকে। ক্রমাগত সঞ্চয়ের ফলে নদীর দু’পাড় ক্রমশ উঁচু হয়ে প্রাকৃতিক বাঁধের সৃষ্টি করে, যা স্বাভাবিক বাঁধ নামে পরিচিত।

 * ব-দ্বীপ: নদীর একেবারে মোহনার কাছে স্রোত প্রায় শূন্য হয়ে যায়। ফলে নদীবাহিত সমস্ত পদার্থ মোহনায় সঞ্চিত হয়ে মাত্রাহীন বাংলা 'ব' (বা গ্রিক অক্ষর ডেল্টা Δ) এর মতো আকৃতির যে দ্বীপ তৈরি করে তাকে ব-দ্বীপ বলে। যেমন- গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের ব-দ্বীপ।

৩. নদীর মোহনায় ব-দ্বীপ সৃষ্টির অনুকূল ভৌগোলিক শর্তাবলি আলোচনা করো।

উত্তর: সব নদীর মোহনায় ব-দ্বীপ গড়ে ওঠে না। ব-দ্বীপ সৃষ্টির জন্য নিম্নলিখিত অনুকূল শর্তগুলি প্রয়োজন:

 * দীর্ঘ নদীপথ ও উপনদী: নদীপথ দীর্ঘ হলে এবং প্রচুর উপনদী থাকলে নদীর জলের পরিমাণ ও বাহিত পলির পরিমাণ অনেক বেশি হয়, যা ব-দ্বীপ গঠনে সাহায্য করে।

 * অগভীর সমুদ্র: মোহনার কাছে সমুদ্র অগভীর হলে পলি সহজেই সমুদ্রবক্ষে সঞ্চিত হয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে জেগে ওঠে।

 * সমুদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটার প্রকোপ কম: মোহনায় তীব্র সমুদ্রস্রোত বা জোয়ার-ভাটা থাকলে সঞ্চিত পলি ভেসে যায়। তাই ব-দ্বীপ সৃষ্টির জন্য সমুদ্র শান্ত থাকা প্রয়োজন।

 * বিপরীতমুখী বায়ু: মোহনায় নদী যেদিক থেকে সমুদ্রে পড়ছে, তার বিপরীত দিক থেকে বায়ু প্রবাহিত হলে নদীর গতি বাধা পায় এবং পলি দ্রুত সঞ্চিত হয়।

 * লবণাক্ততা: সমুদ্রের জলের লবণাক্ততা বেশি থাকলে নদীর জলে ভাসমান সূক্ষ্ম পলি ও কাদা দ্রুত থিতিয়ে পড়ে ব-দ্বীপ গঠন ত্বরান্বিত করে।

৪. নদীর ক্ষয়কাজের প্রধান প্রক্রিয়াগুলি কী কী? আলোচনা করো।

উত্তর: নদী মূলত চারটি প্রক্রিয়ায় ক্ষয়কাজ করে থাকে। এগুলি হলো:

 * জলপ্রবাহ ক্ষয়: নদীর জলের প্রবল স্রোতের আঘাতে নদীগর্ভ ও নদীর দু'পাশের পাড় থেকে নরম শিলাস্তর আলগা হয়ে ভেঙে যায়। একে জলপ্রবাহ ক্ষয় বলে।

 * অবঘর্ষ ক্ষয় (Abrasion): নদীর স্রোতের সাথে বয়ে চলা নুড়ি, পাথর, বোল্ডার ইত্যাদির সাথে নদীখাতের (নদীর তলদেশ ও পাড়) ঘর্ষণকে অবঘর্ষ বলে। এই প্রক্রিয়ায় নদীখাত সবচেয়ে বেশি গভীর হয় এবং মন্তকূপ সৃষ্টি হয়।

 * ঘর্ষণ ক্ষয় (Attrition): নদীর জলের সাথে বয়ে চলা পাথরখন্ডগুলি নিজেদের মধ্যে ঠোকাঠুকি লেগে ভেঙে গিয়ে অপেক্ষাকৃত ছোটো, মসৃণ ও গোলাকার নুড়ি ও বালিতে পরিণত হয়। একে ঘর্ষণ ক্ষয় বলে।

 * দ্রবণ ক্ষয় (Corrosion): নদীর গতিপথে চুনাপাথর, ডলোমাইট বা জিপসাম জাতীয় দ্রবণীয় শিলা থাকলে তা নদীর জলের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় গলে বা দ্রবীভূত হয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। একে দ্রবণ ক্ষয় বলে।

৫. সুন্দরবন অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন বা বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব আলোচনা করো।

উত্তর: গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপের সক্রিয় অংশ সুন্দরবনের ওপর বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক। এর প্রধান প্রভাবগুলি হলো:

 * সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধি: বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে, ফলে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর জেরে সুন্দরবনের ঘোড়ামারা, লোহাচড়া, নিউ মুর প্রভৃতি দ্বীপগুলি জলের তলায় আংশিক বা সম্পূর্ণ তলিয়ে যাচ্ছে।

 * ভূমি ক্ষয় বৃদ্ধি: জলস্তর বৃদ্ধি এবং বারংবার বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় (যেমন- আয়লা, আমফান, যস) ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে নদীর পাড় ও সমুদ্র উপকূলের ব্যাপক ক্ষয় হচ্ছে।

 * লবণাক্ততা বৃদ্ধি: বন্যার ফলে এবং সমুদ্রের জল নদীপথে ভেতরে প্রবেশ করায় কৃষিজমি ও মিষ্টি জলের পুকুরে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কৃষিকাজ ও পানীয় জলের সংকট তৈরি করছে।

 * ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধ্বংস: অতিরিক্ত লবণাক্ততা এবং ক্রমাগত ডুবে যাওয়ার কারণে সুন্দরী, গরান, গেঁওয়া প্রভৃতি ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ ধ্বংস হচ্ছে।

 * বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্যের সংকট: অরণ্য হ্রাসের ফলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বাসস্থান ও খাদ্যের সংকট দেখা দিচ্ছে। মানুষও ভিটেমাটি হারিয়ে পরিবেশ-উদ্বাস্তু (Climate refugee) হচ্ছে।




দ্বিতীয় অধ্যায়: বহির্জাত প্রক্রিয়া ও তাঁদের সৃষ্ট ভূমিরূপ – দ্বিতীয় পর্ব (হিমবাহের কাজ)-এর ওপর ভিত্তি করে ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ১০টি টীকা এবং ৫টি বড় প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো।

পর্ব ১: ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)

১. হিমবাহ কী?

উত্তর: অভিকর্ষের টানে ধীরগতিতে ঢাল বেয়ে নেমে আসা বিশাল বরফের স্তূপকে হিমবাহ বলে।

২. পৃথিবীর বৃহত্তম মহাদেশীয় হিমবাহের নাম কী?

উত্তর: আন্টার্কটিকার ল্যাম্বার্ট (Lambert)।

৩. পৃথিবীর দীর্ঘতম উপত্যকা বা পার্বত্য হিমবাহের নাম কী?

উত্তর: আলাস্কার হুবার্ড (Hubbard)।

৪. ভারতের দীর্ঘতম হিমবাহের নাম কী?

উত্তর: কারাকোরাম পর্বতের সিয়াচেন (Siachen)।

৫. যে কাল্পনিক রেখার ওপর সারা বছর বরফ জমে থাকে এবং যার নিচে বরফ গলে যায় তাকে কী বলে?

উত্তর: হিমরেখা (Snowline)।

৬. মহাদেশীয় হিমবাহ অঞ্চলে বরফমুক্ত পর্বতশৃঙ্গকে কী বলে?

উত্তর: নুনাটাকস (Nunataks)।

৭. সমুদ্রে ভাসমান বিশাল বরফের স্তূপকে কী বলে?

উত্তর: হিমশৈল (Iceberg)।

৮. হিমশৈলের কত ভাগ জলের উপরে ভেসে থাকে?

উত্তর: ১/৯ ভাগ।

৯. হিমবাহ পৃষ্ঠে সৃষ্ট ফাটলগুলোকে কী বলে?

উত্তর: ক্রেভাস (Crevasse)।

১০. পর্বতগাত্র ও হিমবাহের মধ্যে সৃষ্ট ফাঁক বা ফাটলকে কী বলে?

উত্তর: বার্গস্রুন্ড (Bergschrund)।

১১. হিমবাহের ক্ষয়কাজের প্রধান দুটি প্রক্রিয়া কী কী?

উত্তর: উৎপাটন (Plucking) ও অবঘর্ষ (Abrasion)।

১২. হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে সৃষ্ট 'U' আকৃতির উপত্যকাকে কী বলে?

উত্তর: হিমদ্রোণী (Glacial Trough)।

১৩. ঝুলন্ত উপত্যকায় সাধারণত কী সৃষ্টি হয়?

উত্তর: জলপ্রপাত।

১৪. পাহাড়ের গায়ে হাতলবিহীন ডেকচেয়ারের মতো দেখতে হিমবাহের ক্ষয়জাত ভূমিরূপকে কী বলে?

উত্তর: করি (Corrie) বা সার্ক (Cirque)।

১৫. ফ্রান্সে সার্ক কী নামে পরিচিত?

উত্তর: সার্ক।

১৬. জার্মানিতে সার্ক কী নামে পরিচিত?

উত্তর: কার (Kar)।

১৭. ওয়েলসে সার্ক কী নামে পরিচিত?

উত্তর: কুম (Cwm)।

১৮. দুটি সার্কের মধ্যবর্তী খাড়া ও তীক্ষ্ণ শৈলশিরাকে কী বলে?

উত্তর: অ্যারেট (Arête) বা তীক্ষ্ণ শৈলশিরা।

১৯. তিন বা ততোধিক সার্ক বা করি পাশাপাশি তৈরি হলে মাঝখানের উঁচু চূড়াকে কী বলে?

উত্তর: পিরামিড চূড়া (Horn)।

২০. একটি বিখ্যাত পিরামিড চূড়ার উদাহরণ দাও।

উত্তর: আল্পস পর্বতের ম্যাটারহর্ন।

২১. হিমবাহের ক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট মসৃণ ও একদিকে ঢালু এবং অন্যদিকে এবড়োখেবড়ো শিলাস্তূপকে কী বলে?

উত্তর: রসে মতানে (Roche Moutonnee)।

২২. রসে মতানের অমসৃণ দিকটি কোন প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়?

উত্তর: উৎপাটন প্রক্রিয়ায়।

২৩. হিমবাহের গতিপথে কঠিন শিলা উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তাকে কী বলে?

উত্তর: ক্র্যাগ (Crag)।

২৪. ক্র্যাগের পিছনে সঞ্চিত কোমল শিলাস্তূপকে কী বলে?

উত্তর: টেল (Tail)।

২৫. হিমবাহ দ্বারা সৃষ্ট জলমগ্ন উপত্যকাকে কী বলে?

উত্তর: ফিয়র্ড (Fiord)।

২৬. পৃথিবীর গভীরতম ফিয়র্ড কোনটি?

উত্তর: নরওয়ের সোশনে ফিয়র্ড (Sognefjord)।

২৭. 'ফিয়র্ডের দেশ' কাকে বলা হয়?

উত্তর: নরওয়েকে।

২৮. অগভীর ফিয়র্ডকে কী বলে?

উত্তর: ফিয়ার্ড (Fjard)।

২৯. হিমবাহ দ্বারা পরিবাহিত ও সঞ্চিত শিলাখণ্ডকে একত্রে কী বলে?

উত্তর: গ্রাবরেখা (Moraine)।

৩০. হিমবাহের দুপাশে সঞ্চিত গ্রাবরেখাকে কী বলে?

উত্তর: পার্শ্ব গ্রাবরেখা।

৩১. দুটি হিমবাহ মিলিত হলে তাদের সংযোগস্থলে সৃষ্ট গ্রাবরেখাকে কী বলে?

উত্তর: মধ্য গ্রাবরেখা।

৩২. উল্টানো নৌকার মতো বা অর্ধেক কাটা ডিমের মতো দেখতে হিমবাহের সঞ্চয়জাত ভূমিরূপকে কী বলে?

উত্তর: ড্রামলিন (Drumlin)।

৩৩. ড্রামলিন অধ্যুষিত অঞ্চলকে কী বলে?

উত্তর: বাস্কেট অফ এগ টোপোগ্রাফি (Basket of egg topography) বা ডিমের ঝুড়ির মতো ভূপ্রকৃতি।

৩৪. হিমবাহ ও জলধারার মিলিত সঞ্চয় কার্যের ফলে সৃষ্ট সমভূমিকে কী বলে?

উত্তর: বহিঃধৌত সমভূমি বা স্যান্ডার (Outwash plain)।

৩৫. বহিঃধৌত সমভূমি নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন হলে তাকে কী বলে?

উত্তর: ভ্যালি ট্রেন (Valley Train)।

৩৬. হিমবাহ গলিত জলের স্রোতে সঞ্চিত দীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা শৈলশিরার মতো ভূমিরূপকে কী বলে?

উত্তর: এসকার (Esker)।

৩৭. হিমবাহের প্রান্তভাগে স্তরে স্তরে সঞ্চিত বদ্বীপের মতো ত্রিকোণাকার স্তূপকে কী বলে?

উত্তর: কেম (Kame)।

৩৮. বহিঃধৌত সমভূমিতে বরফ গলে সৃষ্ট ছোট ছোট গর্তকে কী বলে?

উত্তর: কেটল (Kettle)।

৩৯. কেটল হ্রদের তলদেশে সঞ্চিত পলি বা স্তরায়িত কাদা-মাটিকে কী বলে?

উত্তর: ভার্ব (Varve)।

৪০. কেটল গর্তের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া হ্রদকে কী বলে?

উত্তর: কেটল হ্রদ (Kettle lake)।

পর্ব ২: ১০টি টীকা (মান - ২ বা ৩)

১. হিমরেখা (Snowline): ভূপৃষ্ঠের যে সীমারেখার ওপর সারা বছর তুষারপাত হয় ও বরফ জমে থাকে এবং যে সীমারেখার নিচে গ্রীষ্মকালে বরফ গলে জল হয়ে যায়, তাকে হিমরেখা বলে। অক্ষাংশ, ভূমির উচ্চতা ও ঋতুভেদে হিমরেখার উচ্চতা পরিবর্তিত হয়।

২. হিমশৈল (Iceberg): মহাদেশীয় হিমবাহ সমুদ্র উপকূলে এসে পৌঁছালে সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙে গিয়ে বিশাল বিশাল বরফের চাঁই সমুদ্রে ভাসতে থাকে। সমুদ্রে ভাসমান এই বিশাল বরফের স্তূপকে হিমশৈল বলে। এর মাত্র ১/৯ অংশ জলের উপরে থাকে এবং বাকি ৮/৯ অংশ জলের নিচে থাকে।

৩. ক্রেভাস ও বার্গস্রুন্ড: হিমবাহের ওপরের পৃষ্ঠে সৃষ্ট অসংখ্য ফাটলকে ক্রেভাস (Crevasse) বলে। অন্যদিকে, পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ যখন পর্বতগাত্র বেয়ে নিচে নামে, তখন পর্বতগাত্র এবং হিমবাহের মধ্যে যে বিশাল ফাঁক বা ফাটলের সৃষ্টি হয় তাকে বার্গস্রুন্ড (Bergschrund) বলে।

৪. ঝুলন্ত উপত্যকা (Hanging Valley): প্রধান নদীর সাথে যেমন উপনদী এসে মেশে, তেমনি প্রধান হিমবাহের সাথে অনেক ছোট ছোট উপহিমবাহ এসে মেশে। প্রধান হিমবাহের উপত্যকা উপহিমবাহের উপত্যকা অপেক্ষা অনেক বেশি গভীর হয়। ফলে বরফ গলে গেলে মনে হয় যেন উপহিমবাহের উপত্যকাগুলি প্রধান হিমবাহ উপত্যকার ওপর ঝুলছে। একে ঝুলন্ত উপত্যকা বলে।

৫. রসে মতানে (Roche Moutonnee): হিমবাহের গতিপথে কোনো কঠিন শিলার ঢিবি থাকলে হিমবাহের অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় ঢিবির হিমবাহ প্রবাহের দিকটি মসৃণ ও ঢালু হয় এবং বিপরীত দিকটি উৎপাটন প্রক্রিয়ায় অমসৃণ, এবড়োখেবড়ো ও খাড়া হয়। এরূপ শিলাস্তূপকে রসে মতানে বলে।

৬. ফিয়র্ড (Fiord): উচ্চ অক্ষাংশে উপকূলবর্তী অঞ্চলে হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে গভীর 'U' আকৃতির উপত্যকা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীকালে হিমবাহ গলে গেলে বা সমুদ্রপৃষ্ঠের জলস্তর বৃদ্ধি পেলে ওই উপত্যকাগুলি সমুদ্রের জলে পূর্ণ হয়ে যায়। এই আংশিক জলমগ্ন হিমবাহ উপত্যকাকে ফিয়র্ড বলে।

৭. ড্রামলিন (Drumlin): হিমবাহের সঞ্চয়কাজের ফলে সৃষ্ট উল্টানো নৌকা বা অর্ধেক কাটা ডিমের মতো দেখতে ছোট ছোট ঢিবিকে ড্রামলিন বলে। এগুলি মূলত বোল্ডার ক্লে বা হিমবাহ বাহিত নুড়ি, কাঁকর, কাদা দিয়ে তৈরি হয়।

৮. গ্রাবরেখা (Moraine): হিমবাহ চলার পথে বিভিন্ন আকারের পাথরখণ্ড, নুড়ি, বালি, কাদা প্রভৃতি ক্ষয় করে ও বহন করে নিয়ে যায়। হিমবাহ গলতে শুরু করলে এই বাহিত পদার্থগুলি হিমবাহের তলদেশে, প্রান্তে বা দুপাশে সঞ্চিত হয়। এই সঞ্চিত স্তূপকে গ্রাবরেখা বলে।

৯. বহিঃধৌত সমভূমি (Outwash Plain): হিমবাহ পর্বতের পাদদেশে বা সমভূমিতে নেমে এলে বরফ গলতে শুরু করে। হিমবাহের গলিত জলের স্রোত এবং হিমবাহের মিলিত সঞ্চয়কাজের ফলে প্রান্ত গ্রাবরেখার বাইরে নুড়ি, বালি, কাঁকর ইত্যাদি সঞ্চিত হয়ে যে বিস্তীর্ণ সমভূমি গঠন করে তাকে বহিঃধৌত সমভূমি বলে।

১০. এসকার (Esker): বহিঃধৌত সমভূমিতে হিমবাহ গলিত জলের স্রোতের তলদেশে নুড়ি, বালি, কাঁকর ইত্যাদি সঞ্চিত হয়ে দীর্ঘ, সংকীর্ণ এবং আঁকাবাঁকা শৈলশিরার মতো যে ভূমিরূপ গঠন করে তাকে এসকার বলে।

পর্ব ৩: ৫টি রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৫)

১. হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে সৃষ্ট তিনটি প্রধান ভূমিরূপের বিবরণ দাও।

উত্তর: হিমবাহ প্রধানত উৎপাটন ও অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় ক্ষয়কাজ করে। এর ফলে সৃষ্ট তিনটি প্রধান ভূমিরূপ হলো:

 * করি বা সার্ক: উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে পাহাড়ের গায়ে হাতলবিহীন ডেকচেয়ার বা চামচের গর্তের মতো যে ভূমিরূপ তৈরি হয় তাকে করি বা সার্ক বলে। এর তিনটি অংশ থাকে—খাড়া পশ্চাৎ প্রাচীর, মধ্যভাগের গর্ত এবং সম্মুখভাগের উঁচু ঢিবি।

 * হিমদ্রোণী বা U-আকৃতির উপত্যকা: পার্বত্য উপত্যকা দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হওয়ার সময় অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় উপত্যকার তলদেশ এবং পার্শ্বদেশ ক্ষয় পেয়ে উপত্যকাটি চওড়া ও গভীর হয়ে ইংরেজি 'U' অক্ষরের আকার ধারণ করে। একে হিমদ্রোণী বলে।

 * রসে মতানে: হিমবাহের গতিপথে কোনো কঠিন শিলাস্তূপ অবস্থান করলে অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় শিলাস্তূপের যে দিক দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হয় সেদিকটি মসৃণ ও ঢালু হয়। বিপরীত দিকটি উৎপাটন প্রক্রিয়ায় ফাটলের সৃষ্টি হয়ে এবড়োখেবড়ো ও খাড়া হয়। এই ধরনের ভূমিরূপকে রসে মতানে বলে।

২. হিমবাহের সঞ্চয়কাজের ফলে সৃষ্ট তিনটি প্রধান ভূমিরূপের বিবরণ দাও।

উত্তর: হিমবাহ গলে গেলে তার সাথে থাকা শিলাখণ্ড, নুড়ি, বালি স্তূপাকারে সঞ্চিত হয়ে বিভিন্ন ভূমিরূপ গঠন করে। প্রধান তিনটি ভূমিরূপ হলো:

 * গ্রাবরেখা: হিমবাহ দ্বারা বাহিত পদার্থসমূহ হিমবাহের প্রবাহপথে বা প্রান্তভাগে সঞ্চিত হয়ে যে দীর্ঘ স্তূপ তৈরি করে তাকে গ্রাবরেখা বলে। অবস্থানের ভিত্তিতে এটি পার্শ্ব গ্রাবরেখা, মধ্য গ্রাবরেখা, প্রান্ত গ্রাবরেখা প্রভৃতি ভাগে বিভক্ত।

 * ড্রামলিন: হিমবাহ বাহিত নুড়ি, কাঁকর, বালি, কাদা (বোল্ডার ক্লে) সঞ্চিত হয়ে উল্টানো নৌকা বা অর্ধেক ডিমের মতো যে ভূমিরূপ সৃষ্টি করে তাকে ড্রামলিন বলে। একসাথে অনেক ড্রামলিন থাকলে তাকে ডিমের ঝুড়ির মতো ভূপ্রকৃতি বলা হয়।

 * এসকার: হিমবাহের বরফগলা জলের স্রোতের তলায় বালি, কাঁকর, নুড়ি স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয়ে দীর্ঘ, সংকীর্ণ, আঁকাবাঁকা ও নাতিউচ্চ শৈলশিরার মতো যে ভূমিরূপ তৈরি করে তাকে এসকার বলে।

৩. হিমবাহ ও জলধারার মিলিত সঞ্চয়কার্যের ফলে সৃষ্ট প্রধান ভূমিরূপগুলির বিবরণ দাও।

উত্তর: হিমবাহের প্রান্তভাগে বরফ গলে জলধারার সৃষ্টি হলে হিমবাহ ও জলধারা মিলিতভাবে কাজ করে। এর ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলি হলো:

 * বহিঃধৌত সমভূমি: হিমবাহের প্রান্তভাগের বাইরে হিমবাহ ও বরফগলা জলের স্রোতের দ্বারা বাহিত নুড়ি, বালি, কাঁকর সঞ্চিত হয়ে যে বিস্তীর্ণ সমভূমি গঠিত হয় তাকে বহিঃধৌত সমভূমি বা স্যান্ডার বলে।

 * এসকার: বরফগলা জলের নদীর তলদেশে দীর্ঘ, সংকীর্ণ ও আঁকাবাঁকা শৈলশিরার মতো সঞ্চিত ভূমিরূপই হলো এসকার।

 * কেম: বহিঃধৌত সমভূমিতে বরফগলা জলের দ্বারা বাহিত বালি ও নুড়ি স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয়ে ত্রিকোণাকার বদ্বীপের মতো যে ঢিবি তৈরি করে তাকে কেম বলে।

 * কেটল ও কেটল হ্রদ: বহিঃধৌত সমভূমিতে সঞ্চিত পলির নিচে অনেক সময় বরফের খণ্ড চাপা পড়ে থাকে। পরে সেই বরফ গলে গেলে ওই স্থান বসে গিয়ে যে গর্তের সৃষ্টি হয় তাকে কেটল বলে। কেটলে জল জমলে তাকে কেটল হ্রদ বলে।

৪. নদীর উপত্যকা এবং হিমবাহ উপত্যকার মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করো।

উত্তর: নদী ও হিমবাহ উপত্যকার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:

 * আকৃতি: নদীর ক্ষয়কাজের ফলে নদী উপত্যকা সাধারণত ইংরেজি 'V' অক্ষরের মতো হয় (গিরিখাত)। অন্যদিকে, হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে হিমবাহ উপত্যকা ইংরেজি 'U' অক্ষরের মতো হয় (হিমদ্রোণী)।

 * ক্ষয়ের প্রকৃতি: নদী স্রোতের বেগ বেশি থাকায় নদী পার্শ্বক্ষয়ের থেকে নিম্নক্ষয় বেশি করে। কিন্তু হিমবাহ বিশাল আয়তনের হওয়ায় তলদেশ ও পার্শ্বদেশ সমানভাবে ক্ষয় করে।

 * উপত্যকার প্রশস্ততা: নদী উপত্যকা তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ ও গভীর হয়। অপরদিকে, হিমবাহ উপত্যকা অনেকটা চওড়া বা প্রশস্ত হয়।

 * ভূমিরূপের উপস্থিতি: নদী উপত্যকায় শৃঙ্খলিত শৈলশিরা, মন্তকূপ প্রভৃতি দেখা যায়। হিমবাহ উপত্যকায় ঝুলন্ত উপত্যকা, রসে মতানে ইত্যাদি ভূমিরূপ দেখা যায়।

৫. রসে মতানে ও ড্রামলিনের মধ্যে পার্থক্য লেখো।

উত্তর: রসে মতানে এবং ড্রামলিনের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:

 * সৃষ্টির প্রক্রিয়া: রসে মতানে হলো হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে সৃষ্ট একটি ভূমিরূপ। অন্যদিকে, ড্রামলিন হলো হিমবাহের সঞ্চয়কাজের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ।

 * আকৃতি: রসে মতানে দেখতে অনেকটা ঢিবির মতো যার একদিক মসৃণ এবং অন্যদিক এবড়োখেবড়ো। কিন্তু ড্রামলিন দেখতে উল্টানো নৌকা বা অর্ধেক কাটা ডিমের মতো।

 * ঢালের প্রকৃতি: রসে মতানের যে দিক দিয়ে হিমবাহ আসে সেদিকটি মসৃণ ও মৃদু ঢালযুক্ত এবং বিপরীত দিকটি খাড়া হয়। ড্রামলিনের ক্ষেত্রে হিমবাহ প্রবাহের দিকটি অমসৃণ ও খাড়া এবং বিপরীত দিকটি মসৃণ ও মৃদু ঢালযুক্ত হয়।

 * উপাদান: রসে মতানে কঠিন শিলা দ্বারা গঠিত হয়। ড্রামলিন মূলত হিমবাহ বাহিত নুড়ি, কাঁকর, বালি ও কাদা (বোল্ডার ক্লে) দ্বারা গঠিত হয়।



তৃতীয় অধ্যায়: বহির্জাত প্রক্রিয়া ও তাদের সৃষ্ট ভূমিরূপ – তৃতীয় পর্ব (বায়ুর কাজ)-এর ওপর ভিত্তি করে আপনার চাওয়া ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ১০টি টীকা এবং ৫টি বড় প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো।

পর্ব ১: ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)

১. শুষ্ক ও উষ্ণ মরু অঞ্চলে ক্ষয়কাজের প্রধান শক্তি কী?

উত্তর: বায়ু।

২. মরু অঞ্চলে বায়ুর ক্ষয়কাজের প্রধান তিনটি প্রক্রিয়া কী কী?

উত্তর: অপসারণ, অবঘর্ষ এবং ঘর্ষণ।

৩. বায়ুর অপসারণ প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট গর্তকে কী বলে?

উত্তর: অপসারণ গর্ত বা ব্লো-আউট (Blow-out)।

৪. পৃথিবীর বৃহত্তম অপসারণ গর্ত বা ব্লো-আউটের উদাহরণ দাও।

উত্তর: মিশরের কাতারা (Qattara)।

৫. বায়ুর অবঘর্ষ ক্ষয়ের ফলে ব্যাঙের ছাতার মতো দেখতে ভূমিরূপকে কী বলে?

উত্তর: গৌর (Gour) বা মাশরুম রক।

৬. সাহারা মরুভূমিতে গৌর কী নামে পরিচিত?

উত্তর: গারা (Gara)।

৭. জার্মানিতে গৌর কী নামে পরিচিত?

উত্তর: পিলজফেলসেন (Pilzfelsen)।

৮. কঠিন ও কোমল শিলা অনুভূমিকভাবে বা সমান্তরালভাবে থাকলে বায়ুর ক্ষয়কাজে কোন ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়?

উত্তর: জুইগেন (Zeugen)।

৯. কঠিন ও কোমল শিলা উলম্বভাবে অবস্থান করলে বায়ুর ক্ষয়কাজে কোন ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়?

উত্তর: ইয়ারদাং (Yardang)।

১০. ইয়ারদাং ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে তীক্ষ্ণ আকার ধারণ করলে তাকে কী বলে?

উত্তর: নিডল (Needle)।

১১. মরু অঞ্চলে কঠিন শিলা গঠিত অনুচ্চ, মসৃণ টিলা বা পাহাড়গুলিকে কী বলে?

উত্তর: ইনসেলবার্জ (Inselberg)।

১২. 'ইনসেলবার্জ' কথাটির অর্থ কী?

উত্তর: দ্বীপ পাহাড় (Island mountain)।

১৩. গোলাকার বা গম্বুজ আকৃতির ইনসেলবার্জকে কী বলে?

উত্তর: বর্নহার্ড (Bornhardt)।

১৪. বায়ুর সঞ্চয়কাজের ফলে সৃষ্ট বালির স্তূপকে সাধারণ ভাষায় কী বলে?

উত্তর: বালিয়াড়ি (Sand dune)।

১৫. বায়ুর গতিপথের সমান্তরালে গড়ে ওঠা দীর্ঘ বালিয়াড়িকে কী বলে?

উত্তর: সিফ (Seif) বা অনুদৈর্ঘ্য বালিয়াড়ি।

১৬. 'সিফ' (Seif) শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: তরোয়াল বা সোজা তলোয়ার।

১৭. বায়ুর গতিপথের আড়াআড়িভাবে গড়ে ওঠা অর্ধচন্দ্রাকার বালিয়াড়িকে কী বলে?

উত্তর: বারখান (Barchan) বা তীর্যক বালিয়াড়ি।

১৮. বারখানের কয়টি শিং বা প্রান্ত থাকে?

উত্তর: দুটি।

১৯. একাধিক বারখান পরস্পর যুক্ত হয়ে কোন বালিয়াড়ি গঠন করে?

উত্তর: অ্যাকালে (Akle)।

২০. অতি সূক্ষ্ম হলুদ রঙের বালিকণা বহুদূর বাহিত হয়ে সঞ্চিত হলে তাকে কী বলে?

উত্তর: লোয়েস (Loess)।

২১. পৃথিবীর বৃহত্তম লোয়েস সমভূমি কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: চিনের হোয়াংহো নদীর অববাহিকায়।

২২. শিলাময় মরুভূমি সাহারায় কী নামে পরিচিত?

উত্তর: হামাদা (Hamada)।

২৩. বালি ও শিলাখণ্ড পূর্ণ মরুভূমিকে সাহারায় কী বলে?

উত্তর: রেগ (Reg)।

২৪. বিস্তীর্ণ বালুকাময় মরুভূমিকে সাহারায় কী বলে?

উত্তর: আর্গ (Erg)।

২৫. বায়ু ও জলধারার মিলিত কার্যের ফলে সৃষ্ট শুষ্ক নদীখাতকে কী বলে?

উত্তর: ওয়াদি (Wadi)।

২৬. মরুভূমিতে পর্বতের পাদদেশে সৃষ্ট মৃদু ঢালু সমভূমিকে কী বলে?

উত্তর: পেডিমেন্ট (Pediment)।

২৭. পেডিমেন্ট শব্দটি কে প্রথম ব্যবহার করেন?

উত্তর: ভূতত্ত্ববিদ জি. কে. গিলবার্ট (G. K. Gilbert)।

২৮. পেডিমেন্টের নিচে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পলল ব্যজনী যুক্ত হয়ে যে সমভূমি তৈরি করে তাকে কী বলে?

উত্তর: বাজাদা (Bajada)।

২৯. মরু অঞ্চলের লবণাক্ত জলের হ্রদকে কী বলে?

উত্তর: প্লায়া (Playa)।

৩০. প্লায়া হ্রদকে দক্ষিণ আফ্রিকায় কী বলে?

উত্তর: প্যান (Pan)।

৩১. উত্তর আমেরিকায় প্লায়া কী নামে পরিচিত?

উত্তর: বোলসন (Bolson)।

৩২. সাহারা মরুভূমিতে প্লায়াকে কী বলে?

উত্তর: শটস্ (Chotts)।

৩৩. ভারতের থর মরুভূমিতে চলমান বালিয়াড়িকে কী বলে?

উত্তর: ধ্রিয়ান (Dhrian)।

৩৪. রাজস্থানের শুষ্ক, রুক্ষ ও গাছপালাহীন অঞ্চলকে কী বলে?

উত্তর: মরুস্থলী (অর্থ: মৃতের দেশ)।

৩৫. রাজস্থানের প্লায়া হ্রদগুলিকে স্থানীয় ভাষায় কী বলে?

উত্তর: ধান্দ (Dhand)।

৩৬. 'লোয়েস' শব্দটি কে প্রথম ব্যবহার করেন?

উত্তর: ভন রিচথোফেন (Von Richthofen)।

৩৭. ভারতের কোথায় বারখান বালিয়াড়ি প্রচুর দেখা যায়?

উত্তর: রাজস্থানের থর মরুভূমিতে।

৩৮. সমুদ্র উপকূলে সৃষ্ট বালিয়াড়িকে কী বলে?

উত্তর: উপকূলীয় বালিয়াড়ি।

৩৯. ইনসেলবার্জ বায়ু ও জলধারার ক্ষয়ে আরও ছোট হয়ে গেলে তাকে কী বলে?

উত্তর: ক্যাসেল কপিস (Castle Koppies) বা টরস (Tors)।

৪০. মরুভূমিতে ক্ষয়কার্যের শেষ সীমায় সৃষ্ট সমভূমিকে কী বলে?

উত্তর: সমপ্রায় ভূমি (Peneplain)।

পর্ব ২: ১০টি টীকা (মান - ২ বা ৩)

১. অপসারণ গর্ত (Blow-out): মরু অঞ্চলে প্রবল বেগে বায়ু প্রবাহিত হলে বায়ুর অপসারণ প্রক্রিয়ায় আলগা বালি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে উড়ে যায়। এর ফলে সেখানে যে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়, তাকে অপসারণ গর্ত বা ব্লো-আউট বলে। গর্ত গভীর হয়ে ভৌমজলস্তর ছুঁয়ে ফেললে সেখানে মরূদ্যান সৃষ্টি হতে পারে।

২. গৌর (Gour): মরু অঞ্চলে কোনো বৃহৎ শিলাস্তূপের নিচের অংশ কোমল শিলা এবং উপরের অংশ কঠিন শিলা দিয়ে গঠিত হলে, বায়ুর অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় নিচের কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয় পায়। কিন্তু উপরের কঠিন শিলা কম ক্ষয় পায়। এর ফলে ব্যাঙের ছাতার মতো দেখতে যে ভূমিরূপ তৈরি হয়, তাকে গৌর বা মাশরুম রক বলে।

৩. জুইগেন (Zeugen): মরু অঞ্চলে কঠিন ও কোমল শিলাস্তর পর্যায়ক্রমে অনুভূমিকভাবে (সমান্তরালভাবে) অবস্থান করলে, বায়ুর অবঘর্ষ ক্ষয়ের ফলে কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গর্তের সৃষ্টি করে এবং কঠিন শিলা চ্যাপ্টা মাথা ও খাড়া ঢাল যুক্ত হয়ে টেবিলের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। এই ভূমিরূপকে জুইগেন বলে।

৪. ইয়ারদাং (Yardang): মরু অঞ্চলে কঠিন ও কোমল শিলাস্তর উলম্বভাবে (খাড়াভাবে) পাশাপাশি অবস্থান করলে, বায়ুর ক্ষয়কাজের ফলে কোমল শিলাস্তর দ্রুত ক্ষয় পেয়ে দীর্ঘ খাতের সৃষ্টি করে এবং কঠিন শিলাগুলি মোরগের ঝুঁটির মতো বা করাতের দাঁতের মতো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একে ইয়ারদাং বলে।

৫. ইনসেলবার্জ (Inselberg): মরু বা শুষ্ক অঞ্চলে বায়ুর ক্ষয়কাজের ফলে কোমল শিলাগুলি সম্পূর্ণ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অপসারিত হলেও কঠিন শিলাগুলি ক্ষয় প্রতিরোধ করে অনুচ্চ, মসৃণ ও খাড়া ঢালযুক্ত দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন পাহাড় হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে। এগুলিকে ইনসেলবার্জ বলে।

৬. বারখান (Barchan): বায়ুর সঞ্চয়কাজের ফলে বায়ুর গতিপথের আড়াআড়িভাবে (তীর্যকভাবে) যে অর্ধচন্দ্রাকার বালিয়াড়ি গড়ে ওঠে, তাকে বারখান বলে। এর বায়ুপ্রবাহের দিকটি উত্তল ও মৃদু ঢালযুক্ত এবং বিপরীত দিকটি অবতল ও খাড়া হয়। এর দুপাশে দুটি শিং-এর মতো প্রান্ত থাকে।

৭. সিফ বালিয়াড়ি (Seif Dune): বায়ুপ্রবাহের দিকের সাথে সমান্তরালভাবে গড়ে ওঠা দীর্ঘ, সংকীর্ণ ও শৈলশিরার মতো বালিয়াড়িকে সিফ বা অনুদৈর্ঘ্য বালিয়াড়ি বলে। আরবি শব্দ 'সিফ'-এর অর্থ হলো তরোয়াল। এই বালিয়াড়িগুলি কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ এবং অনেক উঁচু হতে পারে।

৮. লোয়েস সমভূমি (Loess plain): 'লোয়েস' শব্দের অর্থ স্থানচ্যুত বস্তু। মরুভূমি অঞ্চলের অতি সূক্ষ্ম হলুদ রঙের বালিকণা ও ধূলিকণা বাতাসের দ্বারা পরিবাহিত হয়ে বহুদূরে গিয়ে সঞ্চিত হয়ে যে বিস্তীর্ণ সমভূমি গঠন করে, তাকে লোয়েস সমভূমি বলে। চিনের হোয়াংহো অববাহিকায় গোবি মরুভূমি থেকে বালি উড়ে এসে এমন সমভূমি তৈরি করেছে।

৯. ওয়াদি (Wadi): আরবি শব্দ 'ওয়াদি'র অর্থ শুষ্ক উপত্যকা। মরুভূমিতে হঠাৎ বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট ক্ষণস্থায়ী জলধারা এবং বায়ুর মিলিত ক্ষয়কাজের ফলে যে শুষ্ক ও চওড়া নদীখাত তৈরি হয়, তাকে ওয়াদি বলে। বর্ষাকাল ছাড়া বছরের অন্যান্য সময় এটি শুষ্ক থাকে।

১০. পেডিমেন্ট (Pediment): মরু অঞ্চলে বায়ু ও জলধারার মিলিত কার্যের ফলে পর্বতের পাদদেশে যে মৃদু ঢালু, প্রস্তরময় সমভূমি গড়ে ওঠে তাকে পেডিমেন্ট বলে। এটি ইনসেলবার্জ ও বাজাদার মধ্যবর্তী অংশে অবস্থান করে।

পর্ব ৩: ৫টি রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৫)

১. বায়ুর ক্ষয়কাজের ফলে সৃষ্ট তিনটি প্রধান ভূমিরূপের সচিত্র বিবরণ দাও।

উত্তর: মরু অঞ্চলে বায়ু প্রধানত অবঘর্ষ ও অপসারণ প্রক্রিয়ায় ক্ষয়কাজ করে। এর ফলে সৃষ্ট তিনটি প্রধান ভূমিরূপ হলো:

 * গৌর বা মাশরুম রক: শিলাস্তূপের নিচে কোমল এবং উপরে কঠিন শিলা থাকলে, বায়ুর সঙ্গে পরিবাহিত বালুকণার আঘাতে (অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায়) নিচের কোমল শিলা বেশি ক্ষয় পায়। ফলে ব্যাঙের ছাতার মতো যে ভূমিরূপ তৈরি হয় তাকে গৌর বলে।

 * জুইগেন: অনুভূমিকভাবে কঠিন ও কোমল শিলাস্তর অবস্থান করলে ফাটল দিয়ে বায়ু প্রবেশ করে কোমল শিলাকে দ্রুত ক্ষয় করে। ফলে কঠিন শিলাগুলি টেবিলের মতো চ্যাপ্টা মাথা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একে জুইগেন বলে।

 * ইয়ারদাং: কঠিন ও কোমল শিলা উলম্বভাবে অবস্থান করলে কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয় পেয়ে দীর্ঘ খাতের সৃষ্টি করে। মাঝখানের কঠিন শিলাগুলি মোরগের ঝুঁটির মতো তীক্ষ্ণ ও খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, একে ইয়ারদাং বলে। (পরীক্ষার খাতায় প্রতিটি ভূমিরূপের পাশে পেনসিল দিয়ে পরিষ্কার চিত্র আঁকা বাধ্যতামূলক)।

২. বায়ুর সঞ্চয়কাজের ফলে সৃষ্ট প্রধান তিনটি ভূমিরূপের বিবরণ দাও।

উত্তর: মরু অঞ্চলে বায়ুর গতিপথে কোনো বাধা (যেমন- ঝোপঝাড়, পাথর) থাকলে বায়ুর বেগ কমে যায় এবং বাহিত বালি সঞ্চিত হয়ে নিম্নলিখিত ভূমিরূপগুলি গঠন করে:

 * বারখান: বায়ুর গতিপথের আড়াআড়িভাবে যে অর্ধচন্দ্রাকার বালির স্তূপ তৈরি হয় তাকে বারখান বলে। এর বায়ুপ্রবাহের দিকের ঢাল মৃদু এবং বিপরীত দিকের ঢাল খাড়া হয়। এর দুদিকে দুটি শিং বা প্রান্ত প্রসারিত থাকে।

 * সিফ বালিয়াড়ি: বায়ুর গতিপথের সমান্তরালে গড়ে ওঠা দীর্ঘ, সংকীর্ণ এবং তরোয়ালের মতো বালিয়াড়িকে সিফ বালিয়াড়ি বলে। দুটি সিফ বালিয়াড়ির মাঝখানের করিডোরকে সাহারায় 'গাসি' বলে।

 * লোয়েস: মরুভূমির সূক্ষ্ম বালিকণা বায়ুর দ্বারা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে পরিবাহিত হয়ে সঞ্চিত হলে তাকে লোয়েস বলে। গোবি মরুভূমির বালি উড়ে গিয়ে চিনের হোয়াংহো উপত্যকায় পৃথিবীর বৃহত্তম লোয়েস সমভূমি তৈরি করেছে।

৩. বায়ু ও জলধারার মিলিত কার্যের ফলে সৃষ্ট তিনটি ভূমিরূপের বিবরণ দাও।

উত্তর: মরু ও আধা-মরু অঞ্চলে বায়ু ও ক্ষণস্থায়ী বৃষ্টির জলধারার মিলিত কার্যের ফলে মূলত ক্ষয় ও সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ গড়ে ওঠে। যেমন:

 * ওয়াদি: মরুভূমিতে হঠাৎ বৃষ্টির ফলে জলধারার সৃষ্টি হয়, যা বায়ুর ক্ষয় করা উপত্যকাকে আরও চওড়া ও গভীর করে। বৃষ্টি থেমে গেলে এই নদীখাত শুকিয়ে যায়। এই শুষ্ক উপত্যকাকে ওয়াদি বলে।

 * পেডিমেন্ট: মরুভূমি অঞ্চলে পর্বতের পাদদেশে বায়ু ও জলধারার মিলিত ক্ষয়কাজের ফলে যে মৃদু ঢালু, ইষৎ অবতল ও প্রস্তরময় সমভূমি গঠিত হয়, তাকে পেডিমেন্ট বলে।

 * বাজাদা: পেডিমেন্টের নিচে বা সমভূমিতে জলধারার সাথে বাহিত নুড়ি, বালি, কাঁকর সঞ্চিত হয়ে অর্ধগোলাকার হাতপাখার মতো পলল ব্যজনী গঠন করে। একাধিক পলল ব্যজনী জুড়ে গিয়ে যে বিস্তীর্ণ সমভূমি গঠন করে তাকে বাজাদা বলে।

৪. জুইগেন ও ইয়ারদাং-এর মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করো।

উত্তর: বায়ুর অবঘর্ষ ক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট জুইগেন ও ইয়ারদাং-এর মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:

 * শিলার অবস্থান: জুইগেন গঠনের ক্ষেত্রে কঠিন ও কোমল শিলাস্তর অনুভূমিক বা সমান্তরালভাবে অবস্থান করে। অন্যদিকে, ইয়ারদাং গঠনের ক্ষেত্রে কঠিন ও কোমল শিলাস্তর উলম্ব বা খাড়াভাবে অবস্থান করে।

 * আকৃতি: জুইগেনের মাথা চ্যাপ্টা ও টেবিলের মতো হয়। কিন্তু ইয়ারদাং-এর মাথা তীক্ষ্ণ, মোরগের ঝুঁটি বা করাতের দাঁতের মতো হয়।

 * উচ্চতা: জুইগেন সাধারণত উচ্চতায় কম হয় (২ থেকে ৪০ মিটার)। ইয়ারদাং তুলনামূলকভাবে কম চওড়া কিন্তু তীক্ষ্ণ হয়।

 * স্থায়িত্ব: জুইগেনের উপর কঠিন শিলার আবরণ থাকায় এটি ধীরে ধীরে ক্ষয় পায়। কিন্তু ইয়ারদাং-এর পার্শ্বদেশে কোমল শিলা থাকায় তা দ্রুত ক্ষয় পায়।

৫. বারখান ও সিফ বালিয়াড়ির মধ্যে পার্থক্য লেখো।

উত্তর: বারখান এবং সিফ উভয়ই বালিয়াড়ি হলেও এদের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে:

 * বায়ুপ্রবাহের দিক: বারখান বায়ুর গতিপথের আড়াআড়িভাবে (Transverse) গড়ে ওঠে। অন্যদিকে, সিফ বালিয়াড়ি বায়ুর গতিপথের সমান্তরালে (Longitudinal) গড়ে ওঠে।

 * আকৃতি: বারখান দেখতে অর্ধচন্দ্রাকার (Half-moon shaped) হয়। সিফ বালিয়াড়ি দেখতে দীর্ঘ তরোয়াল বা শৈলশিরার মতো হয়।

 * শিং-এর উপস্থিতি: বারখানের দুই প্রান্তে দুটি শিং-এর মতো অংশ বায়ুর প্রবাহের দিকে প্রসারিত থাকে। সিফ বালিয়াড়িতে এই ধরনের কোনো শিং থাকে না।

 * দৈর্ঘ্য ও বিস্তার: বারখান সাধারণত খুব বেশি দীর্ঘ হয় না। কিন্তু সিফ বালিয়াড়ি কয়েক কিলোমিটার থেকে কয়েকশো কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।




চতুর্থ অধ্যায়: বায়ুমণ্ডল-এর ওপর ভিত্তি করে আপনার চাওয়া ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ১০টি টীকা এবং ৫টি বড় প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো। (এই অংশে বায়ুমণ্ডলের উপাদান, স্তরবিন্যাস, উষ্ণতা, চাপবলয়, বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা ও অধঃক্ষেপণ সবকিছু কভার করা হয়েছে)।

পর্ব ১: ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)

১. বায়ুমণ্ডলে কোন গ্যাসের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি?

উত্তর: নাইট্রোজেন (৭৮.০৮%)।

২. বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ কত?

উত্তর: ২০.৯৪% (প্রায় ২১%)।

৩. বায়ুমণ্ডলের কোন স্তরকে 'ক্ষুব্ধমণ্ডল' বলা হয়?

উত্তর: ট্রপোস্ফিয়ারকে (আবহাওয়ার সব গোলযোগ এখানে হয় বলে)।

৪. বায়ুমণ্ডলের কোন স্তরকে 'শান্তমণ্ডল' বলা হয়?

উত্তর: স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারকে (এখানে মেঘ, ঝড়-বৃষ্টি থাকে না বলে)।

৫. ওজোন স্তর (Ozone Layer) বায়ুমণ্ডলের কোন স্তরে অবস্থিত?

উত্তর: স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে।

৬. ওজোন গ্যাসের ঘনত্ব পরিমাপ করার এককের নাম কী?

উত্তর: ডবসন (Dobson/ DU)।

৭. বায়ুমণ্ডলের শীতলতম স্তর কোনটি?

উত্তর: মেসোস্ফিয়ার (উষ্ণতা প্রায় -১০০°C)।

৮. মেরুজ্যোতি (Aurora) বায়ুমণ্ডলের কোন স্তরে দেখা যায়?

উত্তর: আয়নোস্ফিয়ার বা থার্মোস্ফিয়ারে।

৯. বেতার তরঙ্গ বায়ুমণ্ডলের কোন স্তর থেকে প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে?

উত্তর: আয়নোস্ফিয়ার।

১০. কৃত্রিম উপগ্রহ ও মহাকাশ স্টেশন বায়ুমণ্ডলের কোন স্তরে অবস্থান করে?

উত্তর: এক্সোস্ফিয়ারে।

১১. স্বাভাবিক উষ্ণতা হ্রাসের হার (Normal Lapse Rate) কত?

উত্তর: প্রতি ১০০০ মিটার (১ কিমি) উচ্চতা বৃদ্ধিতে ৬.৪°C হারে তাপমাত্রা হ্রাস পায়।

১২. উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে উষ্ণতা হ্রাস না পেয়ে বৃদ্ধি পেলে তাকে কী বলে?

উত্তর: বৈপরিত্য উত্তাপ (Inversion of temperature)।

১৩. পৃথিবীর অ্যালবেডো (Albedo)-র পরিমাণ কত?

উত্তর: প্রায় ৩৪%।

১৪. সমমান উষ্ণতাযুক্ত স্থানগুলিকে মানচিত্রে যে রেখা দ্বারা যুক্ত করা হয় তাকে কী বলে?

উত্তর: সমোষ্ণ রেখা (Isotherm)।

১৫. বায়ুর চাপ মাপার যন্ত্রের নাম কী?

উত্তর: ব্যারোমিটার।

১৬. বায়ুর চাপ মাপার একক কী?

উত্তর: মিলিবার (mb)।

১৭. সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রমাণ বায়ুর চাপ কত?

উত্তর: ১০১৩.২৫ মিলিবার।

১৮. পৃথিবীতে মোট কয়টি বায়ুচাপ বলয় আছে?

উত্তর: ৭টি।

১৯. নিরক্ষীয় শান্তবলয় বা ডোলড্রামস (Doldrums) কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ে (৫° উঃ থেকে ৫° দঃ অক্ষাংশের মধ্যে)।

২০. 'অশ্ব অক্ষাংশ' (Horse Latitude) কোন বায়ুচাপ বলয়ে অবস্থিত?

উত্তর: কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয়ে (২৫° থেকে ৩৫° অক্ষাংশে)।

২১. কোরিওলিস বলের প্রভাবে বায়ু উত্তর গোলার্ধে কোন দিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়?

উত্তর: ডানদিকে (ফেরেলের সূত্র অনুযায়ী)।

২২. দক্ষিণ গোলার্ধে ৪০° অক্ষাংশে প্রবল বেগে প্রবাহিত পশ্চিমা বায়ুকে কী বলে?

উত্তর: গর্জনশীল চল্লিশা (Roaring Forties)।

২৩. 'চিনুক' (Chinook) শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: তুষারভক্ষক (Snow eater)।

২৪. রকি পর্বতের পূর্ব ঢালে প্রবাহিত উষ্ণ স্থানীয় বায়ুর নাম কী?

উত্তর: চিনুক।

২৫. ভারতের উত্তর-পশ্চিম অংশে গ্রীষ্মকালে প্রবাহিত উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ুর নাম কী?

উত্তর: লু (Loo)।

২৬. কোন বায়ুকে 'বাণিজ্য বায়ু' (Trade wind) বলা হয়?

উত্তর: আয়ন বায়ুকে।

২৭. পৃথিবীর অধিকাংশ উষ্ণ মরুভূমি মহাদেশের কোন দিকে সৃষ্টি হয়েছে?

উত্তর: পশ্চিম দিকে (আয়ন বায়ুর গতিপথে)।

২৮. সমুদ্রবায়ু (Sea breeze) দিনের কোন সময়ে তীব্র হয়?

উত্তর: বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে (দিনের বেলা প্রবাহিত হয়)।

২৯. স্থলবায়ু (Land breeze) কখন প্রবাহিত হয়?

উত্তর: রাতের বেলা (ভোরের দিকে তীব্র হয়)।

৩০. দিনের বেলা পার্বত্য উপত্যকার উষ্ণ বায়ু পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠলে তাকে কী বলে?

উত্তর: অ্যানাবেটিক বায়ু (Anabatic wind)।

৩১. রাতের বেলা পাহাড়ের চূড়ার শীতল ও ভারী বায়ু ঢাল বেয়ে নিচে নামলে তাকে কী বলে?

উত্তর: ক্যাটাবেটিক বায়ু (Katabatic wind)।

৩২. বায়ুর আর্দ্রতা পরিমাপ করার যন্ত্রের নাম কী?

উত্তর: হাইগ্রোমিটার (Hygrometer)।

৩৩. আপেক্ষিক আর্দ্রতা (Relative Humidity) কোন এককে প্রকাশ করা হয়?

উত্তর: শতকরা (%) ভাগে।

৩৪. নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রতিদিন বিকেলে যে বৃষ্টিপাত হয়, তাকে কী বলে?

উত্তর: পরিচলন বৃষ্টিপাত (4 O'clock rain)।

৩৫. পর্বতে বাধা পেয়ে যে বৃষ্টিপাত হয়, তাকে কী বলে?

উত্তর: শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত (Orographic rainfall)।

৩৬. পর্বতের যে ঢালে বৃষ্টিপাত প্রায় হয় না, তাকে কী বলে?

উত্তর: বৃষ্টির ছায়া অঞ্চল (Rain shadow area)। (যেমন- শিলং)।

৩৭. ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রে সর্বনিম্ন চাপযুক্ত অঞ্চলকে কী বলে?

উত্তর: ঘূর্ণবাতের চক্ষু (Eye of cyclone)।

৩৮. ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত ক্যারিবিয়ান সাগরে কী নামে পরিচিত?

উত্তর: হারিকেন (Hurricane)।

৩৯. ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত চীন সাগরে কী নামে পরিচিত?

উত্তর: টাইফুন (Typhoon)।

৪০. বৃষ্টিপাত মাপার যন্ত্রের নাম কী?

উত্তর: রেইনগেজ (Rain gauge)।

পর্ব ২: ১০টি টীকা (মান - ২ বা ৩)

১. অ্যালবেডো (Albedo): সূর্য থেকে আগত সৌরকিরণের (১০০% ধরলে) প্রায় ৩৪% অংশ মেঘপুঞ্জ, ধূলিকণা এবং ভূপৃষ্ঠ দ্বারা প্রতিফলিত ও বিচ্ছুরিত হয়ে বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত না করেই মহাশূন্যে ফিরে যায়। পৃথিবীর তাপীয় ভারসাম্য বজায় রাখা এই ৩৪% সূর্যরশ্মিকে পৃথিবীর অ্যালবেডো বলে।

২. বৈপরিত্য উত্তাপ (Inversion of Temperature): সাধারণ নিয়মে ট্রপোস্ফিয়ারে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে উষ্ণতা হ্রাস পায়। কিন্তু কখনো কখনো পার্বত্য উপত্যকায় বা শীতকালের শান্ত রাতে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে উষ্ণতা হ্রাস না পেয়ে বৃদ্ধি পায়। এই ঘটনাকে বৈপরিত্য উত্তাপ বলে।

৩. কোরিওলিস বল (Coriolis Force): পৃথিবীর আবর্তনের কারণে ভূপৃষ্ঠের উপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু, সমুদ্রস্রোত ইত্যাদি সোজাপথে না গিয়ে কিছুটা দিকবিক্ষেপ ঘটিয়ে প্রবাহিত হয়। যে শক্তির প্রভাবে এই দিকবিক্ষেপ ঘটে, ফরাসি বিজ্ঞানী গ্যাসপার্ড গুস্তাভ কোরিওলিসের নামানুসারে তাকে কোরিওলিস বল বলে।

৪. ফেরেলের সূত্র (Ferrel's Law): কোরিওলিস বলের প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ সোজাপথে প্রবাহিত না হয়ে উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাঁদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়। মার্কিন বিজ্ঞানী উইলিয়াম ফেরেল বায়ুর দিকবিক্ষেপের এই সূত্রটি আবিষ্কার করেন বলে একে ফেরেলের সূত্র বলে।

৫. অশ্ব অক্ষাংশ (Horse Latitude): উভয় গোলার্ধে ২৫° থেকে ৩৫° অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থিত কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয়ে বায়ু নিম্নগামী হওয়ায় ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে কোনো বায়ুপ্রবাহ থাকে না। প্রাচীনকালে পালতোলা জাহাজে করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ঘোড়া আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার সময় জাহাজ এই শান্তবলয়ে আটকে পড়লে নাবিকরা পানীয় জলের অভাবে এবং জাহাজ হালকা করতে কিছু ঘোড়া সমুদ্রে ফেলে দিত। তাই এই অঞ্চলকে অশ্ব অক্ষাংশ বলে।

৬. ডোলড্রামস (Doldrums): নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ে (৫°উঃ-৫°দঃ) সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ায় বায়ু উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে সোজা উপরের দিকে উঠে যায়। ফলে ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে কোনো বায়ুপ্রবাহ অনুভুত হয় না এবং সর্বদা শান্ত আবহাওয়া বিরাজ করে। নাবিকরা এই অঞ্চলের নাম দিয়েছিলেন ডোলড্রামস (অর্থ: শান্তাবস্থা)।

৭. গর্জনশীল চল্লিশা (Roaring Forties): দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগের পরিমাণ বেশি থাকায় পশ্চিমা বায়ু বিনা বাধায় প্রচণ্ড বেগে প্রবাহিত হয়। ৪০° দক্ষিণ অক্ষাংশে এই বায়ুর প্রবল বেগ ও ভয়ংকর গর্জন দেখে নাবিকরা এর নাম দিয়েছেন গর্জনশীল চল্লিশা।

৮. স্থানীয় বায়ু (Local Wind): কোনো একটি নির্দিষ্ট ছোট অঞ্চলে সেখানকার ভূপ্রকৃতি এবং স্থানীয় উত্তাপ ও চাপের পার্থক্যের কারণে যে বায়ু প্রবাহিত হয় তাকে স্থানীয় বায়ু বলে। যেমন— ভারতের 'লু', উত্তর আমেরিকার 'চিনুক', ইউরোপের 'ফন' ইত্যাদি।

৯. বৃষ্টির ছায়া অঞ্চল (Rain shadow Area): জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু পর্বতের প্রতিবাদ ঢালে বাধা পেয়ে প্রচুর শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ঘটায়। এরপর বায়ু পর্বত অতিক্রম করে অনুবাত ঢালে পৌঁছালে তাতে জলীয় বাষ্প প্রায় থাকে না এবং বায়ু নিচের দিকে নামায় উষ্ণতা বাড়ে। ফলে অনুবাত ঢালে বৃষ্টিপাত প্রায় হয় না। এই বৃষ্টিহীন অনুবাত ঢালকে বৃষ্টির ছায়া অঞ্চল বলে (যেমন- শিলং)।

১০. আপেক্ষিক আর্দ্রতা (Relative Humidity): কোনো নির্দিষ্ট উষ্ণতায় নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে যে পরিমাণ জলীয় বাষ্প আছে এবং ওই একই উষ্ণতায় ওই বায়ুকে সম্পৃক্ত করতে যে পরিমাণ জলীয় বাষ্পের প্রয়োজন—এই দুয়ের অনুপাতকে শতকরা ভাগে প্রকাশ করলে তাকে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বলে।

পর্ব ৩: ৫টি রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৫)

১. উষ্ণতার তারতম্য অনুযায়ী বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস করো এবং ট্রপোস্ফিয়ার ও স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।

উত্তর: উষ্ণতার তারতম্যের ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলকে প্রধান ছয়টি স্তরে ভাগ করা যায়: ১. ট্রপোস্ফিয়ার, ২. স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার, ৩. মেসোস্ফিয়ার, ৪. থার্মোস্ফিয়ার (আয়নোস্ফিয়ার), ৫. এক্সোস্ফিয়ার এবং ৬. ম্যাগনেটোস্ফিয়ার।

 * ট্রপোস্ফিয়ার (Troposphere): ভূপৃষ্ঠ থেকে ঊর্ধ্বাকাশে নিরক্ষীয় অঞ্চলে ১৮ কিমি এবং মেরু অঞ্চলে ৮ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত বায়ুমণ্ডলের সর্বনিম্ন স্তরটি হলো ট্রপোস্ফিয়ার।

   * বৈশিষ্ট্য: ১) এই স্তরে ধূলিকণা ও জলীয় বাষ্প থাকায় মেঘ, ঝড়, বৃষ্টি প্রভৃতি আবহাওয়ার যাবতীয় গোলযোগ দেখা যায়, তাই একে ক্ষুব্ধমণ্ডল বলে। ২) এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে উষ্ণতা হ্রাস পায় (প্রতি ১ কিমিতে ৬.৪°C)।

 * স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার (Stratosphere): ট্রপোপজের ওপর থেকে ৫০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত স্তরটি হলো স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার।

   * বৈশিষ্ট্য: ১) এখানে ধূলিকণা বা জলীয় বাষ্প না থাকায় মেঘ বা ঝড়-বৃষ্টি হয় না, তাই একে শান্তমণ্ডল বলে। জেট বিমানগুলি এই স্তরের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করে। ২) এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে উষ্ণতা বাড়তে থাকে। ৩) এই স্তরের ১৫-৩০ কিমি উচ্চতায় ওজোন গ্যাসের স্তর থাকে, যা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে পৃথিবীকে রক্ষা করে।

২. পৃথিবীতে বায়ুর তাপমাত্রার তারতম্যের প্রধান কারণগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: ভূপৃষ্ঠের সব জায়গায় বায়ুর তাপমাত্রা সমান থাকে না। তাপমাত্রার তারতম্যের প্রধান কারণগুলি হলো:

 * অক্ষাংশ: নিরক্ষরেখায় সূর্যরশ্মি সারা বছর লম্বভাবে পড়ে, তাই সেখানে উষ্ণতা বেশি। নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে সূর্যরশ্মি ক্রমশ তির্যকভাবে পড়ে, ফলে উষ্ণতা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে।

 * উচ্চতা: ভূপৃষ্ঠ থেকে যত ওপরের দিকে ওঠা যায়, ট্রপোস্ফিয়ারে প্রতি ১০০০ মিটারে ৬.৪°C হারে উষ্ণতা কমতে থাকে। তাই নিরক্ষীয় অঞ্চলে অবস্থিত হলেও কিলিমাঞ্জারো পর্বতের চূড়ায় বরফ জমে থাকে।

 * সমুদ্র থেকে দূরত্ব: জলের আপেক্ষিক তাপ বেশি হওয়ায় জলভাগ স্থলভাগের চেয়ে দেরিতে গরম ও দেরিতে ঠান্ডা হয়। তাই সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে সমভাবাপন্ন জলবায়ু (যেমন- মুম্বাই) এবং সমুদ্র থেকে দূরে মহাদেশের অভ্যন্তরে চরমভাবাপন্ন জলবায়ু (যেমন- দিল্লি) দেখা যায়।

 * সমুদ্রস্রোত: উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের প্রভাবে উপকূলবর্তী অঞ্চলের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায় এবং শীতল স্রোতের প্রভাবে উষ্ণতা হ্রাস পায়।

 * বায়ুপ্রবাহ ও ভূমির ঢাল: উষ্ণ বায়ু প্রবাহিত হলে (যেমন লু) উষ্ণতা বাড়ে, শীতল বায়ু উষ্ণতা কমায়। আবার, পর্বতের যে ঢালে সূর্যকিরণ লম্বভাবে পড়ে সেখানে উষ্ণতা বেশি হয় (যেমন হিমালয়ের দক্ষিণ ঢাল)।

৩. পৃথিবীর প্রধান বায়ুচাপ বলয়গুলির নাম লেখো এবং নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় ও ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় সৃষ্টির কারণ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: পৃথিবীতে মোট ৭টি স্থায়ী বায়ুচাপ বলয় রয়েছে। ১টি নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়, ২টি ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয়, ২টি উপমেরু নিম্নচাপ বলয় এবং ২টি মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয়।

 * নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় সৃষ্টির কারণ (৫°উঃ-৫°দঃ):

   ১. সারা বছর সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ায় এখানকার বায়ু উষ্ণ ও হালকা হয়ে প্রসারিত হয় এবং উপরের দিকে উঠে যায়।

   ২. এই অঞ্চলে জলভাগের পরিমাণ বেশি হওয়ায় বায়ুতে জলীয় বাষ্প বেশি থাকে। জলীয় বাষ্প সাধারণ বায়ুর চেয়ে হালকা হওয়ায় নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়।

   ৩. পৃথিবীর আবর্তন বেগ নিরক্ষীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি থাকায় এখানকার বায়ু ছিটকে ক্রান্তীয় অঞ্চলের দিকে চলে যায়।

 * কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় সৃষ্টির কারণ (২৫°-৩৫° অক্ষাংশে):

   ১. নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে উষ্ণ বায়ু উপরে উঠে শীতল ও ভারী হয়ে পৃথিবীর আবর্তনের কারণে বিক্ষিপ্ত হয়ে কর্কটীয় ও মকরীয় অঞ্চলে নেমে আসে।

   ২. মেরু অঞ্চল থেকে আসা শীতল ও ভারী বায়ুও এই ক্রান্তীয় অঞ্চলে এসে পৌঁছায়। উভয় বায়ুর মিলনে এই অঞ্চলে বায়ুর পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ও উচ্চচাপের সৃষ্টি হয়।

৪. নিয়ত বায়ুপ্রবাহ কাকে বলে? বিভিন্ন প্রকার নিয়ত বায়ুপ্রবাহের বিবরণ দাও।

উত্তর: ভূপৃষ্ঠের উচ্চচাপ বলয়গুলি থেকে নিম্নচাপ বলয়গুলির দিকে সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে নিয়ত বায়ু বলে। নিয়ত বায়ু তিন প্রকার:

 * আয়ন বায়ু (Trade Wind): কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে সারা বছর প্রবাহিত বায়ুকে আয়ন বায়ু বলে। ফেরেলের সূত্র অনুসারে এটি উত্তর গোলার্ধে উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু নামে প্রবাহিত হয়। প্রাচীনকালে পালতোলা জাহাজ এই বায়ুর সাহায্যে নির্দিষ্ট পথে যাতায়াত করত বলে একে বাণিজ্য বায়ুও বলে।

 * পশ্চিমা বায়ু (Westerlies): ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় (কর্কটীয় ও মকরীয়) থেকে উপমেরু নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত বায়ুকে পশ্চিমা বায়ু বলে। এটি উত্তর গোলার্ধে দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু নামে প্রবাহিত হয়।

 * মেরু বায়ু (Polar Wind): দুই মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে উপমেরু নিম্নচাপ বলয়ের দিকে যে অত্যন্ত শীতল ও শুষ্ক বায়ু প্রবাহিত হয় তাকে মেরু বায়ু বলে। এটি উত্তর গোলার্ধে উত্তর-পূর্ব মেরু বায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ-পূর্ব মেরু বায়ু নামে বয়।

৫. বৃষ্টিপাত কয় প্রকার? চিত্র-সহ শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত কীভাবে সংঘটিত হয় তা আলোচনা করো।

উত্তর: বৃষ্টিপাত সৃষ্টির প্রক্রিয়া অনুযায়ী বৃষ্টিপাতকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: ১. পরিচলন বৃষ্টিপাত, ২. শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত এবং ৩. ঘূর্ণবাতজনিত বৃষ্টিপাত।

 * শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত (Orographic Rainfall): 'শৈল' কথার অর্থ পর্বত এবং 'উৎক্ষেপ' কথার অর্থ উপরে ওঠা। জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু পর্বতে বাধা পেয়ে উপরে উঠে যে বৃষ্টিপাত ঘটায় তাকে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত বলে।

   * প্রক্রিয়া: সমুদ্রের দিক থেকে আসা উষ্ণ ও আর্দ্র জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু ভূপৃষ্ঠের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় তার গতিপথে কোনো পর্বত বা উচ্চভূমি আড়াআড়িভাবে অবস্থান করলে, বায়ু তাতে বাধা পেয়ে পর্বতের ঢাল (প্রতিবাদ ঢাল) বেয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে। উঁচুতে বায়ুর চাপ কম থাকায় বায়ু প্রসারিত হয় এবং শীতল হতে থাকে। একসময় বায়ু সম্পৃক্ত হয় এবং জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ সৃষ্টি করে পর্বতের ওই প্রতিবাদ ঢালেই প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।

   * বৃষ্টির ছায়া অঞ্চল: বৃষ্টিপাত ঘটানোর পর বায়ু যখন পর্বত অতিক্রম করে বিপরীত ঢালে (অনুবাত ঢাল) পৌঁছায়, তখন তাতে জলীয় বাষ্প প্রায় থাকে না। উপরন্তু বায়ু নিচে নামার ফলে উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়। ফলে অনুবাত ঢালে বৃষ্টিপাত প্রায় হয় না বললেই চলে। একে বৃষ্টির ছায়া অঞ্চল বলে।

   * উদাহরণ: দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু খাসি পাহাড়ে বাধা পেয়ে চেরাপুঞ্জিতে (প্রতিবাদ ঢাল) প্রচুর বৃষ্টি ঘটায়, কিন্তু সামান্য দূরে অবস্থিত শিলং (অনুবাত ঢাল) বৃষ্টির ছায়া অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। (পরীক্ষায় পর্বতের দুই ঢাল, বায়ুপ্রবাহ এবং মেঘ-বৃষ্টির একটি সুন্দর রেখাচিত্র আঁকতে হবে)।




সূচিপত্রের ৫ নম্বর টপিকটি হলো বায়ুমণ্ডল – দ্বিতীয় পর্ব। আগের অধ্যায়ে (৪র্থ পর্বে) আমরা বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস, উষ্ণতা এবং বায়ুচাপ বলয় নিয়ে আলোচনা করেছি। এই ৫ম পর্বে বায়ুমণ্ডলের মেঘ, বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণবাত, প্রতীপ ঘূর্ণবাত, এল নিনো, লা নিনা, জেট স্ট্রিম এবং বায়ুর আর্দ্রতা থেকে নতুন ৪০টি শর্ট প্রশ্ন, ১০টি টীকা ও ৫টি বড় প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়া হলো।

পর্ব ১: ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)

১. বায়ুর গতিবেগ মাপার যন্ত্রের নাম কী?

উত্তর: অ্যানিমোমিটার (Anemometer)।

২. বায়ুপ্রবাহের দিক নির্ণয় করার যন্ত্রের নাম কী?

উত্তর: বাতপতাকা (Wind Vane)।

৩. বায়ুর আর্দ্রতা মাপার যন্ত্রের নাম কী?

উত্তর: হাইগ্রোমিটার (Hygrometer)।

৪. মেঘের পরিমাপ বা মেঘাচ্ছন্নতা কোন এককে মাপা হয়?

উত্তর: ওকটা (Okta)।

৫. নিরপেক্ষ আর্দ্রতা (Absolute Humidity) কোন এককে প্রকাশ করা হয়?

উত্তর: গ্রাম প্রতি ঘনমিটার (gm/m³)।

৬. যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বায়ু জলীয় বাষ্প দ্বারা সম্পৃক্ত হয়, তাকে কী বলে?

উত্তর: শিশিরাঙ্ক (Dew point)।

৭. 'ITCZ'-এর পুরো কথা কী?

উত্তর: Inter Tropical Convergence Zone (আন্তঃক্রান্তীয় সম্মিলন অঞ্চল)।

৮. 'এল নিনো' (El Nino) শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: ছোট্ট ছেলে বা শিশুকৃষ্ণ (Christ child)।

৯. 'লা নিনা' (La Nina) শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: ছোট্ট মেয়ে (Little girl)।

১০. এল নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূলে (পেরু উপকূলে) কী সৃষ্টি হয়?

উত্তর: প্রবল বৃষ্টিপাত ও বন্যা।

১১. এল নিনোর প্রভাবে ভারতে কী অবস্থার সৃষ্টি হয়?

উত্তর: অনাবৃষ্টি বা খরা।

১২. উচ্চ ট্রপোস্ফিয়ারে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবল বেগে প্রবাহিত সর্পিলাকার বায়ুকে কী বলে?

উত্তর: জেট বায়ু (Jet stream)।

১৩. জেট বায়ু প্রধানত বায়ুমণ্ডলের কোন স্তরে প্রবাহিত হয়?

উত্তর: ট্রপোস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বস্তরে (ট্রপোপজের ঠিক নিচে)।

১৪. মৌসুমি বায়ু (Monsoon) শব্দটি কোন ভাষার শব্দ থেকে এসেছে?

উত্তর: আরবি শব্দ 'মৌসিম' (Mausim) থেকে, যার অর্থ ঋতু।

১৫. গিনি উপকূলে প্রবাহিত 'হারমাটান' (Harmattan) বায়ুকে কী বলা হয়?

উত্তর: ডাক্তার বায়ু (Doctor Wind)।

১৬. সাহারা মরুভূমি থেকে ইতালির দিকে প্রবাহিত উষ্ণ ও ধূলিপূর্ণ বায়ুকে কী বলে?

উত্তর: সিরোক্কো (Sirocco)।

১৭. মিশরে প্রবাহিত উষ্ণ ও শুষ্ক স্থানীয় বায়ুর নাম কী?

উত্তর: খামসিন (Khamsin)।

১৮. ফ্রান্সের রোন উপত্যকায় প্রবাহিত শীতল স্থানীয় বায়ুকে কী বলে?

উত্তর: মিস্ট্রাল (Mistral)।

১৯. আড্রিয়াটিক সাগরের উপকূলে প্রবাহিত শীতল বায়ুকে কী বলে?

উত্তর: বোরা (Bora)।

২০. বায়ুমণ্ডলের ত্রিকোষীয় মডেলের প্রবক্তা কে?

উত্তর: বিজ্ঞানী পামেন (Palmen)।

২১. নিরক্ষীয় নিম্নচাপ ও ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয়ের মধ্যবর্তী বায়ু কোষটিকে কী বলে?

উত্তর: হ্যাডলি কোষ (Hadley cell)।

২২. ক্রান্তীয় উচ্চচাপ ও উপমেরু নিম্নচাপ বলয়ের মধ্যবর্তী কোষটিকে কী বলে?

উত্তর: ফেরেল কোষ (Ferrel cell)।

২৩. ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রে শান্ত ও মেঘমুক্ত অবস্থাকে কী বলে?

উত্তর: ঘূর্ণবাতের চক্ষু (Eye)।

২৪. ক্যারিবিয়ান সাগরে ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত কী নামে পরিচিত?

উত্তর: হারিকেন (Hurricane)।

২৫. অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত কী নামে পরিচিত?

উত্তর: উইলি-উইলি (Willy-willy)।

২৬. জাপান ও চীন সাগরে ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত কী নামে পরিচিত?

উত্তর: টাইফুন বা তাইফু।

২৭. পৃথিবীর সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ও শক্তিশালী ঘূর্ণবাত কোনটি?

উত্তর: টর্নেডো (Tornado)।

২৮. ঘূর্ণবাতের উৎপত্তির প্রক্রিয়াকে কী বলে?

উত্তর: ফ্রন্টোজেনেসিস (Frontogenesis)।

২৯. ঘূর্ণবাতের সমাপ্তি বা ধ্বংসের প্রক্রিয়াকে কী বলে?

উত্তর: ফ্রন্টোলাইসিস (Frontolysis)।

৩০. প্রতীপ ঘূর্ণবাত (Anticyclone) কথাটি প্রথম কে ব্যবহার করেন?

উত্তর: ফ্রান্সিস গ্যালটন (Francis Galton)।

৩১. প্রতীপ ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রে কী ধরনের চাপ থাকে?

উত্তর: উচ্চচাপ।

৩২. কোন মেঘকে 'বজ্রমেঘ' বা Thundercloud বলা হয়?

উত্তর: কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus)।

৩৩. কোন মেঘ দেখতে পেঁজা তুলোর মতো হয়?

উত্তর: কিউমুলাস (Cumulus)।

৩৪. আকাশে ম্যাকারেল মাছের পিঠের মতো দেখতে কোন মেঘ তৈরি হয়?

উত্তর: সিরোকিউমুলাস মেঘ (একে ম্যাকারেল আকাশও বলে)।

৩৫. বৃষ্টির জলকণার ব্যাস ০.৫ মিলিমিটারের কম হলে তাকে কী বলে?

উত্তর: গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি বা ড্রিজল (Drizzle)।

৩৬. বৃষ্টির জলের সাথে ছোট ছোট বরফকণা মিশে ঝরে পড়লে তাকে কী বলে?

উত্তর: স্লিট (Sleet)।

৩৭. তুষারকণা ও জলকণা মিলে বড় আকারের বরফের টুকরো হিসেবে মাটিতে পড়লে তাকে কী বলে?

উত্তর: শিলাবৃষ্টি (Hail)।

৩৮. জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ভূপৃষ্ঠের ঘাস বা পাতার ওপর জলবিন্দুরূপে জমা হলে তাকে কী বলে?

উত্তর: শিশির (Dew)।

৩৯. বায়ুমণ্ডলের ভাসমান ধূলিকণা, লবণকণা বা ধোঁয়াকে আশ্রয় করে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হলে ওই ধূলিকণাকে কী বলে?

উত্তর: ঘনীভবন নিউক্লিয়াস বা আর্দ্রতোগ্রাহী কেন্দ্র।

৪০. কোন মেঘ একটানা হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত ঘটায়?

উত্তর: নিম্বোস্ট্র্যাটাস (Nimbostratus)।

পর্ব ২: ১০টি টীকা (মান - ২ বা ৩)

১. জেট স্ট্রিম (Jet Stream): ট্রপোস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বস্তরে (৯-১২ কিমি উচ্চতায়) পৃথিবীকে বেষ্টন করে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে (ঘণ্টায় ৩০০-৪০০ কিমি) প্রবাহিত সংকীর্ণ ও সর্পিলাকার বায়ুস্রোতকে জেট স্ট্রিম বা জেট বায়ু বলে। এটি মূলত ভারতীয় মৌসুমি বায়ু এবং পৃথিবীর আবহাওয়াকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

২. এল নিনো (El Nino): প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব দিকে অর্থাৎ পেরু ও ইকুয়েডর উপকূলে সাধারণত শীতল স্রোত প্রবাহিত হয়। কিন্তু ২ থেকে ৭ বছর অন্তর কোনো কোনো বছর সেখানে একপ্রকার অস্বাভাবিক উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের আবির্ভাব ঘটে। এই উষ্ণ স্রোতকেই এল নিনো বলে। এর প্রভাবে পেরু উপকূলে প্রবল বৃষ্টিপাত হয় এবং ভারতে খরা দেখা দেয়।

৩. লা নিনা (La Nina): স্প্যানিশ শব্দ লা নিনা-র অর্থ 'ছোট্ট মেয়ে'। এল নিনোর বছরগুলির ঠিক পর্যায়ক্রমে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূলে যে অতি শীতল স্রোতের সৃষ্টি হয়, তাকে লা নিনা বলে। এর প্রভাবে ভারতে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও বন্যা হয় এবং দক্ষিণ আমেরিকায় খরা দেখা দেয়।

৪. ITCZ (আন্তঃক্রান্তীয় সম্মিলন অঞ্চল): নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ে উত্তর গোলার্ধের উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধের দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু এসে মিলিত হয়। এই মিলনস্থলকে আন্তঃক্রান্তীয় সম্মিলন অঞ্চল বা Inter Tropical Convergence Zone (ITCZ) বলে। এটি সূর্যরশ্মির পতনের সাথে সাথে সামান্য উত্তর ও দক্ষিণে সরে যায়।

৫. শিশিরাঙ্ক (Dew Point): যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কোনো নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ু তার মধ্যে থাকা জলীয় বাষ্প দ্বারা সম্পৃক্ত (Saturated) হয়ে যায়, অর্থাৎ বায়ুটি আর অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে না, সেই তাপমাত্রাকে ওই বায়ুর শিশিরাঙ্ক বলে। শিশিরাঙ্কে পৌঁছালেই বায়ুর জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হতে শুরু করে।

৬. ডাক্তার বায়ু (Doctor Wind): শীতকালে পশ্চিম আফ্রিকার গিনি উপকূলে একপ্রকার শীতল ও আর্দ্র অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়া বিরাজ করে। সেই সময় সাহারা মরুভূমি থেকে 'হারমাটান' নামক একটি উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ু ওই উপকূলে এসে পৌঁছালে সেখানকার আর্দ্রতা কমে যায় এবং আবহাওয়া আরামদায়ক ও স্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। তাই স্থানীয় লোকেরা একে 'ডাক্তার বায়ু' বলে।

৭. ঘূর্ণবাতের চক্ষু (Eye of Cyclone): শক্তিশালী ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাতের একেবারে কেন্দ্রস্থলে (প্রায় ১০ থেকে ৩০ কিমি ব্যাসযুক্ত অঞ্চলে) বায়ুর চাপ সর্বনিম্ন থাকে এবং বায়ুর ঊর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী গতি প্রায় থাকে না। ফলে কেন্দ্রস্থলে আকাশ মেঘমুক্ত ও শান্ত থাকে। এই শান্ত কেন্দ্রস্থলকেই ঘূর্ণবাতের চক্ষু বলা হয়।

৮. স্লিট (Sleet): শীতপ্রধান দেশে বা উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে অনেক সময় ঊর্ধ্বাকাশে বৃষ্টির জল নিচের স্তরে নেমে আসার সময় হিমশীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে জমে গিয়ে ছোট ছোট বরফকণায় পরিণত হয়। এই বরফকণা ও বৃষ্টির জলের মিশ্রিত রূপকে স্লিট বলে।

৯. কিউমুলোনিম্বাস মেঘ (Cumulonimbus): এই মেঘগুলি দেখতে বিশাল আকৃতির পাহাড় বা ফুলকপির মতো হয় এবং এদের বিস্তার উলম্বভাবে অনেক দূর পর্যন্ত থাকে। এই মেঘের উপরিভাগ চ্যাপ্টা ও তলদেশ কালো হয়। এই মেঘে প্রবল বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ভারী বৃষ্টিপাত বা শিলাবৃষ্টি হয়, তাই একে 'বজ্রমেঘ' বা Thundercloud বলা হয়।

১০. প্রতীপ ঘূর্ণবাত (Anticyclone): উচ্চ অক্ষাংশে শীতল ও হিমমণ্ডলীয় অঞ্চলে বায়ুর চাপ বেশি থাকায় সেখানে উচ্চচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়। এই উচ্চচাপ কেন্দ্র থেকে বায়ু বাইরের দিকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে কুণ্ডলাকারে বেরিয়ে যায়। একে প্রতীপ ঘূর্ণবাত বলে। এর প্রভাবে আবহাওয়া শান্ত ও মেঘমুক্ত থাকে।

পর্ব ৩: ৫টি রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৫)

১. ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত (Tropical Cyclone) ও প্রতীপ ঘূর্ণবাতের (Anticyclone) মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করো।

উত্তর: ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত এবং প্রতীপ ঘূর্ণবাতের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:

 * বায়ুর চাপ: ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রে থাকে গভীর নিম্নচাপ এবং বাইরের দিকে থাকে উচ্চচাপ। বিপরীতদিকে, প্রতীপ ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রে থাকে উচ্চচাপ এবং বাইরের দিকে থাকে নিম্নচাপ।

 * বায়ুপ্রবাহের দিক: ঘূর্ণবাতে বায়ু বাইরের উচ্চচাপ থেকে কেন্দ্রের নিম্নচাপের দিকে প্রবল বেগে ছুটে আসে (উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে)। প্রতীপ ঘূর্ণবাতে বায়ু কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে বেরিয়ে যায় (উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে)।

 * বায়ুর গতিবেগ: ঘূর্ণবাতে বায়ুর চাপ ঢাল বেশি হওয়ায় বায়ুর গতিবেগ মারাত্মক (ঘণ্টায় ১০০-২০০ কিমি) হয়। প্রতীপ ঘূর্ণবাতে বায়ুর গতিবেগ অত্যন্ত মৃদু বা শান্ত প্রকৃতির হয়।

 * আবহাওয়া: ঘূর্ণবাতের ফলে আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায় এবং প্রবল বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়বৃষ্টি ও ধ্বংসলীলা চলে। কিন্তু প্রতীপ ঘূর্ণবাতে আকাশ পরিষ্কার ও মেঘমুক্ত থাকে, শান্ত ও রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া বিরাজ করে।

 * উৎপত্তি অঞ্চল: ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত সাধারণত ৫°-২০° অক্ষাংশের মধ্যে উষ্ণ সমুদ্রের ওপর সৃষ্টি হয়। প্রতীপ ঘূর্ণবাত মূলত উচ্চ অক্ষাংশে শীতল ও বরফাবৃত অঞ্চলে সৃষ্টি হয়।

২. মেঘ কাকে বলে? উচ্চতা অনুসারে মেঘের শ্রেণিবিভাগ করো এবং যেকোনো এক প্রকার মেঘের বিবরণ দাও।

উত্তর: বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র জলকণা বা বরফকণার সৃষ্টি করে যা বায়ুমণ্ডলে ভাসমান ধূলিকণাকে আশ্রয় করে আকাশে ভেসে বেড়ায়। একেই মেঘ বলে।

উচ্চতা অনুসারে মেঘকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:

 * উচ্চ আকাশের মেঘ (গড় উচ্চতা ৬-১২ কিমি): সিরোস্ট্র্যাটাস, সিরোকিউমুলাস এবং সিরাস।

 * মধ্য আকাশের মেঘ (গড় উচ্চতা ২-৬ কিমি): অল্টোস্ট্র্যাটাস এবং অল্টোকিউমুলাস।

 * নিম্ন আকাশের মেঘ (গড় উচ্চতা ২ কিমির নিচে): স্ট্র্যাটোকিউমুলাস, স্ট্র্যাটাস এবং নিম্বোস্ট্র্যাটাস।

 * এছাড়া উলম্ব মেঘ রয়েছে (কিউমুলাস এবং কিউমুলোনিম্বাস)।

উচ্চ আকাশের সিরাস (Cirrus) মেঘের বিবরণ: এই মেঘ আকাশে সবচেয়ে উঁচুতে (৮-১২ কিমি) অবস্থান করে। এটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বরফকণা দিয়ে তৈরি। এই মেঘ দেখতে অনেকটা পাখির সাদা পালক বা পেঁজা তুলোর মতো। এটি সাধারণত সাদা রঙের হয় এবং এর মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো সহজেই আসতে পারে। এই মেঘ পরিষ্কার আবহাওয়ার নির্দেশক, অর্থাৎ আকাশে সিরাস মেঘ থাকলে সাধারণত বৃষ্টি হয় না।

৩. ভারতীয় মৌসুমি বায়ুর ওপর জেট স্ট্রিমের প্রভাব আলোচনা করো।

উত্তর: ভারতীয় জলবায়ু ও মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের প্রধান নিয়ন্ত্রক হলো জেট স্ট্রিম। ভারতে মূলত দু'ধরনের জেট বায়ু দেখা যায়—উষ্ণ পুবালি জেট এবং শীতল উপক্রান্তীয় পশ্চিমা জেট।

 * গ্রীষ্মকালে পুবালি জেটের প্রভাব: গ্রীষ্মকালে সূর্য উত্তর গোলার্ধে কিরণ দেওয়ায় তিব্বত মালভূমি প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়। ফলে হিমালয়ের দক্ষিণে উপক্রান্তীয় পশ্চিমা জেট বায়ু সরে গিয়ে সেখানে পুবালি জেট বায়ুর আবির্ভাব ঘটে। এই পুবালি জেট ভারতের আকাশে একটি গভীর নিম্নচাপ তৈরি করে, যা ভারত মহাসাগর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুকে প্রবল বেগে ভারতের দিকে টেনে আনে। এর ফলে ভারতে হঠাৎ বর্ষা নামে, যাকে 'মৌসুমি বিস্ফোরণ' (Burst of Monsoon) বলে।

 * শীতকালে পশ্চিমা জেটের প্রভাব: শীতকালে পুবালি জেট অন্তর্হিত হয় এবং হিমালয়ের দক্ষিণে উত্তর-পশ্চিম ভারতে উপক্রান্তীয় পশ্চিমা জেট পুনরায় ফিরে আসে। এর প্রভাবে উত্তর-পশ্চিম ভারতে উচ্চচাপের সৃষ্টি হয় এবং উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু (শীতকালীন বায়ু) প্রবাহিত হতে শুরু করে। এছাড়া, পশ্চিমা জেটের প্রভাবেই ভূমধ্যসাগর থেকে আসা 'পশ্চিমী ঝঞ্ঝা' (Western Disturbances) ভারতে প্রবেশ করে শীতকালে বৃষ্টিপাত ঘটায়।

৪. ভারতীয় জলবায়ুর ওপর এল নিনো ও লা নিনার প্রভাব আলোচনা করো।

উত্তর: প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ ও শীতল স্রোতের পর্যায়ক্রমিক চক্র এল নিনো এবং লা নিনা ভারতীয় মৌসুমি বায়ুকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে:

 * এল নিনোর প্রভাব: যে বছর প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব উপকূলে উষ্ণ এল নিনো স্রোতের আবির্ভাব ঘটে, সে বছর প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব দিকে নিম্নচাপ এবং পশ্চিম দিকে (ভারত মহাসাগরে) অপেক্ষাকৃত উচ্চচাপের সৃষ্টি হয়। এর ফলে ভারত মহাসাগর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে বা ভারতে দেরিতে প্রবেশ করে। ফলস্বরূপ, ভারতে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম হয় এবং দেশের বিভিন্ন অংশে ভয়াবহ খরা বা অনাবৃষ্টি দেখা দেয় (যেমন- ১৯৮২, ১৯৮৭, ২০০২ সালের খরা)।

 * লা নিনার প্রভাব: এল নিনোর বিপরীত অবস্থা হলো লা নিনা। যে বছর প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বে অতি শীতল স্রোত দেখা দেয়, সে বছর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তিশালী নিম্নচাপ তৈরি হয়। এর ফলে অত্যন্ত শক্তিশালী দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ভারতে প্রবেশ করে। ফলস্বরূপ, ওই বছরগুলিতে ভারতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হয় এবং বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় (যেমন- ১৯৯৮, ২০০৭, ২০১০ সালের বন্যা)।

৫. বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা কাকে বলে? নিরপেক্ষ আর্দ্রতা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা বলতে কী বোঝো?

উত্তর: বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা (Humidity): বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত জলীয় বাষ্পের পরিমাণকেই সাধারণ ভাষায় বায়ুর আর্দ্রতা বলা হয়। বায়ুর আর্দ্রতার ওপর বৃষ্টিপাত, শিশির, কুয়াশা ইত্যাদি নির্ভরশীল। বায়ুর আর্দ্রতাকে মূলত তিনটি উপায়ে প্রকাশ করা হয়, যার মধ্যে দুটি প্রধান হলো নিরপেক্ষ আর্দ্রতা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা।

 * নিরপেক্ষ বা চরম আর্দ্রতা (Absolute Humidity): কোনো একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে প্রকৃত যে পরিমাণ জলীয় বাষ্প থাকে, তাকে ওই বায়ুর নিরপেক্ষ আর্দ্রতা বলে। একে গ্রাম প্রতি ঘনমিটার (g/m³) এককে প্রকাশ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১ ঘনমিটার বায়ুতে যদি ১৫ গ্রাম জলীয় বাষ্প থাকে, তবে তার নিরপেক্ষ আর্দ্রতা ১৫ g/m³।

 * আপেক্ষিক আর্দ্রতা (Relative Humidity): কোনো নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে যে পরিমাণ জলীয় বাষ্প উপস্থিত আছে এবং ওই একই তাপমাত্রায় ওই পরিমাণ বায়ুকে সম্পূর্ণ সম্পৃক্ত করতে সর্বাধিক যে পরিমাণ জলীয় বাষ্পের প্রয়োজন হয়—এই দুইয়ের অনুপাতকে শতকরা ভাগে প্রকাশ করলে তাকে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বলে।

   * সূত্র: আপেক্ষিক আর্দ্রতা = (বায়ুতে উপস্থিত জলীয় বাষ্পের পরিমাণ / বায়ুর সর্বাধিক জলীয় বাষ্প ধারণ ক্ষমতা) × ১০০।

   * আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে এবং মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যবোধ (গরম বা ঘাম হওয়া) নির্ধারণে আপেক্ষিক আর্দ্রতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।





সূচিপত্রের ৬ নম্বর টপিকটি হলো বারিমণ্ডল – প্রথম পর্ব। দশম শ্রেণির ভূগোলে বারিমণ্ডলের প্রথম পর্বে মূলত সমুদ্রস্রোত (Ocean Currents) নিয়ে আলোচনা করা হয়। এর ওপর ভিত্তি করে আপনার চাওয়া ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ১০টি টীকা এবং ৫টি বড় প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো।

পর্ব ১: ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)

১. পৃথিবীর কত শতাংশ স্থান জলভাগ দ্বারা আবৃত?

উত্তর: প্রায় ৭১%।

২. সমুদ্রের জলরাশির নিয়মিত ও নির্দিষ্ট দিকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রবাহিত হওয়াকে কী বলে?

উত্তর: সমুদ্রস্রোত (Ocean Current)।

৩. সমুদ্রের জলরাশি একই স্থানে থেকে উলম্বভাবে বা উপর-নিচে ওঠানামা করাকে কী বলে?

উত্তর: সমুদ্রতরঙ্গ (Ocean Wave)।

৪. উষ্ণতার ভিত্তিতে সমুদ্রস্রোত প্রধানত কয় প্রকার ও কী কী?

উত্তর: ২ প্রকার (উষ্ণ স্রোত ও শীতল স্রোত)।

৫. সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির প্রধান কারণ কী?

উত্তর: নিয়ত বায়ুপ্রবাহ (Planetary Winds)।

৬. নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ায় সেখানে কোন স্রোতের সৃষ্টি হয়?

উত্তর: উষ্ণ স্রোত।

৭. মেরু অঞ্চলে বরফগলা জল ও শীতল আবহাওয়ার কারণে কোন স্রোতের সৃষ্টি হয়?

উত্তর: শীতল স্রোত।

৮. সাধারণত উষ্ণ স্রোত সমুদ্রের কোন দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়?

উত্তর: সমুদ্রের ওপরের অংশ দিয়ে (বহিঃস্রোত রূপে)।

৯. শীতল স্রোত ভারী হওয়ায় তা সমুদ্রের কোন দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়?

উত্তর: সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে (অন্তঃস্রোত রূপে)।

১০. কোরিওলিস বলের প্রভাবে উত্তর গোলার্ধে সমুদ্রস্রোত কোন দিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়?

উত্তর: ডানদিকে (ঘড়ির কাঁটার দিকে)।

১১. কোন মহাসাগরের সমুদ্রস্রোত ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে (মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে) তার দিক পরিবর্তন করে?

উত্তর: ভারত মহাসাগরের সমুদ্রস্রোত।

১২. উপসাগরীয় স্রোত (Gulf stream) কোন মহাসাগরে প্রবাহিত হয়?

উত্তর: উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে (এটি একটি উষ্ণ স্রোত)।

১৩. ল্যাব্রাডর স্রোত কোন মহাসাগরের স্রোত?

উত্তর: উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের (এটি একটি শীতল স্রোত)।

১৪. পৃথিবীর দ্রুততম সমুদ্রস্রোত কোনটি?

উত্তর: উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত।

১৫. 'কুরোশিয়ো' (Kuroshio) শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: কালো স্রোত।

১৬. কুরোশিয়ো বা জাপান স্রোত কোন মহাসাগরে দেখা যায়?

উত্তর: উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে।

১৭. প্রশান্ত মহাসাগরের একটি বিখ্যাত শীতল স্রোতের নাম লেখো।

উত্তর: পেরু স্রোত বা হামবোল্ট স্রোত।

১৮. কোন স্রোতের প্রভাবে উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের বন্দরগুলি (যেমন- লন্ডন) শীতকালেও বরফমুক্ত থাকে?

উত্তর: উষ্ণ উত্তর আটলান্টিক স্রোতের প্রভাবে।

১৯. নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে কোন দুটি স্রোত এসে মিলিত হয়েছে?

উত্তর: উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত এবং শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত।

২০. শৈবাল সাগর (Sargasso Sea) কোন মহাসাগরে সৃষ্টি হয়েছে?

উত্তর: উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে।

২১. হিমপ্রাচীর (Cold Wall) কোথায় দেখা যায়?

উত্তর: উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে (নিউফাউন্ডল্যান্ডের কাছে)।

২২. কোন স্রোতের প্রভাবে দক্ষিণ আমেরিকার আটাকামা মরুভূমির সৃষ্টি হয়েছে?

উত্তর: শীতল পেরু বা হামবোল্ট স্রোত।

২৩. কোন মহাসাগরে 'আগুলহাস' (Agulhas) স্রোত দেখা যায়?

উত্তর: ভারত মহাসাগরে (মাদাগাস্কার ও মোজাম্বিক স্রোত মিলিত হয়ে আগুলহাস স্রোত তৈরি করে)।

২৪. সোমালি স্রোত কোন মহাসাগরের অংশ?

উত্তর: ভারত মহাসাগরের।

২৫. নিরক্ষীয় স্রোতের ঠিক মাঝখান দিয়ে বিপরীত দিকে প্রবাহিত স্রোতকে কী বলে?

উত্তর: নিরক্ষীয় প্রতিস্রোত (Equatorial Counter Current)।

২৬. উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলনস্থলে কী ধরনের আবহাওয়া সৃষ্টি হয়?

উত্তর: ঘন কুয়াশা ও ঝড়ঝঞ্জা।

২৭. গ্র্যান্ড ব্যাংক, ডগার্স ব্যাংক প্রভৃতি অঞ্চল কীসের জন্য বিশ্ববিখ্যাত?

উত্তর: মাছ ধরার জন্য (বা বাণিজ্যিক মৎস্যচারণ ক্ষেত্র হিসেবে)।

২৮. পৃথিবীর বৃহত্তম মৎস্যচারণ ক্ষেত্র কোনটি?

উত্তর: উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের গ্র্যান্ড ব্যাংক।

২৯. সমুদ্রে ভাসমান বিশাল বরফের স্তূপকে কী বলে?

উত্তর: হিমশৈল (Iceberg)।

৩০. বিখ্যাত যাত্রীবাহী জাহাজ 'টাইটানিক' কোন স্রোত বাহিত হিমশৈলের সাথে ধাক্কা খেয়ে ডুবেছিল?

উত্তর: শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত।

৩১. এল নিনোর প্রভাব কোন মহাসাগরে দেখা যায়?

উত্তর: প্রশান্ত মহাসাগরে (পেরু-ইকুয়েডর উপকূলে)।

৩২. কোন স্রোত জাপানের পূর্ব উপকূলে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে?

উত্তর: উষ্ণ কুরোশিয়ো স্রোত।

৩৩. ক্যানারি স্রোত কোন মহাসাগরে দেখা যায়?

উত্তর: উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে (এটি শীতল স্রোত)।

৩৪. আয়ন বায়ুর প্রভাবে মহাসাগরগুলোতে কোন স্রোতের উৎপত্তি হয়?

উত্তর: নিরক্ষীয় স্রোত।

৩৫. সমুদ্রজলের লবণাক্ততা বাড়লে জলের ঘনত্ব বাড়ে না কমে?

উত্তর: জলের ঘনত্ব বাড়ে।

৩৬. ফকল্যান্ড স্রোত কোন মহাসাগরে প্রবাহিত হয়?

উত্তর: দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে (শীতল স্রোত)।

৩৭. বেঙ্গুয়েলা স্রোত কোন মহাসাগরে দেখা যায়?

উত্তর: দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে।

৩৮. সমুদ্রের বিশাল চক্রাকার স্রোতকে কী বলা হয়?

উত্তর: গাইর বা কুণ্ডলী (Gyre)।

৩৯. মাদাগাস্কার স্রোত ও মোজাম্বিক স্রোতের মিলিত প্রবাহের নাম কী?

উত্তর: আগুলহাস স্রোত।

৪০. এল নিনো সৃষ্টি হলে পেরু স্রোতের কী পরিবর্তন হয়?

উত্তর: শীতল পেরু স্রোতের জায়গায় উষ্ণ স্রোত প্রবাহিত হয়।

পর্ব ২: ১০টি টীকা (মান - ২ বা ৩)

১. সমুদ্রস্রোত ও সমুদ্রতরঙ্গ: সমুদ্রের জলরাশির একটি নির্দিষ্ট দিকে নিয়মিত ও অনুভূমিকভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রবাহিত হওয়াকে সমুদ্রস্রোত বলে। অন্যদিকে, সমুদ্রের জলরাশি যখন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত না হয়ে নিজের জায়গাতেই থেকে উলম্বভাবে বা উপর-নিচে ওঠানামা করে, তখন তাকে সমুদ্রতরঙ্গ বলে।

২. শৈবাল সাগর (Sargasso Sea): উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত, ক্যানারি স্রোত এবং উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত মিলে ঘড়ির কাঁটার দিকে একটি বিশাল চক্রাকার স্রোত বা গাইর সৃষ্টি করেছে। এর ফলে এই চক্রের মাঝখানের জলভাগ স্থির ও শান্ত থাকে এবং সেখানে প্রচুর আগাছা, শৈবাল, কচুরিপানা ইত্যাদি জন্মায়। স্রোতহীন এই শান্ত শৈবালপূর্ণ স্থানটিকে শৈবাল সাগর বলে।

৩. হিমপ্রাচীর (Cold Wall): উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে গাঢ় নীল রঙের উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত এবং সবুজ রঙের শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত পাশাপাশি বিপরীত দিকে প্রবাহিত হয়। উষ্ণ ও শীতল জলের ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে দুই স্রোতের জল সহজে মেশে না এবং এদের মাঝে একটি স্পষ্ট সীমারেখা দেখা যায়। এই সীমারেখাকেই হিমপ্রাচীর বলে।

৪. গ্র্যান্ড ব্যাংক (Grand Bank): উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে নিউফাউন্ডল্যান্ড দ্বীপের কাছে উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত এবং শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত এসে মিলিত হয়েছে। শীতল স্রোতের সাথে আসা হিমশৈলগুলি উষ্ণ স্রোতের সংস্পর্শে গলে যায় এবং এর মধ্যে থাকা নুড়ি, পাথর, বালি সমুদ্রের তলদেশে জমে বিশাল মগ্নচড়া সৃষ্টি করেছে। এখানে প্ল্যাঙ্কটন প্রচুর জন্মায় বলে এটি পৃথিবীর বৃহত্তম মৎস্যচারণ ক্ষেত্র বা গ্র্যান্ড ব্যাংকে পরিণত হয়েছে।

৫. প্ল্যাঙ্কটন (Plankton): সমুদ্রের জলে ভাসমান আণুবীক্ষণিক জীব ও উদ্ভিদদের প্ল্যাঙ্কটন বলে। উদ্ভিদ প্ল্যাঙ্কটনকে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন এবং প্রাণী প্ল্যাঙ্কটনকে জুপ্ল্যাঙ্কটন বলে। উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলনস্থলে প্ল্যাঙ্কটন প্রচুর পরিমাণে জন্মায়, যা মাছের প্রধান খাদ্য। তাই এই অঞ্চলগুলোতে মৎস্যক্ষেত্র গড়ে ওঠে।

৬. কুরোশিয়ো স্রোত (Kuroshio Current): উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট এটি একটি উষ্ণ স্রোত। উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে বাধা পেয়ে উত্তর দিকে ঘুরে জাপানের পূর্ব উপকূল দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই স্রোতের জলের রং কালচে নীল হওয়ায় জাপানি ভাষায় একে কুরোশিয়ো (কালো স্রোত) বলা হয়।

৭. গাইর বা কুণ্ডলী (Gyre): কোরিওলিস বল এবং মহাদেশীয় উপকূলের আকৃতির কারণে সমুদ্রস্রোতগুলি মহাসাগরের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে দিক পরিবর্তন করে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। সমুদ্রের বিশাল জলরাশির এই চক্রাকার বা বৃত্তাকার গতিকে গাইর বা কুণ্ডলী বলে। যেমন- উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে সৃষ্ট গাইর।

৮. বহিঃস্রোত ও অন্তঃস্রোত: নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রের জল উষ্ণ ও হালকা হওয়ায় তা প্রসারিত হয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উপর দিক দিয়ে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়, একে বহিঃস্রোত (উষ্ণ স্রোত) বলে। অপরদিকে, মেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী জল সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়, একে অন্তঃস্রোত (শীতল স্রোত) বলে।

৯. মৌসুমি স্রোত (Monsoon Current): ভারত মহাসাগরের উত্তর অংশে (আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরে) মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সমুদ্রস্রোত ঋতু অনুযায়ী দিক পরিবর্তন করে। গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে স্রোত পশ্চিম থেকে পূর্বে এবং শীতকালে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে স্রোত পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়। এটিই মৌসুমি স্রোত।

১০. পেরু স্রোত (Peru Current): দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে কুমেরু স্রোতের একটি শাখা দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্তে বাধা পেয়ে চিলি ও পেরুর পশ্চিম উপকূল ধরে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়। এটি একটি শীতল স্রোত। আবিষ্কারক আলেকজান্ডার ফন হামবোল্ট-এর নামানুসারে একে হামবোল্ট স্রোতও বলা হয়।

পর্ব ৩: ৫টি রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৫)

১. সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির প্রধান কারণগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: সমুদ্রের জলরাশি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় প্রবাহিত হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রধান কারণগুলি হলো:

 * নিয়ত বায়ুপ্রবাহ: সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির সবচেয়ে প্রধান কারণ হলো নিয়ত বায়ু (আয়ন বায়ু, পশ্চিমা বায়ু ও মেরু বায়ু)। বায়ু সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় জলের ওপরের স্তরকে নিজের সাথে টেনে নিয়ে যায়। পৃথিবীর বেশিরভাগ সমুদ্রস্রোত নিয়ত বায়ুপ্রবাহের পথ অনুসরণ করেই প্রবাহিত হয়।

 * পৃথিবীর আবর্তন গতি ও কোরিওলিস বল: পৃথিবীর আবর্তন গতির কারণে সৃষ্ট কোরিওলিস বলের প্রভাবে সমুদ্রস্রোত সোজাপথে না গিয়ে উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাঁদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয় (ফেরেলের সূত্র অনুযায়ী)।

 * উষ্ণতার পার্থক্য: নিরক্ষীয় অঞ্চলে জল উষ্ণ ও হালকা হয়ে বহিঃস্রোত রূপে মেরুর দিকে এবং মেরু অঞ্চলের জল শীতল ও ভারী হয়ে অন্তঃস্রোত রূপে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়।

 * লবণাক্ততা ও ঘনত্বের পার্থক্য: সমুদ্রের জলের লবণাক্ততা বেশি হলে জলের ঘনত্ব বাড়ে এবং তা ভারী হয়। ভারী জল নিচে নেমে যায় এবং কম লবণাক্ত হালকা জল সেই স্থান পূরণ করতে ছুটে আসে, ফলে স্রোতের সৃষ্টি হয়।

 * স্থলভাগের অবস্থান: প্রবাহিত সমুদ্রস্রোতের গতিপথে কোনো মহাদেশ বা দ্বীপ অবস্থান করলে, স্রোত তাতে বাধা পেয়ে বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে যায় বা দিক পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।

২. বিশ্ব জলবায়ুর ওপর সমুদ্রস্রোতের প্রভাব আলোচনা করো।

উত্তর: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সমুদ্রস্রোতের অপরিসীম প্রভাব রয়েছে:

 * উষ্ণতা বৃদ্ধি ও হ্রাস: উষ্ণ স্রোত যেসব উপকূলের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেখানকার উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। যেমন- উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের প্রভাবে নরওয়ে ও ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের উপকূল শীতকালেও বরফমুক্ত থাকে। আবার, শীতল স্রোত উপকূলের উষ্ণতা কমিয়ে দেয়।

 * বৃষ্টিপাত ও মরুভূমি সৃষ্টি: উষ্ণ স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু প্রচুর জলীয় বাষ্প সংগ্রহ করে উপকূলে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায় (যেমন- জাপানের পূর্ব উপকূলে)। কিন্তু শীতল স্রোতের ওপরের বায়ু শীতল ও শুষ্ক হওয়ায় বৃষ্টিপাত হয় না। এর ফলে শীতল স্রোতের পার্শ্ববর্তী উপকূলগুলিতে মরুভূমির সৃষ্টি হয়েছে (যেমন- শীতল পেরু স্রোতের প্রভাবে আটাকামা মরুভূমি)।

 * কুয়াশা ও ঝড়ঝঞ্জা: উষ্ণ স্রোত এবং শীতল স্রোত যেখানে মিলিত হয়, সেখানে উষ্ণ বায়ুর সাথে শীতল বায়ুর সংঘর্ষে সারাবছর ঘন কুয়াশা এবং ভয়ংকর ঝড়ঝঞ্জার সৃষ্টি হয়। নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে এই কারণেই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া থাকে।

 * এল নিনো ও লা নিনা: প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রস্রোতের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের ফলে (এল নিনো) পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে ভারতে খরা বা অনাবৃষ্টি দেখা দেয় এবং লা নিনা সৃষ্টি হলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়।

৩. আটলান্টিক মহাসাগরের প্রধান স্রোতগুলির বিবরণ দাও।

উত্তর: আটলান্টিক মহাসাগরের সমুদ্রস্রোতগুলিকে প্রধান দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—উত্তর আটলান্টিক ও দক্ষিণ আটলান্টিকের স্রোত।

 * উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের স্রোত:

   * উষ্ণ স্রোত: নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত ক্যারিবিয়ান সাগরে প্রবেশ করে 'উপসাগরীয় স্রোত' নাম ধারণ করে। এটি পৃথিবীর দ্রুততম স্রোত। এই স্রোতের একটি শাখা উত্তর ইউরোপের দিকে 'উষ্ণ উত্তর আটলান্টিক স্রোত' নামে প্রবাহিত হয়।

   * শীতল স্রোত: সুমেরু অঞ্চল থেকে 'শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত' গ্রিনল্যান্ডের পাশ দিয়ে নেমে এসে নিউফাউন্ডল্যান্ডের কাছে উপসাগরীয় স্রোতের সাথে মেশে। এছাড়া উত্তর আটলান্টিকের পূর্ব দিক দিয়ে 'ক্যানারি স্রোত' নামে একটি শীতল স্রোত প্রবাহিত হয়।

 * দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের স্রোত:

   * উষ্ণ স্রোত: দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত ব্রাজিলের পূর্ব উপকূল দিয়ে 'ব্রাজিল স্রোত' নামে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়।

   * শীতল স্রোত: কুমেরু মহাসাগর থেকে একটি শীতল স্রোত 'ফকল্যান্ড স্রোত' নামে উত্তর দিকে বয়। এছাড়া আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল দিয়ে 'বেঙ্গুয়েলা স্রোত' নামে একটি শীতল স্রোত প্রবাহিত হয়ে নিরক্ষীয় স্রোতের সাথে মেশে।

৪. নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মৎস্যক্ষেত্র (Fishing Ground) গড়ে ওঠার কারণগুলি কী কী?

উত্তর: উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে কানাডার পূর্ব উপকূলে নিউফাউন্ডল্যান্ড দ্বীপের সন্নিকটে 'গ্র্যান্ড ব্যাংক' নামে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মৎস্যক্ষেত্রটি গড়ে ওঠার পেছনে প্রধান কারণগুলি হলো:

 * উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলন: এখানে দক্ষিণ থেকে আগত উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত এবং উত্তর থেকে আগত শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত মিলিত হয়েছে। স্রোতের এই মিলনস্থল মাছের প্রজনন ও বসবাসের জন্য আদর্শ।

 * মগ্নচড়ার উপস্থিতি: শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের সাথে ভেসে আসা বিশাল হিমশৈলগুলি উষ্ণ স্রোতের সংস্পর্শে এসে গলে যায়। ফলে হিমশৈলের মধ্যে থাকা নুড়ি, পাথর, কাঁকর ও বালি সমুদ্রের তলদেশে জমে বিশাল উঁচু ঢিবি বা মগ্নচড়া (যেমন- গ্র্যান্ড ব্যাংক) তৈরি করেছে। এখানে সমুদ্র অগভীর হওয়ায় মাছ ধরার সুবিধা হয়।

 * প্ল্যাঙ্কটনের প্রাচুর্য: অগভীর মগ্নচড়ায় সূর্যের আলো সহজে প্রবেশ করায় এখানে মাছের প্রধান খাদ্য 'প্ল্যাঙ্কটন' (Plankton) প্রচুর পরিমাণে জন্মায়। খাদ্যের সন্ধানে তাই এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের আগমন ঘটে।

 * অনুকূল জলবায়ু ও প্রযুক্তি: এই অঞ্চলে মাছ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় শীতল জলবায়ু বিরাজ করে। এছাড়া আমেরিকা ও কানাডার উন্নত প্রযুক্তি ও মূলধন মাছ ধরার আধুনিক জাহাজ নির্মাণে সাহায্য করেছে।

৫. উষ্ণ স্রোত ও শীতল স্রোতের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: উষ্ণ স্রোত ও শীতল স্রোতের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:

 * উৎপত্তি অঞ্চল: উষ্ণ স্রোতের উৎপত্তি হয় নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় উষ্ণ মণ্ডলে। অপরদিকে, শীতল স্রোতের উৎপত্তি হয় মেরু ও উপমেরু সংলগ্ন হিমমণ্ডলে।

 * প্রবাহের ধরন: উষ্ণ স্রোত হালকা হওয়ায় এটি সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরের অংশ দিয়ে 'বহিঃস্রোত' রূপে প্রবাহিত হয়। শীতল স্রোত ভারী হওয়ায় এটি সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে 'অন্তঃস্রোত' রূপে প্রবাহিত হয়।

 * প্রবাহের দিক: উষ্ণ স্রোত নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। কিন্তু শীতল স্রোত মেরু অঞ্চল থেকে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়।

 * বর্ণ বা রং: উষ্ণ স্রোতের জল সাধারণত গাঢ় নীল রঙের হয়। অপরদিকে, শীতল স্রোতের জল সবুজ বা কালচে সবুজ রঙের হয়।

আবহাওয়ার প্রভাব: উষ্ণ স্রোতের প্রভাবে উপকূলবর্তী অঞ্চলে উষ্ণতা বৃদ্ধি পায় এবং বৃষ্টিপাত হয়। শীতল স্রোতের প্রভাবে উপকূলের উষ্ণতা কমে যায়, বৃষ্টিপাত হয় না এবং মরুভূমির সৃষ্টি হয়।




সপ্তম অধ্যায়: বারিমণ্ডল – দ্বিতীয় পর্ব (জোয়ার-ভাটা)-এর ওপর ভিত্তি করে আপনার চাওয়া ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ১০টি টীকা এবং ৫টি বড় প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো।

পর্ব ১: ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)

১. সমুদ্রের জলরাশির নিয়মিত ও ছন্দোবদ্ধভাবে ফুলে ওঠাকে কী বলে?

উত্তর: জোয়ার (Tide)।

২. সমুদ্রের জলরাশির নিয়মিতভাবে নিচে নেমে যাওয়া বা কমে যাওয়াকে কী বলে?

উত্তর: ভাটা (Ebb)।

৩. জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির প্রধান দুটি কারণ কী কী?

উত্তর: চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং পৃথিবীর কেন্দ্রাতিগ বল।

৪. জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির ক্ষেত্রে পৃথিবীর ওপর চাঁদ না সূর্যের আকর্ষণ বেশি?

উত্তর: চাঁদের আকর্ষণ বেশি।

৫. চাঁদের আকর্ষণ সূর্যের আকর্ষণের চেয়ে প্রায় কত গুণ বেশি?

উত্তর: প্রায় ২.২ গুণ।

৬. মহাকর্ষ সূত্র (Law of Gravitation) কে আবিষ্কার করেন?

উত্তর: স্যার আইজ্যাক নিউটন।

৭. চাঁদের প্রবল আকর্ষণে পৃথিবীর যে অংশে জল ফুলে ওঠে, তাকে কী জোয়ার বলে?

উত্তর: মুখ্য জোয়ার বা প্রত্যক্ষ জোয়ার।

৮. মুখ্য জোয়ারের ঠিক বিপরীত দিকে কোন শক্তির প্রভাবে জোয়ার হয়?

উত্তর: পৃথিবীর কেন্দ্রাতিগ বলের (Centrifugal force) প্রভাবে।

৯. কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে সৃষ্ট জোয়ারকে কী বলে?

উত্তর: গৌণ জোয়ার বা পরোক্ষ জোয়ার।

১০. দুটি মুখ্য জোয়ারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কত?

উত্তর: ২৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট।

১১. একটি মুখ্য জোয়ার ও একটি গৌণ জোয়ারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কত?

উত্তর: ১২ ঘণ্টা ২৬ মিনিট।

১২. একটি জোয়ার ও একটি ভাটার মধ্যে সময়ের ব্যবধান কত?

উত্তর: ৬ ঘণ্টা ১৩ মিনিট।

১৩. প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট স্থানে কতবার জোয়ার ও কতবার ভাটা হয়?

উত্তর: ২ বার জোয়ার এবং ২ বার ভাটা হয়।

১৪. চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবীর একই সরলরেখায় অবস্থানকে কী বলে?

উত্তর: সিজিগি (Syzygy)।

১৫. সিজিগি অবস্থানে চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী কত ডিগ্রি কোণে থাকে?

উত্তর: ১৮০° কোণে।

১৬. অমাবস্যা তিথিতে সিজিগি অবস্থানকে কী বলে?

উত্তর: সংযোগ (Conjunction)।

১৭. পূর্ণিমা তিথিতে সিজিগি অবস্থানকে কী বলে?

উত্তর: প্রতিযোগ (Opposition)।

১৮. অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে সৃষ্ট প্রবল জোয়ারকে কী বলে?

উত্তর: ভরা কোটাল বা তেজ কোটাল (Spring Tide)।

১৯. কোন তিথিতে মরা কোটাল (Neap Tide) সৃষ্টি হয়?

উত্তর: শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে।

২০. মরা কোটালের সময় চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী পরস্পর কত ডিগ্রি কোণে অবস্থান করে?

উত্তর: ৯০° বা সমকোণে।

২১. পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব কত?

উত্তর: প্রায় ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার ৪০০ কিমি।

২২. পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে দূরত্ব সবচেয়ে কম হলে তাকে কী বলে?

উত্তর: পেরিজি (Perigee) অবস্থান।

২৩. পেরিজি অবস্থানে সৃষ্ট জোয়ারকে কী জোয়ার বলে?

উত্তর: পেরিজিয়ান জোয়ার (Perigean Tide)।

২৪. পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে দূরত্ব সবচেয়ে বেশি হলে তাকে কী বলে?

উত্তর: অ্যাপোজি (Apogee) অবস্থান।

২৫. অ্যাপোজি অবস্থানে সৃষ্ট জোয়ারকে কী বলে?

উত্তর: অ্যাপোজিয়ান জোয়ার (Apogean Tide)।

২৬. নদীর মোহনা দিয়ে জোয়ারের জল প্রবল বেগে নদীখাতে প্রবেশ করাকে কী বলে?

উত্তর: বানডাকা (Tidal bore)।

২৭. ভারতের কোন নদীতে বানডাকা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়?

উত্তর: হুগলি নদীতে।

২৮. পৃথিবীর কোন উপসাগরে জোয়ারের জল সবচেয়ে বেশি ফুলে ওঠে?

উত্তর: উত্তর আমেরিকার আটলান্টিক উপকূলে ফানডি উপসাগরে (Bay of Fundy)।

২৯. বর্ষাকালে হুগলি নদীতে সৃষ্ট প্রবল বানডাকাকে স্থানীয় ভাষায় কী বলে?

উত্তর: ষাঁড়াষাঁড়ির বান।

৩০. চাঁদ পৃথিবীর চারিদিকে একবার ঘুরে আসতে প্রায় কত সময় নেয়?

উত্তর: সাড়ে ২৭ দিন (২৭⅓ দিন)।

৩১. কোন স্থানে প্রতিদিন জোয়ার ঠিক একই সময়ে না হয়ে কত মিনিট দেরিতে হয়?

উত্তর: প্রায় ৫২ মিনিট দেরিতে।

৩২. ভরা কোটালের সময় জলতল সাধারণ জোয়ারের থেকে কত শতাংশ বেশি ফুলে ওঠে?

উত্তর: প্রায় ২০% বেশি।

৩৩. মরা কোটালের সময় জলতল সাধারণ জোয়ারের থেকে কত শতাংশ কম ফোলে?

উত্তর: প্রায় ২০% কম।

৩৪. জোয়ার-ভাটা শক্তির সাহায্যে কী উৎপাদন করা যায়?

উত্তর: জলবিদ্যুৎ।

৩৫. ভারতের কোন উপকূলে জোয়ার-ভাটা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা সর্বাধিক?

উত্তর: গুজরাটের খাম্বাত বা কাম্বে উপসাগরে।

৩৬. জোয়ার-ভাটার ফলে নদীর গভীরতা বাড়ে না কমে?

উত্তর: গভীরতা বাড়ে (নদীখাত পরিষ্কার থাকে)।

৩৭. পূর্ণিমা তিথিতে চাঁদ ও সূর্যের মাঝে কে অবস্থান করে?

উত্তর: পৃথিবী।

৩৮. অমাবস্যা তিথিতে পৃথিবী ও সূর্যের মাঝে কে অবস্থান করে?

উত্তর: চাঁদ।

৩৯. পৃথিবীর আবর্তনের ফলে সৃষ্ট বাইরের দিকে ছিটকে যাওয়ার প্রবণতাকে কী বলে?

উত্তর: কেন্দ্রাতিগ বল (Centrifugal Force)।

৪০. লন্ডনের টেমস নদীতে কি বানডাকা দেখা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, দেখা যায়।

পর্ব ২: ১০টি টীকা (মান - ২ বা ৩)

১. জোয়ার-ভাটা (Tide and Ebb): চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং পৃথিবীর কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে পৃথিবীর সমুদ্র ও মহাসাগরের জলরাশি প্রতিদিন নিয়মিতভাবে ও নির্দিষ্ট সময়ে ছন্দোবদ্ধভাবে ফুলে ওঠে এবং নেমে যায়। জলরাশির এই ফুলে ওঠাকে জোয়ার এবং নিচে নেমে যাওয়াকে ভাটা বলে।

২. সিজিগি (Syzygy): গ্রিক শব্দ 'Syzygia'-এর অর্থ হলো 'একত্র যুক্ত হওয়া'। সূর্য, চাঁদ এবং পৃথিবী যখন মহাকাশে একই সরলরেখায় (১৮০° কোণে) অবস্থান করে, তখন সেই জ্যোতির্বিজ্ঞানিক অবস্থাকে সিজিগি বলে। সাধারণত অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে সিজিগি অবস্থান ঘটে, যার ফলে পৃথিবীতে ভরা কোটাল সৃষ্টি হয়।

৩. সংযোগ ও প্রতিযোগ: সিজিগি অবস্থান দুটি ভাগে বিভক্ত। অমাবস্যা তিথিতে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে চাঁদ অবস্থান করলে তাকে সংযোগ (Conjunction) বলে। অন্যদিকে, পূর্ণিমা তিথিতে সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে পৃথিবী অবস্থান করলে তাকে প্রতিযোগ (Opposition) বলে।

৪. ভরা কোটাল বা তেজ কোটাল (Spring Tide): অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে সিজিগি অবস্থানে চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর একই দিকে বা বিপরীত দিকে এক সরলরেখায় অবস্থান করে। এর ফলে চাঁদ ও সূর্যের মিলিত ও প্রবল আকর্ষণে পৃথিবীতে যে বিশাল ও শক্তিশালী জোয়ারের সৃষ্টি হয়, তাকে ভরা কোটাল বা তেজ কোটাল বলে।

৫. মরা কোটাল (Neap Tide): শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী পরস্পর সমকোণে (৯০°) অবস্থান করে। এই সময় চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীর যে অংশে জোয়ার হয়, সূর্যের আকর্ষণে ঠিক তার সমকোণে ভাটা হয়। পরস্পর বিপরীতমুখী আকর্ষণের কারণে জল খুব বেশি ফুলে উঠতে পারে না। একে মরা কোটাল বলে।

৬. মুখ্য জোয়ার ও গৌণ জোয়ার: পৃথিবীর যে দিকটা চাঁদের সামনে থাকে, সেখানে চাঁদের প্রবল আকর্ষণে জলরাশি সবচেয়ে বেশি ফুলে ওঠে। একে মুখ্য বা প্রত্যক্ষ জোয়ার বলে। ঠিক একই সময়ে পৃথিবীর বিপরীত দিকে চাঁদের আকর্ষণ সবচেয়ে কম থাকে, কিন্তু পৃথিবীর আবর্তনের কারণে সৃষ্ট কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে সেখানে জল ফুলে ওঠে। একে গৌণ বা পরোক্ষ জোয়ার বলে।

৭. পেরিজি ও অ্যাপোজি: পৃথিবীর উপবৃত্তাকার কক্ষপথের জন্য পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব সব সময় সমান থাকে না। চাঁদ যখন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে (৩ লক্ষ ৫৬ হাজার কিমি) থাকে, তাকে পেরিজি বলে। এই সময় জোয়ার প্রবল হয়। আবার চাঁদ যখন পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে (৪ লক্ষ ৭ হাজার কিমি) থাকে, তখন তাকে অ্যাপোজি বলে। তখন জোয়ারের প্রাবল্য কম হয়।

৮. কেন্দ্রাতিগ বল (Centrifugal Force): পৃথিবী তার নিজের অক্ষের চারিদিকে প্রচণ্ড বেগে আবর্তন করছে। এই আবর্তনের ফলে পৃথিবীর পৃষ্ঠের জলরাশি বাইরের দিকে ছিটকে বেরিয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়। এই বিকর্ষণ শক্তিকেই কেন্দ্রাতিগ বল বলে। এই বলের প্রভাবেই গৌণ জোয়ারের সৃষ্টি হয়।

৯. বানডাকা (Tidal Bore): ভরা কোটালের সময় সমুদ্রের জল ফুলে উঠে জোয়ারের সৃষ্টি করলে, সেই বিপুল জলরাশি যখন ফানেল আকৃতির নদীর মোহনা দিয়ে নদীখাতে প্রবল জলোচ্ছ্বাস ও গর্জনের সৃষ্টি করে বিপরীত দিকে (উজানে) প্রবেশ করে, তখন তাকে বানডাকা বলে। যেমন— হুগলি নদীর ষাঁড়াষাঁড়ির বান।

১০. ষাঁড়াষাঁড়ির বান: বর্ষাকালে ভরা কোটালের সময় হুগলি নদীতে অত্যন্ত শক্তিশালী বানডাকা দেখা যায়। এই সময় সমুদ্রের জোয়ারের বিপুল জলরাশি এবং বর্ষার নদীর জলরাশি প্রবল বেগে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং জল ৫-৬ মিটার উঁচু হয়ে ভয়ংকর গর্জন করে নদীতে প্রবেশ করে। দুটো ষাঁড়ের লড়াইয়ের মতো এই তীব্র জলোচ্ছ্বাসকে ষাঁড়াষাঁড়ির বান বলে।

পর্ব ৩: ৫টি রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৫)

১. পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির প্রধান কারণগুলি চিত্র-সহ আলোচনা করো।

উত্তর: পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির পেছনে প্রধানত দুটি কারণ দায়ী:

 * চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ: মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। পৃথিবীর কাছের গ্রহ-উপগ্রহের মধ্যে চাঁদের দূরত্ব পৃথিবীর সবচেয়ে কম হওয়ায়, পৃথিবীর জলভাগের ওপর সূর্যের তুলনায় চাঁদের আকর্ষণ প্রায় ২.২ গুণ বেশি। পৃথিবীর যে অংশ আবর্তন করতে করতে চাঁদের ঠিক সামনে আসে, সেখানে চাঁদের আকর্ষণে জলরাশি ফুলে উঠে 'মুখ্য জোয়ার' সৃষ্টি করে। সূর্য অনেক বড় হলেও দূরে থাকায় এর প্রভাব চাঁদের চেয়ে কম।

 * পৃথিবীর আবর্তন ও কেন্দ্রাতিগ বল: পৃথিবী তার নিজের মেরুদণ্ডের ওপর পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রবল বেগে ঘুরছে। এর ফলে জলরাশির বাইরের দিকে ছিটকে যাওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়, যাকে কেন্দ্রাতিগ বা বিকর্ষণ বল বলে। পৃথিবীর যে অংশে মুখ্য জোয়ার হয়, ঠিক তার বিপরীত অংশে চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ সবচেয়ে কম থাকে। কিন্তু সেখানে কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাব বেশি থাকায় জলরাশি বাইরের দিকে ফুলে ওঠে। একে 'গৌণ জোয়ার' বলে।

   (পরীক্ষার খাতায় চাঁদ, পৃথিবীর মুখ্য জোয়ার, গৌণ জোয়ার এবং ভাটার একটি পরিষ্কার বৃত্তাকার চিত্র আঁকতে হবে)।

২. ভরা কোটাল (Spring Tide) এবং মরা কোটাল (Neap Tide) কীভাবে সৃষ্টি হয় তা ব্যাখ্যা করো।

উত্তর:

 * ভরা কোটাল সৃষ্টির প্রক্রিয়া: অমাবস্যা এবং পূর্ণিমা তিথিতে চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী মহাকাশে একই সরলরেখায় (১৮০° কোণে) অবস্থান করে (যাকে সিজিগি বলে)। অমাবস্যা তিথিতে চাঁদ থাকে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে। ফলে চাঁদ ও সূর্য দুজনেই একই দিক থেকে পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। অন্যদিকে, পূর্ণিমা তিথিতে পৃথিবী থাকে চাঁদ ও সূর্যের মাঝে। এই দুই তিথিতেই চাঁদ ও সূর্যের মিলিত ও প্রবল আকর্ষণে পৃথিবীতে জলরাশি প্রবলভাবে ফুলে ওঠে এবং শক্তিশালী জোয়ারের সৃষ্টি করে। একে ভরা কোটাল বলে।

 * মরা কোটাল সৃষ্টির প্রক্রিয়া: শুক্লপক্ষ এবং কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী সমকোণে বা ৯০° কোণে অবস্থান করে। এই সময় চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীর যে অংশে জল ফুলে উঠে জোয়ারের সৃষ্টি করে, সূর্যের আকর্ষণে ঠিক তার সমকোণে থাকা স্থানেও জল ফুলে ওঠার চেষ্টা করে। চাঁদ ও সূর্যের এই পরস্পর আড়াআড়ি আকর্ষণের কারণে জলরাশি খুব বেশি ফুলে উঠতে পারে না। এই অপেক্ষাকৃত দুর্বল জোয়ারকে মরা কোটাল বলে।

৩. কোনো স্থানে দুটি মুখ্য জোয়ারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ২৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট হয় কেন?

উত্তর: পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর একবার পশ্চিম থেকে পূর্বে আবর্তন করতে সময় নেয় ২৪ ঘণ্টা (১ সৌর দিন)। সাধারণ হিসেবে, পৃথিবীর কোনো একটি স্থান ২৪ ঘণ্টা পর আবার চাঁদের ঠিক সামনে আসার কথা এবং সেখানে মুখ্য জোয়ার হওয়ার কথা।

কিন্তু পৃথিবী যেমন নিজের অক্ষে ঘুরছে, চাঁদও তেমনি পৃথিবীর চারিদিকে তার নিজ কক্ষপথে ঘুরছে। পৃথিবীর একবার আবর্তনের সময় (২৪ ঘণ্টায়) চাঁদ তার কক্ষপথের কিছুটা পথ (প্রায় ১৩°) এগিয়ে যায়। ফলে পৃথিবীর ওই নির্দিষ্ট স্থানটিকে চাঁদের সেই নতুন অবস্থানে পৌঁছাতে অতিরিক্ত ৫২ মিনিট সময় লাগে। তাই কোনো স্থানে একটি মুখ্য জোয়ার হওয়ার ঠিক ২৪ ঘণ্টা পর আবার মুখ্য জোয়ার না হয়ে, তা ২৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট পর সংঘটিত হয়। এই কারণেই প্রতিদিন জোয়ার-ভাটা প্রায় ৫২ মিনিট দেরিতে আসে।

৪. বানডাকা কাকে বলে? বানডাকা সৃষ্টির অনুকূল ভৌগোলিক শর্তগুলি কী কী?

উত্তর:

 * বানডাকা: ভরা কোটালের সময় সমুদ্রের ফুলে ওঠা জোয়ারের জল যখন ফানেল আকৃতির চওড়া নদীর মোহনা দিয়ে প্রবল গর্জন করে উঁচু ঢেউয়ের আকারে নদীখাতের উজানের দিকে প্রবেশ করে, তখন তাকে বানডাকা (Tidal bore) বলে।

 * অনুকূল শর্তাবলি: সব নদীতে বান ডাকে না। বানডাকার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলি প্রয়োজন:

   ১. ফানেল আকৃতির মোহনা: নদীর মোহনা সমুদ্রের দিকে ফানেলের মতো চওড়া এবং ভেতরের দিকে ক্রমশ সংকীর্ণ হতে হবে, যাতে সমুদ্রের বিপুল জল সহজে ঢুকে সরু খাতে তীব্র বেগ পায়।

   ২. অগভীর নদীখাত: নদীর মোহনায় পলিজমে নদীখাত অগভীর হলে জোয়ারের জল বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উঁচু ঢেউয়ের সৃষ্টি করে।

   ৩. নদীর প্রবল স্রোত: নদীতে (বিশেষত বর্ষাকালে) জলের পরিমাণ ও স্রোত বেশি থাকলে জোয়ারের জলের সাথে তার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় এবং বান প্রবল আকার ধারণ করে।

   ৪. বায়ুপ্রবাহ: জোয়ারের দিকে অর্থাৎ সমুদ্র থেকে নদীর দিকে জোরালো বায়ু প্রবাহিত হলে বানের প্রাবল্য বৃদ্ধি পায়।

৫. মানবজীবনে জোয়ার-ভাটার সুফল ও কুফলগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: মানবজীবনে জোয়ার-ভাটার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। এর সুফল ও কুফল নিচে আলোচনা করা হলো:

 * সুফল:

   ১. নৌপরিবহনে সুবিধা: জোয়ারের সময় জলস্ফীতির কারণে নদীর নাব্যতা বেড়ে যায়, ফলে সমুদ্রের বড় বড় জাহাজ অনায়াসে নদীর ভেতরের বন্দরগুলিতে (যেমন- কলকাতা বন্দর) প্রবেশ করতে পারে।

   ২. নদীখাত পরিষ্কার: ভাটার টানে নদীর মোহনায় জমা পলি ও আবর্জনা সমুদ্রের গভীরে চলে যায়, ফলে নদীখাত পরিষ্কার ও গভীর থাকে।

   ৩. জলবিদ্যুৎ উৎপাদন: জোয়ারের জলকে কাজে লাগিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে পরিবেশবান্ধব জোয়ার-ভাটা শক্তি বা জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় (যেমন- ফ্রান্স, কানাডা, ভারতেও চেষ্টা চলছে)।

   ৪. মৎস্য আহরণ: জোয়ারের জলের সাথে প্রচুর সামুদ্রিক মাছ নদীতে চলে আসে, যা জেলেদের মাছ ধরতে সাহায্য করে।

 * কুফল:

   ১. বন্যা সৃষ্টি: বর্ষাকালে ভরা কোটালের সময় অনেক ক্ষেত্রে নদীর দুকূল ছাপিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়, যা তীরবর্তী মানুষের জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি করে।

   ২. লবণাক্ততা বৃদ্ধি: জোয়ারের লবণাক্ত জল কৃষিজমিতে বা মিষ্টি জলের পুকুরে প্রবেশ করলে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হয় এবং পানীয় জলের সংকট দেখা দেয়।

   ৩. নদীভাঙন: প্রবল জোয়ার বা বানডাকার সময় জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কায় নদীর পাড় ভেঙে যায় এবং নৌকা বা ছোট লঞ্চ ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।




অষ্টম অধ্যায়: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (Waste Management)-এর ওপর ভিত্তি করে আপনার চাওয়া ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ১০টি টীকা এবং ৫টি বড় প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো।

পর্ব ১: ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)

১. বর্জ্য পদার্থ কাকে বলে?

উত্তর: মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য বা অপ্রয়োজনীয় যে সমস্ত পরিত্যক্ত জিনিস পরিবেশে ফেলে দেওয়া হয়, তাদের বর্জ্য বলে।

২. একটি কঠিন বর্জ্যের উদাহরণ দাও।

উত্তর: প্লাস্টিকের বোতল, কাঁচের টুকরো।

৩. একটি তরল বর্জ্যের উদাহরণ দাও।

উত্তর: কারখানার দূষিত জল, নর্দমার জল।

৪. একটি গ্যাসীয় বর্জ্যের উদাহরণ দাও।

উত্তর: কারখানার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া, ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC)।

৫. একটি বিষাক্ত বর্জ্যের উদাহরণ দাও।

উত্তর: সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম।

৬. একটি বিষহীন বর্জ্যের উদাহরণ দাও।

উত্তর: শাকসবজির খোসা, কাগজের টুকরো।

৭. জৈব ভঙ্গুর (Biodegradable) বর্জ্য কাকে বলে?

উত্তর: যেসব বর্জ্য পদার্থ ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীব দ্বারা বিয়োজিত হয়ে মাটির সাথে মিশে যায়, তাদের জৈব ভঙ্গুর বর্জ্য বলে (যেমন- সবজির খোসা)।

৮. জৈব অভঙ্গুর (Non-biodegradable) বর্জ্য কাকে বলে?

উত্তর: যেসব বর্জ্য অণুজীব দ্বারা বিয়োজিত হয় না এবং দীর্ঘদিন পরিবেশে অবিকৃত অবস্থায় পড়ে থাকে, তাদের জৈব অভঙ্গুর বর্জ্য বলে (যেমন- প্লাস্টিক)।

৯. ই-বর্জ্য (E-waste) কী?

উত্তর: বাতিল বা খারাপ হয়ে যাওয়া ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিকে (যেমন- পুরোনো মোবাইল, কম্পিউটার, টিভি) ই-বর্জ্য বলে।

১০. একটি কৃষিজ বর্জ্যের নাম লেখো।

উত্তর: ধানের তুষ, খড়, কীটনাশক মিশ্রিত জল।

১১. পৌর বর্জ্য বা মিউনিসিপ্যাল বর্জ্য কোথা থেকে উৎপন্ন হয়?

উত্তর: শহর বা নগরের বাড়িঘর, বাজার ও রাস্তাঘাট থেকে (যেমন- গৃহস্থালির জঞ্জাল)।

১২. একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত (Bio-medical) বর্জ্যের নাম লেখো।

উত্তর: ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, স্যালাইনের বোতল, রক্তমাখা তুলো।

১৩. একটি তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের উদাহরণ দাও।

উত্তর: ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম (পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত)।

১৪. বর্জ্য ব্যবস্থাপনার '3R' নীতি কী?

উত্তর: Reduce (হ্রাস), Reuse (পুনর্ব্যবহার) এবং Recycle (পুনর্নবীকরণ)।

১৫. বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চতুর্থ 'R' কী?

উত্তর: Refuse (প্রত্যাখ্যান করা, যেমন- প্লাস্টিক ব্যাগ নিতে অস্বীকার করা)।

১৬. কম্পোস্টিং (Composting) কী?

উত্তর: পচনশীল জৈব বর্জ্য পদার্থকে অণুজীব দ্বারা পচিয়ে জৈব সারে পরিণত করার পদ্ধতিকে কম্পোস্টিং বলে।

১৭. ল্যান্ডফিল (Landfill) বা ভরাটকরণ কী?

উত্তর: শহরের বাইরে কোনো নিচু বা গর্তযুক্ত জায়গায় কঠিন বর্জ্য ফেলে মাটি চাপা দিয়ে জায়গাটি ভরাট করার পদ্ধতিকে ল্যান্ডফিল বলে।

১৮. ল্যান্ডফিল থেকে কোন বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়?

উত্তর: মিথেন গ্যাস।

১৯. লিচেট (Leachate) কী?

উত্তর: ল্যান্ডফিল বা বর্জ্য স্তূপের ভেতর দিয়ে বৃষ্টির জল চুঁইয়ে নিচে নামার সময় বর্জ্যের বিষাক্ত রাসায়নিক মিশে যে দূষিত তরল তৈরি হয়, তাকে লিচেট বলে।

২০. স্ক্রাবার (Scrubber) কী?

উত্তর: কারখানার চিমনি থেকে নির্গত গ্যাসীয় বর্জ্য ও ধুলিকণা শোধন করার যন্ত্রকে স্ক্রাবার বলে।

২১. স্ক্রাবার কয় প্রকার ও কী কী?

উত্তর: ২ প্রকার— শুষ্ক স্ক্রাবার ও আর্দ্র স্ক্রাবার।

২২. গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান (Ganga Action Plan) কত সালে গৃহীত হয়?

উত্তর: ১৯৮৫ সালে (গঙ্গা নদীর জল দূষণমুক্ত করার জন্য)।

২৩. তরল বর্জ্য শোধন করার পদ্ধতিকে কী বলে?

উত্তর: নিকাশি ব্যবস্থা বা ড্রেনেজ (Drainage and Treatment)।

২৪. ফ্লাই অ্যাশ (Fly ash) বা উড়ন্ত ছাই কোথা থেকে নির্গত হয়?

উত্তর: তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে।

২৫. পারদ (Mercury) দূষণের ফলে মানুষের কী রোগ হয়?

উত্তর: মিনামাটা রোগ।

২৬. ক্যাডমিয়াম দূষণের ফলে কোন রোগ হয়?

উত্তর: ইটাই-ইটাই রোগ।

২৭. আর্সেনিক দূষণের ফলে কী রোগ হয়?

উত্তর: ব্ল্যাকফুট ডিজিজ।

২৮. ফ্লুরিন দূষণের ফলে কোন রোগ হয়?

উত্তর: ফ্লুরোসিস (দাঁত ও হাড়ের ক্ষতি হয়)।

২৯. অ্যাসবেসটস দূষণের ফলে ফুসফুসে যে রোগ হয় তাকে কী বলে?

উত্তর: অ্যাসবেসটোসিস।

৩০. 'বর্জ্য পৃথকীকরণ' (Segregation) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: পচনশীল (জৈব) এবং অপচনশীল (অজৈব) বর্জ্যকে আলাদা আলাদা ডাস্টবিনে রাখা।

৩১. জৈব বা পচনশীল বর্জ্য রাখার ডাস্টবিনের রং সাধারণত কী হয়?

উত্তর: সবুজ।

৩২. অজৈব বা অপচনশীল বর্জ্য রাখার ডাস্টবিনের রং কী হয়?

উত্তর: নীল বা হলুদ।

৩৩. কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির নাম লেখো।

উত্তর: কম্পোস্টিং।

৩৪. ইউট্রোফিকেশন (Eutrophication) কেন হয়?

উত্তর: জলাশয়ে কৃষিজমির রাসায়নিক সার ও ডিটারজেন্ট মিশলে শৈবালের অতিবৃদ্ধি ঘটে, একে ইউট্রোফিকেশন বলে।

৩৫. কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে কোন দূষণ ঘটে?

উত্তর: মাটি ও জল দূষণ।

৩৬. কালো ধোঁয়ায় উপস্থিত কোন গ্যাস গ্লোবাল ওয়ার্মিং বাড়ায়?

উত্তর: কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2)।

৩৭. পশ্চিমবঙ্গের একটি বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রের নাম লেখো।

উত্তর: কলকাতার ধাপা (এখানে জৈব সার তৈরি হয়)।

৩৮. ভারত সরকারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক বর্তমান প্রকল্পের নাম কী?

উত্তর: স্বচ্ছ ভারত অভিযান (Swachh Bharat Abhiyan)।

৩৯. প্লাস্টিক পরিবেশের কী ক্ষতি করে?

উত্তর: মাটির উর্বরতা কমায় এবং জলনিকাশি ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি করে বন্যা ডাকে।

৪০. ছাঁই, স্ল্যাগ, রাসায়নিক বর্জ্য—এগুলি কোন ধরনের বর্জ্য?

উত্তর: শিল্পজাত বর্জ্য।

পর্ব ২: ১০টি টীকা (মান - ২ বা ৩)

১. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (Waste Management): বর্জ্য পদার্থের উৎপাদন হ্রাস, সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশের ক্ষতি না করে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বর্জ্যের নিষ্কাশন ও শোধন করার সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলে।

২. ই-বর্জ্য (E-waste): মানুষের ব্যবহার্য বিভিন্ন ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র, যেমন— কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, রেডিও, ব্যাটারি ইত্যাদি অকেজো বা খারাপ হয়ে গেলে যখন সেগুলিকে ফেলে দেওয়া হয়, তখন তাকে ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য বলে। এগুলি থেকে সিসা, পারদ প্রভৃতি বিষাক্ত পদার্থ পরিবেশে মেশে।

৩. চিকিৎসা বর্জ্য (Bio-medical waste): হাসপাতাল, নার্সিংহোম, প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি থেকে উৎপন্ন বর্জ্যকে চিকিৎসা বর্জ্য বলে। যেমন— ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, স্যালাইনের বোতল, রক্তমাখা তুলো, ব্যান্ডেজ, মানুষের শরীরের বর্জিত অংশ ইত্যাদি। এগুলো অত্যন্ত সংক্রামক হতে পারে।

৪. 3R নীতি (Reduce, Reuse, Recycle): বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রধান তিনটি নীতি হলো 3R।

 * Reduce (হ্রাস): অপ্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবহার কমিয়ে বর্জ্যের পরিমাণ কমানো।

 * Reuse (পুনর্ব্যবহার): ফেলে না দিয়ে কোনো জিনিসকে বারবার ব্যবহার করা (যেমন- প্লাস্টিকের বোতলে জল রাখা)।

 * Recycle (পুনর্নবীকরণ): বাতিল জিনিসকে কারখানায় গলিয়ে বা প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে নতুন জিনিস তৈরি করা (যেমন- পুরোনো কাগজ থেকে নতুন কাগজ তৈরি)।

   ৫. কম্পোস্টিং (Composting): যে পদ্ধতিতে জৈব বা পচনশীল বর্জ্য পদার্থকে (যেমন- সবজির খোসা, গাছের পাতা, গোবর) একটি গর্তে জমিয়ে রেখে ব্যাকটেরিয়া বা কেঁচোর সাহায্যে পচিয়ে জৈব সারে পরিণত করা হয়, তাকে কম্পোস্টিং বলে। এই সার কৃষিকাজে ব্যবহার করা হয়।

   ৬. ল্যান্ডফিল বা ভরাটকরণ (Landfilling): শহর বা জনবসতি থেকে দূরে কোনো নিচু জমি বা খাদে কঠিন বর্জ্য পদার্থগুলোকে স্তরে স্তরে জমা করে মাটি দিয়ে চাপা দেওয়ার প্রক্রিয়াকে ভরাটকরণ বা ল্যান্ডফিল বলে। এর ফলে নিচু জমি ভরাট হয়ে সমতল হয় এবং সেখান থেকে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

   ৭. স্ক্রাবার (Scrubber): কলকারখানার চিমনি থেকে বের হওয়া ক্ষতিকারক ধোঁয়া, বিষাক্ত গ্যাস এবং ভাসমান ধূলিকণাকে বায়ুমণ্ডলে মেশার আগে যে যন্ত্রের সাহায্যে শোধন করে আলাদা করা হয়, তাকে স্ক্রাবার বলে। এটি বায়ুদূষণ রোধে অত্যন্ত কার্যকরী।

   ৮. তেজস্ক্রিয় বর্জ্য (Radioactive Waste): পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পরমাণু অস্ত্র কারখানা বা বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার থেকে নির্গত যেসব বর্জ্য পদার্থ থেকে ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় রশ্মি (আলফা, বিটা, গামা) নির্গত হয়, তাদের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য বলে। যেমন- ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম। এগুলো ক্যানসারের মতো মারণ রোগ সৃষ্টি করে।

   ৯. বর্জ্য পৃথকীকরণ (Segregation of waste): বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রথম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো বর্জ্য পৃথকীকরণ। এর অর্থ হলো উৎসস্থলেই জৈব ভঙ্গুর (পচনশীল) এবং জৈব অভঙ্গুর (অপচনশীল) বর্জ্যকে আলাদা আলাদা পাত্রে বা ডাস্টবিনে রাখা। যেমন- পচনশীল বর্জ্য সবুজ রঙের ডাস্টবিনে এবং প্লাস্টিক বা কাঁচ নীল রঙের ডাস্টবিনে ফেলা।

   ১০. লিচেট (Leachate): ল্যান্ডফিল বা খোলা জায়গায় জমানো বর্জ্য স্তূপের ওপর বৃষ্টির জল পড়লে, সেই জল বর্জ্যের মধ্যে থাকা বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ (সিসা, ক্যাডমিয়াম ইত্যাদি) দ্রবীভূত করে চুঁইয়ে চুঁইয়ে মাটির নিচে নেমে যায়। এই বিষাক্ত দুর্গন্ধযুক্ত তরলকেই লিচেট বলে, যা ভৌমজলকে দূষিত করে।

পর্ব ৩: ৫টি রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৫)

১. বর্জ্য পদার্থের বিভিন্ন শ্রেণিবিভাগ করো এবং প্রত্যেকটির উদাহরণ দাও।

উত্তর: বর্জ্য পদার্থকে তার ভৌত অবস্থা এবং বিষাক্ততার ওপর ভিত্তি করে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়:

 * ভৌত অবস্থা অনুযায়ী (৩ প্রকার):

   ১. কঠিন বর্জ্য: যে সমস্ত বর্জ্য পদার্থ কঠিন অবস্থায় থাকে। যেমন- প্লাস্টিক, কাঁচ, লোহা, কাঠ, বাড়ির জঞ্জাল।

   ২. তরল বর্জ্য: তরল অবস্থায় থাকা বর্জ্য। যেমন- কারখানার দূষিত জল, নর্দমার জল, কীটনাশক মিশ্রিত জল।

   ৩. গ্যাসীয় বর্জ্য: বায়বীয় বা গ্যাসীয় অবস্থায় থাকা বর্জ্য। যেমন- কারখানার চিমনি ও গাড়ির সাইলেন্সার থেকে নির্গত ধোঁয়া, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড।

 * বিষাক্ততা বা প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে (৪ প্রকার):

   ১. বিষাক্ত বর্জ্য: যেসব বর্জ্য মানুষ ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে। যেমন- পারদ, সিসা, ক্যাডমিয়াম, তেজস্ক্রিয় পদার্থ।

   ২. বিষহীন বর্জ্য: যেসব বর্জ্য পরিবেশের সরাসরি কোনো মারাত্মক ক্ষতি করে না এবং পচে মাটিতে মিশে যায়। যেমন- শাকসবজির খোসা, কাগজের টুকরো।

   ৩. জৈব ভঙ্গুর বর্জ্য: যেসব বর্জ্য জীবাণু দ্বারা বিয়োজিত হয় (গাছের পাতা)।

   ৪. জৈব অভঙ্গুর বর্জ্য: যেসব বর্জ্য জীবাণু দ্বারা বিয়োজিত হয় না (প্লাস্টিক, পলিথিন)।

২. পরিবেশের (বায়ু, জল ও মাটি) ওপর বর্জ্য পদার্থের ক্ষতিকর প্রভাবগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: পরিবেশে যত্রতত্র বর্জ্য পদার্থ ফেলার ফলে বায়ুমণ্ডল, বারিমণ্ডল ও অশ্মমণ্ডল মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এর প্রভাবগুলি হলো:

 * বায়ুদূষণ: ল্যান্ডফিল বা ভাগাড়ে জমে থাকা বর্জ্য পচে মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো দুর্গন্ধযুক্ত ও ক্ষতিকারক গ্যাস বাতাসে মেশে। এছাড়া কলকারখানা ও গাড়ির গ্যাসীয় বর্জ্য (CO2, CO, SO2) বায়ুদূষণ ও বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটাচ্ছে।

 * জলদূষণ: কৃষিজমির রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, কারখানার তরল বিষাক্ত বর্জ্য এবং গৃহস্থালির নর্দমার জল সরাসরি নদী বা পুকুরে মিশে জলদূষণ ঘটাচ্ছে। ল্যান্ডফিলের লিচেট চুঁইয়ে ভূগর্ভস্থ জলকে দূষিত করে, ফলে পানীয় জলের সংকট দেখা দেয়।

 * মাটি দূষণ: প্লাস্টিক, পলিথিন, ই-বর্জ্য মাটিতে মিশে মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে। প্লাস্টিকের কারণে বৃষ্টির জল মাটিতে প্রবেশ করতে পারে না।

 * মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: দূষিত জলের কারণে কলেরা, টাইফয়েড হয়। পারদ দূষণে মিনামাটা এবং আর্সেনিক দূষণে ব্ল্যাকফুট রোগ হয়। এছাড়া বায়ুদূষণের ফলে হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৩. বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রধান পদ্ধতিগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উত্তর: পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কয়েকটি প্রধান পদ্ধতি নিচে আলোচনা করা হলো:

 * বর্জ্য পৃথকীকরণ: বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রথম কাজ হলো উৎসস্থলেই পচনশীল (জৈব) এবং অপচনশীল (প্লাস্টিক, কাঁচ) বর্জ্যকে আলাদা আলাদা ডাস্টবিনে সংগ্রহ করা।

 * ভরাটকরণ বা ল্যান্ডফিল: শহরাঞ্চলের কঠিন বর্জ্যগুলিকে শহরের বাইরে নিচু জায়গায় গর্ত করে স্তরে স্তরে জমা করে মাটি চাপা দেওয়া হয়। এতে নিচু জায়গা ভরাট হয়ে যায়।

 * কম্পোস্টিং: আলাদা করা জৈব বা পচনশীল বর্জ্যগুলিকে গর্তে জমিয়ে ব্যাকটেরিয়া বা কেঁচোর (ভার্মিকম্পোস্টিং) সাহায্যে পচিয়ে জৈব সারে পরিণত করা হয়, যা কৃষিকাজে লাগে।

 * নিকাশি ব্যবস্থা ও শোধন: তরল বর্জ্য বা নর্দমার জল সরাসরি নদীতে না ফেলে, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে তার ক্ষতিকর রাসায়নিক মুক্ত করে তারপর নদীতে ফেলা হয়।

 * স্ক্রাবার ব্যবহার: গ্যাসীয় বর্জ্য বা ধোঁয়া বাতাসে ছাড়ার আগে স্ক্রাবার যন্ত্রের সাহায্যে তার মধ্য থেকে ক্ষতিকারক গ্যাস ও ধূলিকণা আলাদা করে শোধন করা হয়।

৪. বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের (তোমার) ভূমিকা কী হওয়া উচিত তা আলোচনা করো।

উত্তর: একজন সচেতন নাগরিক ও শিক্ষার্থী হিসেবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। যেমন:

 * বর্জ্য পৃথকীকরণ: নিজের বাড়িতে এবং স্কুলে জৈব ও অজৈব বর্জ্য নির্দিষ্ট আলাদা ডাস্টবিনে ফেলার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।

 * প্লাস্টিক বর্জন: দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিক বা পলিথিন ব্যাগের বদলে পাটের বা কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে।

 * 3R নীতির প্রয়োগ: খাতার পাতা না ছিঁড়ে পুরোপুরি ব্যবহার করা (Reduce), পুরোনো জামাকাপড়, বইপত্র ফেলে না দিয়ে অন্যকে দান করা বা পুনরায় ব্যবহার করা (Reuse), এবং প্লাস্টিক বা কাগজ রিসাইকেলিংয়ের জন্য কাবাড়িওয়ালাকে দেওয়া (Recycle)।

 * সচেতনতা বৃদ্ধি: যত্রতত্র ময়লা না ফেলার জন্য নিজের পরিবার, প্রতিবেশী এবং স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং 'স্বচ্ছ ভারত অভিযান'-এর মতো পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে হবে।

৫. ভাগীরথী-হুগলি (গঙ্গা) নদীর ওপর বর্জ্য পদার্থের প্রভাব আলোচনা করো এবং গঙ্গা দূষণ রোধের একটি প্রকল্পের নাম লেখো।

উত্তর: গঙ্গা নদীর নিম্নপ্রবাহ অর্থাৎ ভাগীরথী-হুগলি নদী পশ্চিমবঙ্গের জীবনরেখা হলেও বর্জ্যের কারণে এটি চরম দূষণের শিকার। এর প্রভাবগুলি হলো:

 * শিল্প বর্জ্যের মিশ্রণ: হুগলি নদীর দুই তীরে অসংখ্য পাটকল, কাগজকল, চর্মশিল্প ও রাসায়নিক কারখানা গড়ে উঠেছে। এই কারখানাগুলোর বিষাক্ত তরল বর্জ্য কোনো শোধন ছাড়াই সরাসরি নদীতে মিশে নদীর জলকে বিষাক্ত করে তুলেছে।

 * পৌর বর্জ্য: কলকাতা, হাওড়া, শ্রীরামপুর প্রভৃতি শহরের ড্রেনের দূষিত জল, গৃহস্থালির জঞ্জাল, প্লাস্টিক সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে।

 * কৃষিজ বর্জ্য ও প্রতিমা বিসর্জন: নদীর তীরবর্তী কৃষিজমি থেকে কীটনাশক মিশ্রিত জল নদীতে মেশে। তাছাড়া বিভিন্ন উৎসবের পর প্রতিমা বিসর্জনের ফলে রং, সিসা, কাঠामো নদীতে মিশে জলদূষণ ঘটাচ্ছে।

 * নদীর নাব্যতা হ্রাস: প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য নদীতে জমায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে এবং নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে বর্ষাকালে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং মাছ ও জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটছে।

 * প্রকল্প: গঙ্গা নদীকে দূষণমুক্ত করার জন্য ভারত সরকার ১৯৮৫ সালে গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান (Ganga Action Plan) এবং ২০১৪ সালে নমামী গঙ্গে (Namami Gange) প্রকল্প গ্রহণ করেছে।



নবম অধ্যায়: ভারতের কৃষি – প্রথম পর্ব (বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ, সমস্যা ও বিশেষ কৃষি অঞ্চল)-এর ওপর ভিত্তি করে আপনার চাওয়া ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ১০টি টীকা এবং ৫টি বড় প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো।

(দ্রষ্টব্য: এই পর্বে কেবল কৃষির সাধারণ বৈশিষ্ট্য, ঋতুভিত্তিক ফসল, বিভিন্ন কৃষিজ ব্যবস্থা এবং সবুজ বিপ্লব নিয়ে আলোচনা করা হলো। বিভিন্ন ফসল যেমন— ধান, গম, চা, কফি ইত্যাদি দশম অধ্যায় বা দ্বিতীয় পর্বে থাকবে)।

পর্ব ১: ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)

১. ভারতের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি বা মেরুদণ্ড কী?

উত্তর: কৃষি।

২. ভারতের মোট শ্রমিকের প্রায় কত শতাংশ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল?

উত্তর: প্রায় ৪৮-৫০ শতাংশ (অর্ধেকের বেশি)।

৩. ভারতীয় কৃষির প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?

উত্তর: জীবিকাসত্তাভিত্তিক বা জীবনধারণভিত্তিক কৃষি (Subsistence farming)।

৪. ভারতীয় কৃষি মূলত কোন বায়ুর ওপর নির্ভরশীল?

উত্তর: দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু।

৫. যে কৃষিব্যবস্থায় কৃষকরা মূলত নিজেদের পরিবারের খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য চাষ করে, তাকে কী বলে?

উত্তর: জীবিকাসত্তাভিত্তিক কৃষি।

৬. যে কৃষিব্যবস্থায় ফসল উৎপাদনের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে বাজারে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা বা লাভ করা, তাকে কী বলে?

উত্তর: বাণিজ্যিক কৃষি (Commercial farming)।

৭. একবার বিশাল জমিতে বিপুল মূলধন বিনিয়োগ করে দীর্ঘস্থায়ী ফসল চাষ করাকে কী বলে?

উত্তর: বাগিচা কৃষি (Plantation agriculture)।

৮. ভারতে বাগিচা কৃষির সূচনা কারা করেছিল?

উত্তর: ব্রিটিশ বা ইউরোপীয়রা।

৯. ভারতের দুটি বাগিচা ফসলের নাম লেখো।

উত্তর: চা এবং কফি (এছাড়া রবার)।

১০. পাহাড়ি বা বনময় অঞ্চলে গাছপালা পুড়িয়ে ছাই করে যে প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষ হয়, তাকে কী বলে?

উত্তর: স্থানান্তর কৃষি (Shifting cultivation)।

১১. স্থানান্তর কৃষিকে উত্তর-পূর্ব ভারতে (অসম, মেঘালয়) কী বলা হয়?

উত্তর: ঝুম চাষ (Jhum)।

১২. স্থানান্তর কৃষিকে কেরালায় কী বলা হয়?

উত্তর: পোনাম (Ponam)।

১৩. স্থানান্তর কৃষিকে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশায় কী বলা হয়?

উত্তর: পডু (Podu)।

১৪. বর্ষাকালে (জুন-জুলাই মাসে) বীজ বুনে শীতের শুরুতে (নভেম্বর-ডিসেম্বর) যে ফসল কাটা হয়, তাকে কী বলে?

উত্তর: খারিফ শস্য (Kharif crop)।

১৫. একটি খারিফ শস্যের উদাহরণ দাও।

উত্তর: আমন ধান (বা পাট)।

১৬. শীতকালে (অক্টোবর-নভেম্বর মাসে) বীজ বুনে গ্রীষ্মের শুরুতে (মার্চ-এপ্রিল) যে ফসল কাটা হয়, তাকে কী বলে?

উত্তর: রবি শস্য (Rabi crop)।

১৭. একটি রবি শস্যের উদাহরণ দাও।

উত্তর: গম (বা সরিষা, আলু)।

১৮. খারিফ ও রবি শーズের মধ্যবর্তী সময়ে গ্রীষ্মকালে যে ফসলের চাষ হয়, তাকে কী বলে?

উত্তর: জায়িদ শস্য (Zaid crop)।

১৯. একটি জায়িদ শস্যের উদাহরণ দাও।

উত্তর: আউশ ধান, তরমুজ, শসা।

২০. কৃষিকাজের সাথে সাথে পশুপালন করাকে কী কৃষি বলে?

উত্তর: মিশ্র কৃষি (Mixed farming)।

২১. যেসব ফসলের ওপর নির্ভর করে শিল্পের কাঁচামাল তৈরি হয়, তাদের কী বলে?

উত্তর: শিল্পজ ফসল বা বাণিজ্যিক ফসল (যেমন- তুলা, পাট, আখ)।

২২. তন্তু ফসল (Fibre crop) কাকে বলে?

উত্তর: যেসব ফসল থেকে সুতো বা তন্তু পাওয়া যায় (যেমন- তুলা, পাট)।

২৩. পানীয় ফসল (Beverage crop) কাকে বলে?

উত্তর: যেসব ফসল পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয় (যেমন- চা, কফি)।

২৪. বৃষ্টির জলের ওপর নির্ভর করে জলসেচ ছাড়াই যে কৃষি কাজ হয় তাকে কী বলে?

উত্তর: শুষ্ক কৃষি (Dry farming) বা বৃষ্টি-নির্ভর কৃষি।

২৫. ফল, ফুল ও শাকসবজির চাষকে বিজ্ঞানের ভাষায় একসঙ্গে কী বলে?

উত্তর: উদ্যান কৃষি বা হর্টিকালচার (Horticulture)।

২৬. ফলের চাষকে কী বলে?

উত্তর: পোমোলজি (Pomology)।

২৭. ফুলের চাষকে কী বলে?

উত্তর: ফ্লোরিকালচার (Floriculture)।

২৮. শাকসবজির চাষকে কী বলে?

উত্তর: ওলেরিকালচার (Olericulture)।

২৯. ভারতে 'সবুজ বিপ্লব' (Green Revolution) কোন দশকে শুরু হয়?

উত্তর: ১৯৬০-এর দশকে (মূলত ১৯৬৬-৬৭ সালে)।

৩০. ভারতের সবুজ বিপ্লবের জনক কাকে বলা হয়?

উত্তর: ড. এম. এস. স্বামীনাথন (Dr. M. S. Swaminathan)।

৩১. বিশ্বে সবুজ বিপ্লবের জনক কে?

উত্তর: ড. নরম্যান বোরলগ (Norman Borlaug)।

৩২. সবুজ বিপ্লবের প্রভাব সবচেয়ে বেশি কোন ফসলের ওপর পড়েছিল?

উত্তর: গম (এরপর ধান)।

৩৩. সবুজ বিপ্লব ভারতের কোন কোন রাজ্যে সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছিল?

উত্তর: পাঞ্জাব ও হরিয়ানা।

৩৪. দুধ উৎপাদনের বিপুল বৃদ্ধিকে ভারতে কী বিপ্লব বলা হয়?

উত্তর: শ্বেত বিপ্লব (White Revolution) বা অপারেশন ফ্লাড (Operation Flood)।

৩৫. ভারতের শ্বেত বিপ্লবের জনক কে?

উত্তর: ড. ভার্গিস কুরিয়েন (Dr. Verghese Kurien)।

৩৬. মাছ উৎপাদনের বিপুল বৃদ্ধিকে কী বিপ্লব বলা হয়?

উত্তর: নীল বিপ্লব (Blue Revolution)।

৩৭. তৈলবীজ (সরিষা, সূর্যমুখী) উৎপাদনের বৃদ্ধিকে কী বিপ্লব বলা হয়?

উত্তর: হলুদ বিপ্লব (Yellow Revolution)।

৩৮. উচ্চ ফলনশীল বীজের (HYV) একটি উদাহরণ দাও।

উত্তর: গমের ক্ষেত্রে 'সোনালিকা', ধানের ক্ষেত্রে 'আই আর-৮' (IR-8)।

৩৯. ICAR-এর পুরো নাম কী?

উত্তর: Indian Council of Agricultural Research (ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদ)।

৪০. ভারতের কেন্দ্রীয় কৃষি গবেষণাগার কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: দিল্লির পুসায় (Pusa)।

পর্ব ২: ১০টি টীকা (মান - ২ বা ৩)

১. জীবিকাসত্তাভিত্তিক কৃষি (Subsistence Farming): ভারতে অধিকাংশ কৃষকের জমি ছোট। তারা আধুনিক যন্ত্রপাতির পরিবর্তে চিরাচরিত পদ্ধতিতে মূলত নিজেদের পরিবারের সারাবছরের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য যে কৃষিকাজ করে, তাকে জীবিকাসত্তাভিত্তিক কৃষি বলে। এই কৃষিতে ফসল বাজারে বিক্রির জন্য খুব একটা উদ্বৃত্ত থাকে না।

২. বাগিচা কৃষি (Plantation Agriculture): ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে পাহাড়ের ঢালু জমিতে একবার বিপুল পরিমাণ মূলধন ও শ্রমিক নিয়োগ করে দীর্ঘস্থায়ী যে ফসলের চাষ করা হয়, তাকে বাগিচা কৃষি বলে। ব্রিটিশ আমলে চা, কফি, রবার ইত্যাদি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এই কৃষির সূচনা হয়। এটি মূলত রপ্তানিমুখী।

৩. খারিফ শস্য (Kharif Crop): দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমনের সাথে সাথে অর্থাৎ বর্ষাকালে (জুন-জুলাই মাসে) বীজ বপন করে এবং শীতের শুরুতে (নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে) যে ফসল ঘরে তোলা হয়, তাকে খারিফ শস্য বলে। এই চাষ সম্পূর্ণ বৃষ্টির জলের ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণ— আমন ধান, পাট, তুলো।

৪. রবি শস্য (Rabi Crop): শীতকালে (অক্টোবর-নভেম্বর মাসে) জলসেচের ওপর নির্ভর করে বীজ বপন করে এবং গ্রীষ্মের শুরুতে (মার্চ-এপ্রিল মাসে) যে ফসল কাটা হয়, তাকে রবি শস্য বলে। এই শস্যের জন্য কম উষ্ণতা ও কম জলের প্রয়োজন হয়। উদাহরণ— গম, যব, আলু, সরিষা।

৫. জায়িদ শস্য (Zaid Crop): খারিফ ও রবি শস্যের মধ্যবর্তী সময়ে, অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে (মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে) জলসেচের সাহায্যে যে ফসলের চাষ হয়, তাকে জায়িদ শস্য বলে। এই সময় মূলত শাকসবজি ও ফলের চাষ হয়। উদাহরণ— আউশ ধান, তরমুজ, শসা, ঝিঙে।

৬. ঝুম চাষ (Jhum Cultivation): উত্তর-পূর্ব ভারতের (অসম, মেঘালয়) পাহাড়ি ও বনাঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতিরা বনের গাছপালা কেটে ও পুড়িয়ে ছাই করে কয়েক বছর ধরে সেখানে যে আদিম পদ্ধতিতে চাষ করে, তাকে ঝুম চাষ বা স্থানান্তর কৃষি বলে। জমির উর্বরতা কমলে তারা অন্য জায়গায় চলে যায়। এতে ব্যাপক অরণ্য ধ্বংস ও মৃত্তিকা ক্ষয় হয়।

৭. মিশ্র কৃষি (Mixed Farming): যে কৃষিব্যবস্থায় কৃষক নিজের জমিতে ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পশুপালন (যেমন- গোরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি পালন) করে তার আয় বৃদ্ধি করে, তাকে মিশ্র কৃষি বলে। পশুর মলমূত্র জমিতে জৈব সার হিসেবে কাজ করে এবং ফসলের বর্জ্য পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৮. সবুজ বিপ্লব (Green Revolution): ১৯৬০-এর দশকে ভারতে খাদ্যসংকট দূর করার জন্য ড. এম. এস. স্বামীনাথনের নেতৃত্বে উচ্চ ফলনশীল বীজ (HYV), রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও জলসেচের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিজ উৎপাদনের (বিশেষত গমের) যে অভাবনীয় ও যুগান্তকারী বৃদ্ধি ঘটে, তাকে সবুজ বিপ্লব বলে। পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় এটি সবচেয়ে সফল হয়।

৯. শ্বেত বিপ্লব (White Revolution): ১৯৭০ সালে ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (NDDB)-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. ভার্গিস কুরিয়েনের নেতৃত্বে ভারতে দুধ উৎপাদনের যে বিপুল ও যুগান্তকারী বৃদ্ধি ঘটে, তাকে শ্বেত বিপ্লব বা অপারেশন ফ্লাড বলে। গুজরাটের 'আমুল' (Amul) এই বিপ্লবের একটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

১০. হর্টিকালচার বা উদ্যান কৃষি (Horticulture): শহরাঞ্চলের বিপুল বাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য শহরের উপকণ্ঠে ছোট বা মাঝারি জমিতে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সারা বছর ধরে ফল (পোমোলজি), ফুল (ফ্লোরিকালচার) এবং শাকসবজির (ওলেরিকালচার) যে নিবিড় চাষ করা হয়, তাকে হর্টিকালচার বা উদ্যান কৃষি বলে।

পর্ব ৩: ৫টি রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৫)

১. ভারতীয় কৃষির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: ভারতের অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে কৃষি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভারতীয় কৃষির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:

 * জীবিকাসত্তাভিত্তিক কৃষি: ভারতের অধিকাংশ কৃষকের জমির পরিমাণ কম। তাই তারা ফসল উৎপাদন করে মূলত নিজেদের পরিবারের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য। ফসল বিক্রির উদ্দেশ্য এখানে গৌণ।

 * মৌসুমি বায়ুর ওপর নির্ভরশীলতা: ভারতীয় কৃষি মূলত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই মৌসুমি বায়ু ঠিক সময়ে এলে ফসল ভালো হয়, আর দেরিতে এলে বা কম বৃষ্টি হলে খরা দেখা দেয়। তাই ভারতীয় কৃষিকে 'মৌসুমি বায়ুর জুয়াখেলা' বলা হয়।

 * জনসংখ্যার বিপুল চাপ: ভারতে জনসংখ্যার বিপুল চাপের কারণে কৃষিজমির পরিমাণ মাথাপিছু খুব কম। এই সীমিত জমি থেকেই বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য জোগাড় করতে হয়।

 * খাদ্যশস্যের প্রাধান্য: খাদ্যের চাহিদা বেশি থাকায় ভারতীয় কৃষিতে বাণিজ্যিক ফসলের (চা, পাট) তুলনায় খাদ্যশস্যের (ধান, গম) চাষ বেশি করা হয়। মোট কৃষিজমির প্রায় ৭৫% অংশে খাদ্যশস্য চাষ হয়।

 * ক্ষুদ্র ও খণ্ডিত কৃষিজোত: বংশানুক্রমিক সম্পত্তি ভাগের আইনের কারণে ভারতের কৃষিজমিগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে বিভক্ত হয়ে গেছে, যার ফলে আধুনিক যন্ত্রপাতির (যেমন- ট্রাক্টর) ব্যবহার করা কঠিন হয়।

২. ভারতীয় কৃষির প্রধান সমস্যাগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: ভারতীয় কৃষিব্যবস্থা বর্তমানে একাধিক সমস্যার সম্মুখীন। প্রধান সমস্যাগুলি হলো:

 * মৌসুমি বায়ুর খামখেয়ালিপনা: ভারতের বেশিরভাগ কৃষিজমিতে জলসেচের ব্যবস্থা নেই। মৌসুমি বৃষ্টির অনিশ্চয়তা ও অসম বণ্টনের কারণে প্রায় প্রতি বছরই কৃষকদের খরা বা বন্যার মুখে পড়তে হয়।

 * জমির ক্ষুদ্র আয়তন: কৃষিজমিগুলি ছোট ও খণ্ডিত হওয়ায় সেখানে ট্রাক্টর বা হারভেস্টারের মতো আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায় না। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং লাভ কম হয়।

 * মূলধনের অভাব ও কৃষকের ঋণ: ভারতের অধিকাংশ কৃষক গরিব। উচ্চ ফলনশীল বীজ, সার ও যন্ত্রপাতি কেনার মতো পর্যাপ্ত মূলধন তাদের নেই। ফলে মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তারা সর্বস্বান্ত হয়।

 * জলসেচের অভাব: ভারতের মাত্র ৪০-৪৫% জমিতে জলসেচের সুবিধা রয়েছে। বাকি বিশাল অংশ এখনও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল।

 * অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও সংরক্ষণের অভাব: অনেক কৃষক এখনও পুরোনো ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করে। এছাড়া, উৎপন্ন ফসল সঠিকভাবে মজুত করার জন্য পর্যাপ্ত হিমঘর (Cold storage) না থাকায় প্রচুর ফসল নষ্ট হয়।

৩. খারিফ শস্য ও রবি শস্যের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করো।

উত্তর: ভারতের দুটি প্রধান কৃষিজ ঋতুভিত্তিক শস্যের পার্থক্য নিচে দেওয়া হলো:

 * বপনের সময়: খারিফ শস্য বর্ষার শুরুতে অর্থাৎ জুন-জুলাই মাসে বোনা হয়। অন্যদিকে, রবি শস্য শীতের শুরুতে অর্থাৎ অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বোনা হয়।

 * কাটার সময়: খারিফ শস্য শীতের শুরুতে (নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে) কাটা হয়। রবি শস্য গ্রীষ্মের শুরুতে (মার্চ-এপ্রিল মাসে) কাটা হয়।

 * জলের উৎস: খারিফ শস্য সম্পূর্ণ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু রবি শস্য মূলত জলসেচ এবং শীতকালীন সামান্য বৃষ্টির (পশ্চিমী ঝঞ্ঝা) ওপর নির্ভরশীল।

 * উষ্ণতা ও আর্দ্রতা: খারিফ শস্যের জন্য অধিক উষ্ণতা ও প্রচুর আর্দ্রতার প্রয়োজন হয়। রবি শস্যের জন্য কম উষ্ণতা ও শুষ্ক আবহাওয়ার প্রয়োজন হয়।

 * উদাহরণ: খারিফ শস্যের প্রধান উদাহরণ হলো আমন ধান, পাট, তুলো। রবি শস্যের প্রধান উদাহরণ হলো গম, সরিষা, আলু।

৪. ভারতে সবুজ বিপ্লবের সুফল ও কুফল (বা প্রভাব) আলোচনা করো।

উত্তর: ১৯৬০-এর দশকে শুরু হওয়া সবুজ বিপ্লবের সুফল ও কুফল দুই-ই রয়েছে:

 * সুফল (ইতিবাচক প্রভাব):

   ১. খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা: সবুজ বিপ্লবের ফলে গম ও ধানের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে ভারত খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে উদ্বৃত্ত খাদ্যের দেশে পরিণত হয় এবং বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি বন্ধ হয়।

   ২. কৃষকের আয় বৃদ্ধি: কৃষিজ উৎপাদন বাড়ায় কৃষকদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটে।

   ৩. কৃষিতে আধুনিকীকরণ: উচ্চ ফলনশীল বীজ (HYV), রাসায়নিক সার, ট্রাক্টর, পাম্পসেট ইত্যাদির ব্যবহার বৃদ্ধি পায়, যা কৃষিব্যবস্থাকে আধুনিক করে তোলে।

 * কুফল (নেতিবাচক প্রভাব):

   ১. আঞ্চলিক বৈষম্য: সবুজ বিপ্লবের প্রভাব শুধুমাত্র পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে সীমাবদ্ধ ছিল। ভারতের অন্যান্য অঞ্চল (যেমন- পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারত) এর সুবিধা পায়নি।

   ২. ফসলের বৈষম্য: সবুজ বিপ্লব মূলত গম ও ধানের উৎপাদনেই সফল হয়েছিল। ডাল, তৈলবীজ বা অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।

   ৩. পরিবেশ দূষণ: অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়েছে এবং মাটি ও জল মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। ভৌমজল অতিরিক্ত পাম্প করার ফলে জলের স্তর অনেকটা নিচে নেমে গেছে।

৫. ভারতের কৃষির ওপর মৌসুমি বায়ুর প্রভাব মূল্যায়ন করো।

উত্তর: ভারতীয় কৃষিতে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব এতটাই বেশি যে ভারতীয় কৃষিকে 'মৌসুমি বায়ুর জুয়াখেলা' বলা হয়। এর প্রভাবগুলি হলো:

 * কৃষিকাজের সূচনা: জুন মাসে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ভারতে প্রবেশ করলে বৃষ্টির জল পেয়ে খারিফ শস্যের (আমন ধান, পাট) বীজ বপন শুরু হয়। অর্থাৎ কৃষি ক্যালেন্ডার মৌসুমি বায়ুর ওপর নির্ভর করেই শুরু হয়।

 * বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা: মৌসুমি বায়ু নির্দিষ্ট সময়ে আসে না। কোনো বছর আগে এলে ফসল ভালো হয়, আবার দেরিতে এলে বীজের তলা নষ্ট হয়। আবার বর্ষাকাল আগে শেষ হয়ে গেলেও ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

 * খরা ও বন্যা: মৌসুমি বায়ু শক্তিশালী হলে অতিবৃষ্টির ফলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়, যা ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আবার দুর্বল হলে অনাবৃষ্টি বা খরার সৃষ্টি হয়, ফলে ফসল শুকিয়ে নষ্ট হয়।

 * অর্থনীতির ওঠানামা: ভারতে কৃষিজ উৎপাদন ভালো হলে কৃষকের হাতে টাকা আসে, ফলে শিল্পের উন্নতি হয় এবং বাজার চাঙ্গা হয়। তাই মৌসুমি বায়ুর বৃষ্টিপাত সরাসরি ভারতের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

 * রবি চাষে প্রভাব: মৌসুমি বায়ু ফিরে যাওয়ার সময় (প্রত্যাবর্তনকারী মৌসুমি বায়ু) বা শীতকালে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে সামান্য যে বৃষ্টিপাত হয়, তা রবি শস্য (গম) চাষের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী।




দশম অধ্যায়: ভারতের কৃষি – দ্বিতীয় পর্ব (প্রধান কৃষিজ ফসল)-এর ওপর ভিত্তি করে আপনার চাওয়া ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ১০টি টীকা এবং ৫টি বড় প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো। এই অংশে ভারতের প্রধান প্রধান ফসল (ধান, গম, চা, কফি, তুলা ও আখ)-এর চাষের পরিবেশ ও উৎপাদক অঞ্চল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

পর্ব ১: ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)

১. ভারতের প্রধান খাদ্যশস্য কোনটি?

উত্তর: ধান।

২. ধান উৎপাদনে বিশ্বে ভারতের স্থান কত?

উত্তর: দ্বিতীয় (চীনের পরেই)।

৩. ভারতের কোন রাজ্য ধান উৎপাদনে প্রথম স্থান অধিকার করে?

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গ।

৪. হেক্টর প্রতি ধান উৎপাদনে ভারতের কোন রাজ্য প্রথম?

উত্তর: পাঞ্জাব।

৫. ভারতের কেন্দ্রীয় ধান গবেষণাগার কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: ওড়িশার কটকে।

৬. 'তৃষ্ণার্ত ফসল' কোন ফসলকে বলা হয়?

উত্তর: ধানকে (কারণ ধান চাষে প্রচুর জলের প্রয়োজন হয়)।

৭. ভারতের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য কোনটি?

উত্তর: গম।

৮. গম উৎপাদনে ভারতের কোন রাজ্য প্রথম?

উত্তর: উত্তরপ্রদেশ।

৯. হেক্টর প্রতি গম উৎপাদনে ভারতের কোন রাজ্য প্রথম?

উত্তর: পাঞ্জাব।

১০. ভারতের কেন্দ্রীয় গম গবেষণাগার কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: দিল্লির পুসাতে।

১১. 'ভারতের রুটির ঝুড়ি' (Bread basket of India) কোন অঞ্চলকে বলা হয়?

উত্তর: পাঞ্জাব ও হরিয়ানা অঞ্চলকে।

১২. জোয়ার, বাজরা ও রাগি—এই তিনটি ফসলকে একত্রে কী বলে?

উত্তর: মিলেট (Millet)।

১৩. জোয়ার উৎপাদনে কোন রাজ্য প্রথম?

উত্তর: মহারাষ্ট্র।

১৪. বাজরা উৎপাদনে কোন রাজ্য প্রথম?

উত্তর: রাজস্থান।

১৫. রাগি উৎপাদনে কোন রাজ্য প্রথম?

উত্তর: কর্ণাটক।

১৬. ভারতের একটি প্রধান বাগিচা ও পানীয় ফসলের নাম লেখো।

উত্তর: চা।

১৭. চা উৎপাদনে ভারতের কোন রাজ্য প্রথম?

উত্তর: অসম (আসাম)।

১৮. সুগন্ধ ও স্বাদের জন্য ভারতের কোন চা বিশ্ববিখ্যাত?

উত্তর: দার্জিলিং চা।

১৯. ভারতের চা গবেষণাগার কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: অসমের জোরহাটে।

২০. ভারতের চা পর্ষদ (Tea Board of India) কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: কলকাতায়।

২১. কফি উৎপাদনে ভারতের কোন রাজ্য প্রথম স্থান অধিকার করে?

উত্তর: কর্ণাটক।

২২. ভারতে প্রধানত কোন দুই প্রজাতির কফি বেশি চাষ হয়?

উত্তর: অ্যারাবিকা এবং রোবাস্তা।

২৩. ভারতের কফি গবেষণাগার কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: কর্ণাটকের চিকমাগালুরে।

২৪. ভারতের কফি বোর্ড কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: বেঙ্গালুরুতে।

২৫. ইক্ষু বা আখ উৎপাদনে ভারতের কোন রাজ্য প্রথম?

উত্তর: উত্তরপ্রদেশ।

২৬. দক্ষিণ ভারতের শ্রেষ্ঠ আখ উৎপাদক রাজ্য কোনটি?

উত্তর: মহারাষ্ট্র (ফলন বেশি তামিলনাড়ুতে)।

২৭. ভারতের ইক্ষু প্রজনন কেন্দ্র (Sugarcane Breeding Institute) কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুরে।

২৮. 'রেটুন' (Ratoon) প্রথা কোন চাষের সাথে যুক্ত?

উত্তর: আখ বা ইক্ষু চাষের সাথে।

২৯. কার্পাস বা তুলা উৎপাদনে ভারতের কোন রাজ্য প্রথম?

উত্তর: গুজরাট।

৩০. তুলা চাষের জন্য কোন মৃত্তিকা সবচেয়ে বেশি উপযোগী?

উত্তর: কৃষ্ণ মৃত্তিকা বা রেগুর মাটি।

৩১. তুলা চাষের জন্য কতগুলি তুহিনমুক্ত বা বরফমুক্ত দিন প্রয়োজন?

উত্তর: কমপক্ষে ২১০ দিন।

৩২. 'বল উইভিল' (Boll weevil) পোকার আক্রমণ কোন ফসলে দেখা যায়?

উত্তর: তুলা বা কার্পাস গাছে।

৩৩. ভারতের কার্পাস গবেষণাগার কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: মহারাষ্ট্রের নাগপুরে।

৩৪. 'সোনালি তন্তু' (Golden fibre) কাকে বলা হয়?

উত্তর: পাটকে।

৩৫. পাট উৎপাদনে ভারতের কোন রাজ্য প্রথম?

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গ।

৩৬. ভারতের পাট গবেষণাগার কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরে।

৩৭. দক্ষিণ ভারতের শস্যাগার কাকে বলা হয়?

উত্তর: তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুরকে।

৩৮. 'আই আর-৮' (IR-8), 'জয়া', 'রত্না'—এগুলি কোন ফসলের উচ্চ ফলনশীল বীজ?

উত্তর: ধানের।

৩৯. 'সোনালিকা', 'কল্যাণ সোনা'—এগুলি কোন ফসলের উচ্চ ফলনশীল বীজ?

উত্তর: গমের।

৪০. মিলেট গবেষণাগার ভারতের কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: রাজস্থানের যোধপুরে।

পর্ব ২: ১০টি টীকা (মান - ২ বা ৩)

১. মিলেট (Millet): ভারতের শুষ্ক ও খরাপ্রবণ অঞ্চলে (যেখানে বৃষ্টিপাত কম এবং মাটি অনুর্বর) প্রধানত যে নিকৃষ্ট মানের খাদ্যশস্যের চাষ হয়, তাদের একত্রে মিলেট বলে। জোয়ার, বাজরা ও রাগি—এই তিনটি হলো প্রধান মিলেট জাতীয় ফসল। এটি মূলত দরিদ্র মানুষের প্রধান খাদ্য এবং পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

২. রেগুর মৃত্তিকা (Regur Soil): দাক্ষিণাত্য মালভূমির (মহারাষ্ট্র, গুজরাট) ব্যাসল্ট শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যে কালো রঙের জলধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন উর্বর মাটির সৃষ্টি হয়েছে, তাকে কৃষ্ণ মৃত্তিকা বা রেগুর মাটি বলে। এই মাটিতে কার্পাস বা তুলো চাষ সবচেয়ে ভালো হয় বলে একে 'ব্ল্যাক কটন সয়েল'ও বলা হয়।

৩. রেটুন প্রথা (Ratoon System): আখ চাষের একটি বিশেষ পদ্ধতি হলো রেটুন প্রথা। একবার আখ গাছ কাটার পর তার গোড়ার অংশটি শিকড়সহ মাটিতে রেখে দেওয়া হয়। পরের বছর ওই কাটা গোড়া থেকে যে নতুন চারা বের হয় এবং ফসল দেয়, তাকে রেটুন বলে। এতে কৃষকের চাষের খরচ ও সময় দুই-ই বাঁচে।

৪. বল উইভিল (Boll weevil): বল উইভিল হলো এক ধরনের ক্ষতিকারক পোকা, যা তুলা বা কার্পাস চাষের ব্যাপক ক্ষতি করে। এই পোকা তুলোর ফল বা 'বল' (Boll)-কে ফুটো করে ভেতরের তুলো নষ্ট করে দেয়। তাই তুলা চাষে প্রচুর কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়।

৫. ছায়াপ্রদানকারী বৃক্ষ (Shade Trees): চা এবং কফি গাছের জন্য সরাসরি প্রখর সূর্যকিরণ এবং প্রবল বাতাস অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই চা ও কফি বাগানে আসল গাছের পাশাপাশি কিছু বড় পাতাযুক্ত গাছ (যেমন- সিলভার ওক, ইপিল ইপিল) লাগানো হয়, যাতে সেগুলি চা ও কফি গাছকে ছায়া দিতে পারে। এদের ছায়াপ্রদানকারী বৃক্ষ বলে।

৬. সোনালি তন্তু (Golden Fibre): পাটকে সোনালি তন্তু বলা হয়। এর প্রধান দুটি কারণ হলো— প্রথমত, পাটের রং সোনার মতো উজ্জ্বল হলুদ; এবং দ্বিতীয়ত, ভারতের অর্থনীতিতে পাটজাত দ্রব্য (চটের বস্তা, ব্যাগ, কার্পেট) বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা (সোনার সমান মূল্য) অর্জন করা হয়।

৭. বাগিচা ফসল হিসেবে চা: ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় পাহাড়ি অঞ্চলে পাহাড়ের ঢালু জমিতে একবার বিপুল মূলধন বিনিয়োগ করে দীর্ঘস্থায়ী যে বাণিজ্যিক ফসল উৎপাদন করা হয় তাকে বাগিচা ফসল বলে। চা একটি অন্যতম প্রধান বাগিচা ফসল, কারণ চা চাষের জন্য পাহাড়ের ঢাল, প্রচুর বৃষ্টিপাত, সস্তা শ্রমিক এবং বড় বাগানের প্রয়োজন হয়।

৮. তুহিনমুক্ত দিন (Frost-free days): তুহিন বা বরফকণা তুলা গাছের বৃদ্ধির পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। তুলা গাছের পাতা ও ফল বরফকণা সহ্য করতে পারে না। তাই ভালো তুলা উৎপাদনের জন্য বছরে অন্তত ২১০ থেকে ২১৫ দিন সম্পূর্ণ তুহিনমুক্ত বা বরফমুক্ত ঝলমলে রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া থাকা আবশ্যিক।

৯. উচ্চ ফলনশীল বীজ (HYV Seeds): বিজ্ঞানাগারে গবেষণার মাধ্যমে তৈরি যে বীজ জমিতে বুনলে সাধারণ বীজের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ফসল উৎপন্ন হয় এবং রোগপোকার আক্রমণ কম হয়, তাকে উচ্চ ফলনশীল বীজ (High Yielding Variety) বলে। যেমন- গমের ক্ষেত্রে সোনালিকা এবং ধানের ক্ষেত্রে আই আর-৮।

১০. চা পর্ষদ (Tea Board): ভারতের চা শিল্পের উন্নয়ন, চা রপ্তানি বৃদ্ধি, চায়ের গুণমান নিয়ন্ত্রণ এবং চা শ্রমিকদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে ভারত সরকার ১৯৫৪ সালে যে সংস্থা গঠন করে, তাকে 'টি বোর্ড অফ ইন্ডিয়া' বা চা পর্ষদ বলে। এর সদর দপ্তর কলকাতায় অবস্থিত।

পর্ব ৩: ৫টি রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৫)

১. ভারতে ধান চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ আলোচনা করো।

উত্তর: ধান ভারতের প্রধান খাদ্যশস্য এবং এটি একটি ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ুর খারিফ ফসল। ধান চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশগুলি হলো:

 * উষ্ণতা: ধান চাষের জন্য প্রচুর উষ্ণতার প্রয়োজন। বীজ বোনার সময় ২০°C, বৃদ্ধির সময় ২৪°C এবং ধান পাকার সময় ২৭°C উষ্ণতা সবচেয়ে আদর্শ।

 * বৃষ্টিপাত: ধানকে 'তৃষ্ণার্ত ফসল' বলা হয়। ধান চাষের জন্য প্রচুর জলের প্রয়োজন হয়, তাই বার্ষিক ১০০ থেকে ২০০ সেমি বৃষ্টিপাত ধান চাষের পক্ষে উপযোগী। চারাগাছ বৃদ্ধির সময় গাছের গোড়ায় জল দাঁড়িয়ে থাকা দরকার।

 * মৃত্তিকা: নদীর পলিমাটি, ব-দ্বীপ অঞ্চলের উর্বর পলি মৃত্তিকা এবং ভারী কাদা মাটিতে (যা জল ধরে রাখতে পারে) ধান চাষ সবচেয়ে ভালো হয়।

 * ভূমিরূপ: ধানের গোড়ায় জল দাঁড়িয়ে থাকার জন্য নিচু ও সমতল জমির প্রয়োজন হয়। তবে পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটেও ধান চাষ করা যায়।

 * শ্রমিক ও মূলধন: বীজতলা তৈরি, চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার এবং ধান কাটার জন্য প্রচুর সুলভ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। এছাড়া সার ও কীটনাশক কেনার জন্য মূলধনের দরকার। (প্রধান উৎপাদক রাজ্য: পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব)।

২. ভারতে গম চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ আলোচনা করো।

উত্তর: গম ভারতের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য। এটি একটি নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুর রবি শস্য। গম চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশগুলি হলো:

 * উষ্ণতা: গম চাষের প্রথম অবস্থায় শীতল আবহাওয়া (১৫°C - ২০°C) এবং গম পাকার সময় সামান্য উষ্ণ ও রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ার (২০°C - ২৫°C) প্রয়োজন হয়।

 * বৃষ্টিপাত: গমের জন্য খুব বেশি জলের প্রয়োজন হয় না। বার্ষিক ৫০ থেকে ১০০ সেমি বৃষ্টিপাত গম চাষের পক্ষে আদর্শ। শীতকালে সামান্য বৃষ্টিপাত (পশ্চিমী ঝঞ্ঝার কারণে) গম চাষের অনেক উপকার করে।

 * মৃত্তিকা: উর্বর দোআঁশ মাটি, ভারী পলিমাটি এবং হালকা চুনযুক্ত মাটিতে গম চাষ ভালো হয়।

 * ভূমিরূপ: গম গাছের গোড়ায় জল জমলে গাছের ক্ষতি হয়। তাই জলনিকাশি ব্যবস্থাযুক্ত সামান্য ঢালু সমতল জমি গম চাষের জন্য উপযুক্ত।

 * উন্নত প্রযুক্তি: গম চাষে প্রচুর যন্ত্রপাতির ব্যবহার হয় (যেমন- ট্রাক্টর, হারভেস্টার)। তাই যান্ত্রিকীকরণ এবং উচ্চ ফলনশীল বীজ ও জলসেচের প্রয়োজন হয়। (প্রধান উৎপাদক রাজ্য: উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাব)।

৩. ভারতে চা চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ আলোচনা করো।

উত্তর: চা ভারতের প্রধান পানীয় এবং বাগিচা ফসল। চা চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশগুলি হলো:

 * উষ্ণতা: চা ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের ফসল। সারাবছর উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া চা চাষের জন্য উপযুক্ত। সাধারণত ২১°C থেকে ২৯°C উষ্ণতা চা চাষের জন্য আদর্শ।

 * বৃষ্টিপাত: চা গাছে প্রচুর জলের প্রয়োজন হয়। বার্ষিক ১৫০ থেকে ২৫০ সেমি বৃষ্টিপাত চা চাষের জন্য দরকার। সারাবছর ধরে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হলে নতুন পাতা দ্রুত গজায়।

 * ভূমিরূপ: চা গাছে প্রচুর জলের প্রয়োজন হলেও গাছের গোড়ায় জল জমলে শেকড় পচে যায়। তাই জলনিকাশি ব্যবস্থাযুক্ত পাহাড়ের ঢালু জমি চা চাষের পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী।

 * মৃত্তিকা: লৌহ ও ম্যাঙ্গানিজ যুক্ত উর্বর অম্লধর্মী দোআঁশ মাটিতে চা চাষ খুব ভালো হয়। মাটিতে হিউমাস বা জৈব পদার্থ থাকা জরুরি।

 * ছায়াপ্রদানকারী বৃক্ষ ও শ্রমিক: প্রখর রোদ থেকে চা গাছকে বাঁচাতে বাগানে বড় ছায়াপ্রদানকারী গাছ লাগানো হয়। পাতা তোলার জন্য প্রচুর নিপুণ ও সুলভ মহিলা শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। (প্রধান উৎপাদক রাজ্য: অসম, পশ্চিমবঙ্গ)।

৪. ভারতে কার্পাস বা তুলা চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ আলোচনা করো।

উত্তর: তুলা ভারতের প্রধান তন্তু ফসল এবং বস্ত্রবয়ন শিল্পের কাঁচামাল। তুলা চাষের অনুকূল পরিবেশগুলি হলো:

 * উষ্ণতা: তুলা ক্রান্তীয় অঞ্চলের ফসল। ২০°C থেকে ২৬°C উষ্ণতা তুলা চাষের জন্য আদর্শ। তুলা পাকার সময় প্রচুর সূর্যালোকের প্রয়োজন হয়।

 * বৃষ্টিপাত: তুলা চাষের জন্য মাঝারি বৃষ্টিপাত দরকার, বছরে সাধারণত ৫০ থেকে ১০০ সেমি। তবে ফল পাকার সময় আবহাওয়া সম্পূর্ণ শুষ্ক থাকা আবশ্যিক, নাহলে তুলোর রং নষ্ট হয়ে যায়।

 * তুহিনমুক্ত দিন: তুলা গাছ তুষারপাত বা তুহিন সহ্য করতে পারে না। তাই বছরে কমপক্ষে ২১০ দিন সম্পূর্ণ তুহিনমুক্ত রৌদ্রোজ্জ্বল দিন থাকা বাধ্যতামূলক।

 * মৃত্তিকা: চুন ও টাইটানিয়াম সমৃদ্ধ কালো মাটি বা কৃষ্ণ মৃত্তিকা (রেগুর মাটি) তুলা চাষের পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী। এই মাটি জল ধরে রাখতে পারে।

 * ভূমিরূপ: জলনিকাশি ব্যবস্থাযুক্ত সামান্য ঢালু সমতল জমি তুলা চাষের জন্য আদর্শ। (প্রধান উৎপাদক রাজ্য: গুজরাট, মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা)।

৫. ভারতে ইক্ষু বা আখ চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ আলোচনা করো।

উত্তর: আখ বা ইক্ষু একটি প্রধান বাণিজ্যিক ফসল, যা থেকে চিনি ও গুড় তৈরি হয়। আখ চাষের অনুকূল পরিবেশগুলি হলো:

 * উষ্ণতা: আখ ক্রান্তীয়মণ্ডলের ফসল। ২০°C থেকে ২৭°C উষ্ণতা আখ চাষের জন্য আদর্শ। তবে ফসল কাটার সময় শুষ্ক ও শীতল আবহাওয়া থাকলে আখে শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

 * বৃষ্টিপাত: আখ চাষের জন্য প্রচুর জলের প্রয়োজন। বার্ষিক ১০০ থেকে ১৫০ সেমি বৃষ্টিপাত আখ চাষের পক্ষে উপযোগী। বৃষ্টিপাত কম হলে জলসেচের ওপর নির্ভর করতে হয়।

​মৃত্তিকা: চুন ও লবণযুক্ত উর্বর দোআঁশ মাটি বা ভারী পলিমাটি ও কৃষ্ণ মৃত্তিকায় আখ চাষ ভালো হয়। মাটি জল ধরে রাখতে পারলে ফলন বাড়ে।

​ভূমিরূপ: আখ গাছের গোড়ায় জল জমলে গাছের ক্ষতি হয়। তাই জলনিকাশি ব্যবস্থাযুক্ত মৃদু ঢালু সমতল জমি আখ চাষের জন্য উপযুক্ত।

​শ্রমিক ও মূলধন: আখ কাটা এবং দ্রুত চিনি কলে পৌঁছানোর জন্য প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন। এছাড়া সার ও কীটনাশক ব্যবহারের জন্য মূলধন দরকার। (প্রধান উৎপাদক রাজ্য: উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক)।





একাদশ অধ্যায়: ভারতের পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা (Transport and Communication in India)-এর ওপর ভিত্তি করে আপনার চাওয়া ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ১০টি টীকা এবং ৫টি বড় প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো।

পর্ব ১: ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)

১. ভারতের দীর্ঘতম জাতীয় সড়ক কোনটি?

উত্তর: NH-44 (শ্রীনগর থেকে কন্যাকুমারী)।

২. ভারতের কোন শহরকে 'ভারতের প্রবেশদ্বার' (Gateway of India) বলা হয়?

উত্তর: মুম্বাই।

৩. ভারতের কোন শহরকে 'ভারতের প্রবেশদ্বার' (Gateway to East) বলা হয়?

উত্তর: কলকাতা।

৪. ভারতের প্রথম রেলপথ কত সালে এবং কোথা থেকে কোথা পর্যন্ত চালু হয়েছিল?

উত্তর: ১৮৫৩ সালে, মুম্বাই (বোম্বাই) থেকে থানে পর্যন্ত।

৫. ভারতের দীর্ঘতম রেল রুট কোনটি?

উত্তর: বিবেক এক্সপ্রেস (ডিব্রুগড় থেকে কন্যাকুমারী)।

৬. ভারতের বৃহত্তম সরকারি উদ্যোগ কোনটি?

উত্তর: ভারতীয় রেলওয়ে।

৭. ভারতের প্রথম মেট্রোরেল কোথায় চালু হয়?

উত্তর: কলকাতায় (১৯৮৪ সালে)।

৮. ভারতের কোন বন্দরকে 'সহায়ক বন্দর' হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে?

উত্তর: হলদিয়া বন্দর (কলকাতা বন্দরের সহায়ক)।

৯. ভারতের একমাত্র নদী-বন্দর কোনটি?

উত্তর: কলকাতা বন্দর।

১০. ভারতের গভীরতম বন্দর কোনটি?

উত্তর: বিশাখাপত্তনম।

১১. ভারতের শুল্কমুক্ত বা মুক্ত বাণিজ্য বন্দর কোনটি?

উত্তর: কান্ডালা।

১২. ভারতের উচ্চতম বিমানবন্দর কোনটি?

উত্তর: লাদাখের কুশোক বকুলা রিম্পোচে বিমানবন্দর (লেহ)।

১৩. ভারতের ব্যস্ততম বিমানবন্দর কোনটি?

উত্তর: ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (দিল্লি)।

১৪. ভারতের কোন জাতীয় সড়ককে 'গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড' (GT Road) বলা হয়?

উত্তর: NH-19 (পূর্বের NH-2)।

১৫. 'সোনালী চতুর্ভুজ' (Golden Quadrilateral) প্রকল্পটি কিসের সাথে যুক্ত?

উত্তর: সড়ক পরিবহণ (দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই ও কলকাতাকে যুক্তকারী)।

১৬. ভারতের দীর্ঘতম সমুদ্র সেতু কোনটি?

উত্তর: মুম্বাই ট্রান্স হারবার লিঙ্ক (অটল সেতু)।

১৭. ভারতের কোন শহরে প্রথম পাতাল রেল বা মেট্রোরেল চালু হয়?

উত্তর: কলকাতা।

১৮. ভারতের কোন বিমানবন্দরকে 'গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া' বিমানবন্দর বলা হয়?

উত্তর: মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

১৯. ভারতের কোন রাজ্যের সড়কপথের দৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি?

উত্তর: মহারাষ্ট্র।

২০. ভারতের কোন রাজ্যের সড়কপথের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি?

উত্তর: কেরালা।

২১. ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ড কত সালে গঠিত হয়?

উত্তর: ১৯০৫ সালে।

২২. ভারতের কোন রেলওয়ে রুটটি ইউনেস্কো (UNESCO) ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পেয়েছে?

উত্তর: দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (DHR)।

২৩. 'কোঙ্কন রেলওয়ে' (Konkan Railway) কোন দুটি স্থানের মধ্যে যুক্ত?

উত্তর: মহারাষ্ট্রের রোহা থেকে কর্ণাটকের ম্যাঙ্গালোর পর্যন্ত।

২৪. কোঙ্কন রেলওয়ের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার কে ছিলেন?

উত্তর: ই. শ্রীধরন (ভারতের মেট্রো ম্যান)।

২৫. ভারতের প্রধান অভ্যন্তরীণ জলপথ কোনটি?

উত্তর: গঙ্গা নদী (জাতীয় জলপথ-১)।

২৬. ভারতের দীর্ঘতম জাতীয় জলপথ কোনটি?

উত্তর: জাতীয় জলপথ-১ (হলদিয়া থেকে এলাহাবাদ)।

২৭. ভারতের কোন বন্দরকে 'প্রাচ্যের ভেনিস' বলা হয়?

উত্তর: কোচি।

২৮. ভারতের একমাত্র প্রাকৃতিক পোতাশ্রয়যুক্ত বন্দর কোনটি?

উত্তর: মুম্বাই।

২৯. কোন বন্দরটি লোহা আকরিক রপ্তানির জন্য বিখ্যাত?

উত্তর: মার্মাগাঁও (গোয়া)।

৩০. ভারতের কোন বন্দরটি কফি রপ্তানির জন্য বিখ্যাত?

৩১. ভারতের কোন বন্দরটি কৃত্রিম বন্দর?

উত্তর: চেন্নাই।

৩২. 'উড়ান' (UDAN - Ude Desh ka Aam Nagrik) প্রকল্প কীসের সাথে যুক্ত?

উত্তর: বিমান পরিবহণ।

৩৩. ভারতের দীর্ঘতম দীর্ঘস্থায়ী সড়ক সুড়ঙ্গ কোনটি?

উত্তর: চেনি-নাশরি সুড়ঙ্গ (শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি সুড়ঙ্গ)।

৩৪. বর্তমানে ভারতের কয়টি রেলওয়ে জোন রয়েছে?

উত্তর: ১৮টি।

৩৫. ভারতের কোন শহরে রেল জাদুঘর আছে?

উত্তর: দিল্লি।

৩৬. কয়লা পরিবহণের জন্য ভারতের কোন বন্দরটি পরিচিত?

উত্তর: পারাদ্বীপ (ওড়িশা)।

৩৭. ভারতের দীর্ঘতম রেল সেতু কোনটি?

উত্তর: বগিবিল সেতু (ব্রহ্মপুত্র নদ)।

৩৮. 'ভারতের সিলিকন ভ্যালি' কোন শহরকে বলা হয়?

উত্তর: বেঙ্গালুরু।

৩৯. ডাক আদান-প্রদান ব্যবস্থার পিন কোড (PIN) ব্যবস্থা কত সালে চালু হয়?

উত্তর: ১৯৭২ সালে।

৪০. ভারতের বৃহত্তম জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ কে?

উত্তর: NHAI (National Highways Authority of India)।

পর্ব ২: ১০টি টীকা (মান - ২ বা ৩)

১. সোনালী চতুর্ভুজ (Golden Quadrilateral): ভারতের প্রধান চারটি মহানগর—দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই এবং কলকাতাকে যুক্ত করার জন্য প্রায় ৫,৮৪৬ কিমি দীর্ঘ যে চার ও ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ে বা জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে, তাকে সোনালী চতুর্ভুজ বলে। এটি ভারতের পরিবহণ ব্যবস্থায় বিপ্লব এনেছে।

২. কোঙ্কন রেলওয়ে (Konkan Railway): ভারতের পশ্চিম উপকূলে মহারাষ্ট্রের রোহা থেকে কর্ণাটকের ম্যাঙ্গালোর পর্যন্ত আরব সাগর ও পশ্চিমঘাট পর্বতের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে ৭৬০ কিমি দীর্ঘ এই রেলপথটি নির্মাণ করা হয়েছে। এটি আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর এক বিস্ময়, যা বহু সুড়ঙ্গ ও সেতুর মধ্য দিয়ে গিয়েছে।

৩. ই-মেইল (E-mail): বর্তমান যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থার সবচেয়ে দ্রুততম মাধ্যম হলো ইলেকট্রনিক মেল বা ই-মেইল। এটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে লিখিত বার্তা ও তথ্য আদান-প্রদান করতে সাহায্য করে।

৪. জাতীয় জলপথ-১ (National Waterway-1): গঙ্গা নদীর ওপর এলাহাবাদ থেকে হলদিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ১৬২০ কিমি দীর্ঘ ভারতের দীর্ঘতম অভ্যন্তরীণ জলপথ। এটি যাত্রী ও পণ্য পরিবহণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৫. স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ: আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ হলো কৃত্রিম উপগ্রহ। এটি আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রেডিও, টেলিভিশন সম্প্রচার, মোবাইল যোগাযোগ, জিপিএস (GPS) এবং সামরিক নজরদারিতে সাহায্য করে। (ভারতের ইনস্যাট - INSAT সিরিজ)।

৬. হিমপ্রাচীর (সড়কপথের ক্ষেত্রে): পাহাড়ি অঞ্চলে রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিধস একটি প্রধান সমস্যা। বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলে রাস্তা রক্ষায় গ্যালারি বা সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়, যাকে অনেক সময় রূপক অর্থে হিমপ্রাচীর বা রাস্তা রক্ষা কবচ বলা হয়। (মূলত সুড়ঙ্গ বা টানেল)।

৭. বন্দর (Port): সমুদ্রের তীরে যে স্থানে জাহাজগুলি নোঙর করে, পণ্য খালাস বা বোঝাই করে এবং যাত্রী নামায় বা তোলে, তাকে বন্দর বলে। ভারতের অর্থনীতিতে মুম্বাই, কলকাতা, চেন্নাই বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৮. মেট্রোরেল (Metro Rail): ঘনবসতিপূর্ণ শহরে দ্রুত যাতায়াতের জন্য ভূগর্ভস্থ বা উড়ালপথে যে দ্রুতগতিসম্পন্ন রেল ব্যবস্থা থাকে, তাকে মেট্রোরেল বলে। ১৯৮৪ সালে কলকাতায় ভারতের প্রথম মেট্রোরেল চালু হয়, যা শহরের যানজট কমাতে সাহায্য করেছে।

৯. হেলিকপ্টার পরিষেবা (Pawan Hans): পাহাড়ি অঞ্চল, দুর্গম এলাকা বা যেখানে বিমানবন্দর নেই, সেখানে দ্রুত যাতায়াত ও জরুরি পরিষেবার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। ভারতে 'পবন হংস' লিমিটেড এই পরিষেবা প্রদান করে।

১০. পিন (PIN - Postal Index Number): ভারতে ডাক ব্যবস্থা দ্রুত করার জন্য ১৯৭২ সালে ৬ সংখ্যার একটি বিশেষ কোড ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ফলে চিঠিপত্র বা পার্সেল ভুল ঠিকানায় না গিয়ে খুব দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে।

পর্ব ৩: ৫টি রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৫)

১. ভারতের পরিবহণ ব্যবস্থার প্রধান মাধ্যমগুলি কী কী? সড়কপথের সুবিধা ও অসুবিধা আলোচনা করো।

উত্তর: ভারতে মূলত চারটি মাধ্যম পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে—সড়কপথ, রেলপথ, জলপথ ও আকাশপথ।

 * সড়কপথের সুবিধা:

   ১. সড়কপথের মাধ্যমে খুব সহজে বাড়ি বাড়ি বা দুয়ারে দুয়ারে পণ্য ও যাত্রী পৌঁছে দেওয়া যায়।

   ২. কম দূরত্বে পরিবহণের জন্য সড়কপথ সবচেয়ে সুবিধাজনক ও দ্রুত।

   ৩. পাহাড়ি বা প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকায় রেলপথের তুলনায় সড়কপথ নির্মাণ করা সহজ।

 * সড়কপথের অসুবিধা:

   ১. দীর্ঘ দূরত্বের জন্য সড়কপথ সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

   ২. বর্ষাকালে রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।

   ৩. দুর্ঘটনার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

   ৪. যানজট একটি বড় সমস্যা।

২. ভারতীয় রেলওয়ের সমস্যাগুলি কী কী?

উত্তর: ভারতীয় রেলওয়ে বিশ্বের বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্কের অন্যতম হলেও কিছু সমস্যার সম্মুখীন:

 * যানজট বা ভিড়: জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় ট্রেনে সবসময় প্রচণ্ড ভিড় থাকে, যা আরামদায়ক নয়।

 * পুরোনো পরিকাঠামো: অনেক রেললাইন ও সিগন্যাল ব্যবস্থা এখনও পুরোনো এবং সেকেলে। এর ফলে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে।

 * দেরি হওয়া: ট্রেন নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছাতে পারে না, যা যাত্রী পরিবহণে সমস্যা সৃষ্টি করে।

 * আর্থিক সংকট: রেলের টিকিটের দাম অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মেটাতে পারে না, ফলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

 * দুর্ঘটনা: সিগন্যাল গোলযোগ, লাইনে ফাটল বা মানুষের অসাবধানতার কারণে প্রায়শই ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটছে।

৩. ভারতের জলপথ পরিবহণের গুরুত্ব আলোচনা করো।

উত্তর: জলপথ হলো পরিবহণের সবচেয়ে প্রাচীন ও সস্তা মাধ্যম। এর গুরুত্ব অপরিসীম:

 * সাশ্রয়ী: জলপথ পরিবহণ খরচ রেল বা সড়কপথের তুলনায় অনেক কম।

 * ভারী পণ্য পরিবহণ: কয়লা, খনিজ তেল, লোহা বা ভারী ভারী মেশিনারি পণ্য জাহাজে করে খুব সহজে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানো যায়।

 * আন্তর্জাতিক বাণিজ্য: ভারতের ৯৫% আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। বন্দরগুলোই ভারতের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র।

 * পরিবেশবান্ধব: জলপথ পরিবহণে দূষণ অনেক কম হয়।

 * পর্যটন ও যোগাযোগ: নদীপথ বা উপকূলীয় জলপথগুলি অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ রক্ষা করে এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশে সাহায্য করে।

৪. ভারতে বিমান পরিবহণের সুবিধা ও অসুবিধাগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: বিমান পরিবহণ হলো আধুনিক দ্রুততম মাধ্যম:

 * সুবিধা:

   ১. এটি সবচেয়ে দ্রুতগামী মাধ্যম, খুব কম সময়ে হাজার হাজার কিমি পথ অতিক্রম করা যায়।

   ২. দুর্গম পাহাড়ি, মরুভূমি বা দ্বীপ অঞ্চলে যেখানে অন্য কোনো মাধ্যম পৌঁছাতে পারে না, সেখানে বিমান পৌঁছাতে পারে।

   ৩. জরুরি মুহূর্তে (যেমন- যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে) ত্রাণ ও খাদ্য পৌঁছে দিতে বিমান অপরিহার্য।

 * অসুবিধা:

   ১. বিমান পরিবহণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে।

   ২. আবহাওয়া খারাপ হলে বিমান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়।

   ৩. বিমানবন্দর তৈরির খরচ আকাশচুম্বী।

৫. যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের গুরুত্ব আলোচনা করো।

উত্তর: আধুনিক বিশ্বে স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ ছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা কল্পনা করা যায় না:

 * মোবাইল ও ইন্টারনেট: আমাদের হাতে থাকা স্মার্টফোন, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইন্টারনেট যোগাযোগ স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল।

 * রেডিও ও টেলিভিশন: বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের খেলা বা খবর ঘরে বসে সরাসরি (Live) দেখা বা শোনার জন্য স্যাটেলাইট অপরিহার্য।

 * আবহাওয়ার পূর্বাভাস: ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা সুনামির খবর আগেভাগে জেনে সতর্ক হওয়ার জন্য স্যাটেলাইটের তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 * জিপিএস (GPS): রাস্তা চেনা, অবস্থান নির্ণয় (Google Maps) বা সামরিক নজরদারিতে জিপিএস-এর ভূমিকা অপরিসীম।

 * শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: দূরশিক্ষণ এবং টেলি-মেডিসিনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রামে বসে শহরের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার জন্য স্যাটেলাইট ব্যবহৃত হয়।




দ্বাদশ অধ্যায়: উপগ্রহ চিত্র ও বৈচিত্র্য সূচক মানচিত্র (Satellite Imagery and Topographical Map)-এর ওপর ভিত্তি করে আপনার চাওয়া ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন, ১০টি টীকা এবং ৫টি বড় প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো।

পর্ব ১: ৪০টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ১)

১. টোপোগ্রাফিক্যাল ম্যাপ (Topographical Map) বা ভূবৈচিত্র্যসূচক মানচিত্র কে তৈরি করে?

উত্তর: সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (Survey of India)।

২. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রের অপর নাম কী?

উত্তর: সামরিক মানচিত্র (Ordnance Map)।

৩. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে সমোন্নতি রেখা বা কন্টৌর লাইন (Contour Line)-এর রং কী হয়?

উত্তর: বাদামী (Brown)।

৪. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে স্থায়ী বসতি বা বাড়িগুলি কোন রঙে দেখানো হয়?

উত্তর: লাল (Red) রঙে।

৫. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে বনভূমি বা অরণ্য কোন রঙে দেখানো হয়?

উত্তর: সবুজ (Green) রঙে।

৬. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে কৃষিভূমি কোন রঙে দেখানো হয়?

উত্তর: হলুদ (Yellow) রঙে।

৭. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে জলভাগ (নদী, পুকুর, সমুদ্র) কোন রঙে দেখানো হয়?

উত্তর: নীল (Blue) রঙে।

৮. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে মালভূমি বা সমভূমি অঞ্চলের সমন্বতি রেখার ব্যবধানকে কী বলে?

উত্তর: কন্টৌর ইন্টারভাল বা সমোন্নতি ব্যবধান (Contour Interval)।

৯. উপগ্রহ চিত্র (Satellite Imagery) প্রস্তুত করতে কোন যন্ত্রের সাহায্য নেওয়া হয়?

উত্তর: সেন্সর (Sensor)।

১০. উপগ্রহ চিত্রে যে ক্ষুদ্রতম একক বা বিন্দু দেখা যায়, তাকে কী বলে?

উত্তর: পিক্সেল (Pixel)।

১১. পিক্সেলের আকার ছোট হলে উপগ্রহ চিত্রের স্পষ্টতা বা রেজোলিউশন কেমন হয়?

উত্তর: রেজোলিউশন খুব ভালো বা পরিষ্কার হয় (High Resolution)।

১২. রিমোট সেন্সিং (Remote Sensing) বা দূরসংবেদন কথার অর্থ কী?

উত্তর: দূর থেকে কোনো বস্তুর স্পর্শ না করে তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।

১৩. দূরসংবেদনের প্রধান উৎস কী?

উত্তর: সূর্য (সৌরশক্তি)।

১৪. রিমোট সেন্সিং বা দূরসংবেদন কয় প্রকার ও কী কী?

উত্তর: ২ প্রকার (সক্রিয় বা Active এবং নিষ্ক্রিয় বা Passive)।

১৫. একটি নিষ্ক্রিয় সেন্সরের (Passive Sensor) উদাহরণ দাও।

উত্তর: ক্যামেরা (যা সূর্যের আলোর ওপর নির্ভর করে)।

১৬. একটি সক্রিয় সেন্সরের (Active Sensor) উদাহরণ দাও।

উত্তর: রেডার (Radar)।

১৭. যে সমস্ত উপগ্রহ পৃথিবীর চারিদিকে পশ্চিম থেকে পূর্বে পৃথিবীর আবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ঘোরে, তাদের কী বলে?

উত্তর: ভূস্থির উপগ্রহ (Geostationary Satellite)।

১৮. ভূস্থির উপগ্রহগুলি পৃথিবী থেকে কত উচ্চতায় অবস্থান করে?

উত্তর: প্রায় ৩৬,০০০ কিমি উচ্চতায়।

১৯. ভারতের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহের নাম কী?

উত্তর: আর্যভট্ট (Aryabhata)।

২০. ভারতের রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট বা IRS সিরিজের উপগ্রহগুলি কোন কক্ষপথে ঘোরে?

উত্তর: সূর্য সমলয় কক্ষপথে (Sun-synchronous orbit)।

২১. সূর্য সমলয় উপগ্রহগুলি সাধারণত কত উচ্চতায় অবস্থান করে?

উত্তর: প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ কিমি উচ্চতায়।

২২. ফ্ল্যালস কালার কম্পোজিট বা FCC-তে উদ্ভিদের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে কোন রঙে দেখানো হয়?

উত্তর: লাল রঙে।

২৩. FCC-তে জলের উপস্থিতি কোন রঙে দেখানো হয়?

উত্তর: গাঢ় নীল বা কালো রঙে।

২৪. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের জালকে কী বলে?

উত্তর: গ্রিড বা গ্রaticule।

২৫. ভারতের একটি আবহাওয়া সংক্রান্ত উপগ্রহের নাম লেখো।

উত্তর: কল্পনা-১ (Kalpana-1) বা ইনস্যাট (INSAT)।

২৬. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রের সূচক বা ইনডেক্স নম্বর কিসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়?

উত্তর: অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের বিস্তৃতির ওপর।

২৭. ১০ লক্ষতম বা ১০L সিরিজের মানচিত্রের স্কেল কত হয়?

উত্তর: ১ : ১,০০০,০০০ (Million Sheet)।

২৮. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে ক্ষারক বা সমন্বতি রেখাগুলি কাছাকাছি থাকলে সেখানে ভূপ্রকৃতি কেমন বোঝায়?

উত্তর: খাড়া ঢাল (Steep slope)।

২৯. সমন্বতি রেখাগুলি অনেক দূরে দূরে থাকলে সেখানে ঢাল কেমন হয়?

উত্তর: মৃদু ঢাল (Gentle slope)।

৩০. কোন মানচিত্রের সাহায্যে ভারতের কোনো নির্দিষ্ট জেলার নিখুঁত পাহাড়ি ও সমতল ভূপ্রকৃতি বোঝা যায়?

উত্তর: টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রের সাহায্যে।

৩১. জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (GIS)-এর মূল কাজ কী?

উত্তর: ভৌগোলিক উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও মানচিত্র প্রস্তুত করা।

৩২. গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (GPS)-এর সাহায্যে মূলত কী নির্ণয় করা হয়?

উত্তর: ভূপৃষ্ঠে কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর সঠিক অবস্থান (অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ ও উচ্চতা)।

৩৩. রিমোট সেন্সিং-এ ক্যামেরার পরিবর্তে কী ব্যবহার করা হয়?

উত্তর: স্ক্যানার বা সেন্সর।

৩৪. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে কাঁচা রাস্তা কোন রঙে দেখানো হয়?

উত্তর: লাল রঙের ভাঙা রেখা (Red dotted line)।

৩৫. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে রেলপথ কোন রঙে দেখানো হয়?

উত্তর: কালো রঙের রেখা (Black line)।

৩৬. আইআরএস (IRS) কথার পুরো অর্থ কী?

উত্তর: Indian Remote Sensing Satellite।

৩৭. স্যাটেলাইট চিত্র তোলার জন্য কোন আলোর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়?

উত্তর: দৃশ্যমান আলো ও অবলোহিত রশ্মি (Infrared)।

৩৮. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে নদী বা খালের শুকনো বিছানা কোন রঙে দেখানো হয়?

উত্তর: কালো রঙের রেখা।

৩৯. রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির জনক বা প্রথম ব্যবহার কে করেন?

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিমান থেকে ছবি তোলার মাধ্যমে এর ব্যাপক প্রচলন হয়।

৪০. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে সমন্বতি রেখাগুলির মান কোন এককে লেখা হয়?

উত্তর: মিটারে (সমুদ্রতল থেকে উচ্চতা)।

পর্ব ২: ১০টি টীকা (মান - ২ বা ৩)

১. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র (Topographical Map): যে মানচিত্রে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি (পাহাড়, নদী, মালভূমি) এবং মানবসৃষ্ট উপাদানগুলি (বসতি, রাস্তাঘাট, রেলপথ) নির্দিষ্ট স্কেল ও প্রতীকের সাহায্যে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়, তাকে টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র বলে। একে সামরিক মানচিত্রও বলা হয়।

২. রিমোট সেন্সিং বা দূরসংবেদন (Remote Sensing): কোনো বস্তুকে সরাসরি স্পর্শ না করে দূর থেকে (উপগ্রহ বা বিমান থেকে সেন্সরের সাহায্যে) তার সম্পর্কে তথ্য বা ছবি সংগ্রহ করার বিজ্ঞানসম্মত প্রযুক্তিকে রিমোট সেন্সিং বলে। এটি বর্তমান ভূগোলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতি।

৩. পিক্সেল (Pixel): উপগ্রহ চিত্রের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম একক বা বিন্দুকে পিক্সেল (Picture Element) বলে। একটি উপগ্রহ চিত্র অসংখ্য পিক্সেলের সমন্বয়ে গঠিত হয়। পিক্সেলের আকার যত ছোট হয়, উপগ্রহ চিত্রের রেজোলিউশন বা স্পষ্টতা তত বেশি হয়।

৪. ফ্ল্যালস কালার কম্পোজিট বা FCC: উপগ্রহ চিত্রে বিভিন্ন বস্তুকে বোঝানোর জন্য কৃত্রিম বা অসত্য রঙের ব্যবহার করা হয়, যাকে FCC বলে। যেমন— এই চিত্রে স্বাস্থ্যবান উদ্ভিদকে লাল রঙে, জলভাগকে নীল বা কালো রঙে এবং জনবসতি বা খোলা জমিকে নীলচে-ধূসর রঙে দেখানো হয়।

৫. ভূস্থির উপগ্রহ (Geostationary Satellite): যে সমস্ত কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবীর আবর্তনের দিক ও গতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে (পশ্চিম থেকে পূর্বে ২৪ ঘণ্টায় একবার ঘুরে) পৃথিবীর সাপেক্ষে মহাশূন্যে একই স্থানে স্থির থাকে বলে মনে হয়, তাদের ভূস্থির উপগ্রহ বলে (যেমন- ইনস্যাট)। এগুলি প্রায় ৩৬,০০০ কিমি উচ্চতায় থাকে এবং আবহাওয়ার খবরে ব্যবহৃত হয়।

৬. সূর্য সমলয় উপগ্রহ (Sun-synchronous Satellite): যে উপগ্রহগুলি মেরু বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে পোলারি অরবিটে ঘোরে এবং প্রতিদিন ঠিক একই সময়ে পৃথিবীর একই অংশের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে, তাদের সূর্য সমলয় উপগ্রহ বলে (যেমন- IRS সিরিজ)। এগুলি প্রায় ৮০০ কিমি উচ্চতায় থেকে ভূপৃষ্ঠের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরিতে সাহায্য করে।

৭. সমোন্নতি রেখা বা কন্টৌর লাইন (Contour Line): মানচিত্রে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সমান উচ্চতাবিশিষ্ট স্থানগুলিকে যে কাল্পনিক রেখা দ্বারা যুক্ত করা হয়, তাকে সমোন্নতি রেখা বলে। টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে এই রেখাগুলি বাদামী রঙে আঁকা থাকে এবং এর মাধ্যমেই পাহাড়ি অঞ্চলের উচ্চতা ও ঢাল বোঝা যায়।

৮. সমোন্নতি ব্যবধান বা কন্টৌর ইন্টারভাল (Contour Interval): টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে পাশাপাশি অবস্থিত দুটি সমোন্নতি রেখার মধ্যকার উচ্চতার লম্বালম্বি পার্থক্যকে সমোন্নতি ব্যবধান বলে। এই ব্যবধান সমগ্র মানচিত্রের জন্য নির্দিষ্ট থাকে (যেমন- ২০ মিটার)।

৯. জিপিএস (GPS - Global Positioning System): মহাশূন্যে অবস্থিত কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে ভূপৃষ্ঠের যেকোনো স্থানের নিখুঁত ভৌগোলিক অবস্থান (অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ, উচ্চতা) এবং সঠিক সময় নির্ণয় করার ব্যবস্থাকে জিপিএস বলে। বর্তমান যুগে নেভিগেশন বা রাস্তা খুঁজতে এটি বহুল ব্যবহৃত হয়।

১০. জিআইএস (GIS - Geographic Information System): কম্পিউটার সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের সাহায্যে ভৌগোলিক উপাত্ত বা ডেটা সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং মানচিত্রের আকারে প্রকাশ করার আধুনিক ব্যবস্থাকে GIS বলে। এর মাধ্যমে খুব সহজেই মানচিত্র তৈরি এবং পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়।

পর্ব ৩: ৫টি রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান - ৫)

১. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র এবং উপগ্রহ চিত্রের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র এবং উপগ্রহ চিত্র উভয়ই ভৌগোলিক তথ্য পেতে সাহায্য করলেও এদের মধ্যে বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে:

 * প্রস্তুতির মাধ্যম: টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র হাতে এঁকে এবং সার্ভে বা জরিপ কাজের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। অন্যদিকে, উপগ্রহ চিত্র কৃত্রিম উপগ্রহে অবস্থিত সেন্সর ও ক্যামেরার সাহায্যে তোলা হয়।

 * নির্ভরযোগ্যতা ও সময়: টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র একবার তৈরি হলে তা পরিবর্তন করতে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু উপগ্রহ চিত্র অত্যন্ত কম সময়ে (রিয়েল টাইম বা রিয়েল ডেটায়) বর্তমান মুহূর্তের সঠিক ছবি তুলে ধরতে পারে।

 * প্রতীক ও রং: টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে নির্দিষ্ট প্রথাগত প্রতীক ও রঙ (যেমন- লাল, সবুজ, নীল) ব্যবহার করে তথ্য দেখানো হয়। অন্যদিকে, উপগ্রহ চিত্রে সেন্সরের মাধ্যমে সংগৃহীত তরঙ্গকে FCC বা কৃত্রিম রঙের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়।

 * ব্যাপ্তি ও পরিসর: টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র একটি নির্দিষ্ট ছোট অঞ্চলের বা জেলার детаল তথ্য দেয়। কিন্তু উপগ্রহ চিত্রের মাধ্যমে একটি বিশাল দেশ বা মহাদেশের সামগ্রিক ছবি একসঙ্গে দেখা সম্ভব।

 * ব্যবহার: টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র সামরিক বাহিনী ও ট্র্যাকিংয়ে ব্যবহৃত হয়। উপগ্রহ চিত্র আবহাওয়া পূর্বাভাস, বনভূমি পর্যবেক্ষণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বেশি ব্যবহৃত হয়।

২. দূরসংবেদন (Remote Sensing) বা রিমোট সেন্সিং প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করে তা সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: রিমোট সেন্সিং বা দূরসংবেদন হলো দূর থেকে কোনো বস্তুকে স্পর্শ না করে তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের প্রযুক্তি। এই প্রক্রিয়াটি প্রধানত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:

 * শক্তির উৎস: রিমোট সেন্সিং প্রক্রিয়ার মূল শক্তির উৎস হলো সূর্য। সূর্যরশ্মি বা সৌরশক্তি ভূপৃষ্ঠে এসে পড়ে। (সক্রিয় সেন্সরের ক্ষেত্রে সেন্সর নিজেই শক্তি প্রেরণ করে)।

 * শক্তি শোষণ ও প্রতিফলন: সূর্যের আলো যখন ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন বস্তু (যেমন- গাছপালা, জল, বাড়ি, মাটি) ওপর পড়ে, তখন বস্তুগুলি সেই আলোর কিছু অংশ শোষণ করে এবং বাকি অংশ প্রতিফলিত করে আকাশে ফিরিয়ে দেয়।

 * তথ্য ধারণ বা সেন্সর: মহাশূন্যে কৃত্রিম উপগ্রহে স্থাপিত বিশেষ সেন্সর বা স্ক্যানার এই প্রতিফলিত রশ্মি বা শক্তিকে ধরে বা রেকর্ড করে। একে ডেটা রেকর্ডিং বলে।

 * সংকেত প্রেরণ: সেন্সর দ্বারা সংগৃহীত এই তথ্যগুলিকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে পৃথিবীর বুকে অবস্থিত গ্রাউন্ড স্টেশন বা রিসিভিং স্টেশনে পাঠানো হয়।

 * চিত্র ও মানচিত্র তৈরি: স্টেশনের কম্পিউটার এই সংকেতগুলি বিশ্লেষণ করে ডিজিটাল উপগ্রহ চিত্র বা মানচিত্র তৈরি করে, যা আবহাওয়া, কৃষি বা বনভূমি গবেষণায় ব্যবহার করা হয়।

৩. ভূস্থির উপগ্রহ এবং সূর্য সমলয় উপগ্রহের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করো।

উত্তর: মহাকাশে ব্যবহৃত প্রধান দুই প্রকার কৃত্রিম উপগ্রহ হলো ভূস্থির উপগ্রহ এবং সূর্য সমলয় উপগ্রহ। এদের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:

 * উচ্চতা: ভূস্থির উপগ্রহগুলি পৃথিবী থেকে অনেক উঁচুতে (প্রায় ৩৬,০০০ কিমি উচ্চতায়) অবস্থান করে। অন্যদিকে, সূর্য সমলয় উপগ্রহগুলি অনেক কম উচ্চতায় (প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ কিমি উচ্চতায়) অবস্থান করে।

 * ঘূর্ণন বেগ ও দিক: ভূস্থির উপগ্রহগুলি পৃথিবীর আবর্তনের দিক ও গতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে পশ্চিম থেকে পূর্বে ২৪ ঘণ্টায় একবার ঘোরে। সূর্য সমলয় উপগ্রহগুলি উত্তর থেকে দক্ষিণে পোলার কক্ষপথে বা মেরু বরাবর ঘোরে।

 * পৃথিবীর দৃশ্যমান অংশ: ভূস্থির উপগ্রহ পৃথিবী থেকে অনেক উঁচুতে থাকায় পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা বিশাল অংশ একসঙ্গে দেখতে পায়। সূর্য সমলয় উপগ্রহ অনেক কাছে থাকায় পৃথিবীর একটি ছোট অংশের অত্যন্ত নিখুঁত ও স্পষ্ট ছবি তোলে।

 * প্রধান ব্যবহার: ভূস্থির উপগ্রহগুলি প্রধানত যোগাযোগ ব্যবস্থা, টেলিভিসন সম্প্রচার এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস (যেমন- ইনস্যাট) দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। সূর্য সমলয় উপগ্রহগুলি ভূপৃষ্ঠের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি, কৃষি, বনভূমি ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে (যেমন- IRS) ব্যবহৃত হয়।

৪. আধুনিক ভূগোল চর্চায় রিমোট সেন্সিং, জিপিএস এবং জিআইএস-এর গুরুত্ব অপরিসীম—ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে ভূগোল চর্চা সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। এর পেছনে রিমোট সেন্সিং, জিপিএস এবং জিআইএস-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

 * রিমোট সেন্সিং-এর ভূমিকা: এর সাহায্যে মহাশূন্য থেকে পৃথিবীর যেকোনো অঞ্চলের নিখুঁত ছবি পাওয়া যায়। বনাঞ্চল ধ্বংস, নদীর গতি পরিবর্তন বা সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের গতিপ্রকৃতি নজরে রাখতে এটি সাহায্য করে।

 * জিপিএস (GPS)-এর ভূমিকা: জিপিএস-এর মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে নিজের বা যেকোনো যানবাহনের সঠিক ভৌগোলিক অবস্থান, অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ এবং উচ্চতা মুহূর্তের মধ্যে জানা যায়। গুগল ম্যাপ বা নেভিগেশনে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

 * জিআইএস (GIS)-এর ভূমিকা: জিআইএস সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিভিন্ন ভৌগোলিক উপাত্ত বা ডেটা কম্পিউটারে জমা করে তা বিশ্লেষণ করে নির্ভুল মানচিত্র বা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। শহর পরিকল্পনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলসম্পদ উন্নয়নে এটি অপরিহার্য।

   সংক্ষেপে, এই তিনটি আধুনিক প্রযুক্তি একত্রে মিলে ভূগোলকে বর্তমান যুগে অত্যন্ত নিখুঁত, গতিশীল ও বিজ্ঞানসম্মত করে তুলেছে।

৫. টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রের গুরুত্ব বা ব্যবহারগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: সার্ভে অফ ইন্ডিয়া কর্তৃক প্রস্তুতকৃত টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র বা ভূবৈচিত্র্যসূচক মানচিত্রের গুরুত্ব ও ব্যবহার বহুমুখী:

 * ভূপ্রকৃতি অনুধাবন: এই মানচিত্রে থাকা সমোন্নতি রেখা দেখে কোনো অঞ্চলের পাহাড়ি, মালভূমি বা সমতল ভূপ্রকৃতি এবং ঢালের প্রকৃতি খুব সহজে বোঝা যায়।

 * পরিকল্পনা ও উন্নয়ন: নতুন রাস্তাঘাট, রেলপথ, সেতু বা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করার জন্য ইঞ্জিনিয়ার ও পরিকল্পনাবিদরা এই মানচিত্র ব্যবহার করেন।

 * কৃষি ও জলসেচ: কোন অঞ্চলে চাষাবাদ ভালো হয়, নদী বা খালের অবস্থান কোথায়—তা জেনে কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে এই মানচিত্র সাহায্য করে।

 * সামরিক কাজে ব্যবহার: এই মানচিত্রগুলিকে 'সামরিক মানচিত্র' বলা হয়। দেশের সীমান্ত রক্ষা, যুদ্ধকালীন কৌশল নির্ধারণ এবং দুর্গম এলাকায় সেনাদলের যাতায়াতের জন্য এগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 * দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পর্যটন: বন্যাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করতে এবং পাহাড়ে ট্রেকিং বা পর্যটনের সময় সঠিক পথ ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য জানতে টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রের জুড়ি মেলা ভার।